বনহুর রায়বাবু সেজে স্বপন আর কল্পনাকে নিয়ে মেতে থাকলেও তারও মন ছিলো ঐ বোরখাধারিনীর সন্ধানে। সে বুঝতে পেরেছে, ঐ বোরখার নিচেই রয়েছে তার মনিরা। তাই রঞ্জন যখন স্বপন আর কল্পনাদের বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলো তখন সে বাংলোয় কাউকে বলে গেলো না। কারণ তার মনে ছিলো একটু দুষ্ট অভিসন্ধি।
আজও মনিরা বোরখা পরে এসেছে।
কল্পনা আর স্বপন মনিরা আর মাসুমার সঙ্গে দাদু রায় বাবুর পরিচয় করিয়ে দিলো।
ইনি আমাদের বাবার কাকা রায় দাদু। আর এরা পুলিশ সুপারের বাড়ি থেকে এসেছেন। কথাটা বললো স্বপন।
রায়বাবু শুধু মাথা নেড়ে তাদের অভিবাদনের জবাব দিলেন।
একজন বৃদ্ধের কাছে লজ্জার কি আছে। তাই মাসুমা আর মনিরা হলঘরেই বসলো।
মাসুমা বললো–স্বপন, তোমার রঞ্জনদাকে দেখছি না তো? তিনি কোথায়?
স্বপন আর কল্পনার চোখ অশ্রু ছলছল হলো। বললো স্বপন–রঞ্জনদা আজ ক’দিন হলো চলে গেছেন।
সঙ্গে সঙ্গে মনিরা বোরখার মুখের আচ্ছাদনটা সরিয়ে ফেলে বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললো–চলে গেছেন!
মাসুমাও অবাক হয়ে বললো–রঞ্জন বাবু চলে গেছেন?
হাঁ, তিনি তো আমার কাছে চিরদিন থাকতে পারেন না। তার অনেক নাকি কাজ আছে, তাই তিনি চলে গেছেন।
মনিরা আর মাসুমা উভয়ে তাকালো উভয়ের মুখের দিকে। ব্যথা-বেদনার মুহূর্তে মনিরার মুখ করুণ হয়ে উঠেছে। রায়বাবুর বেশে স্বয়ং দস্যু বনহুর তাদের সম্মুখে উপবিষ্ট। বনহুর বহুদিন পর আজ প্রথম দেখলো মনিরার মুখমণ্ডল। খুশিতে দীপ্ত হয়ে উঠলো বনহুরের আঁখি দুটি! মনিরার ব্যথাকাতর মুখোব তাকে আরও চঞ্চল করে তুললো। ওকে নিবিড়ভাবে পাবার জন্য ব্যাকুল হলো তার হৃদয়।
বললো মাসুমা–সর্বনাশ হয়ে গেছে মনিরা। না জানি কোথায় সে চলে গেছে কে জানে!
মনিরা হঠাৎ দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে উচ্ছ্বসিতভাবে।
রঞ্জন বাবু চলে যাওয়ার সংবাদ শুনে মাসুমা আর মনিরার ভাব লক্ষ্য করে অবাক হয়ে গেছে স্বপন আর কল্পনা। এবার মনিরাকে রোদন করতে দেখে আরও অবাক হয়। রঞ্জন বাবুকে তারাও ভালবাসতো কিন্তু তাই বলে পুলিশ সুপারের স্ত্রী, বোন–এরা তার জন্য কাঁদবে কেন!
মনিরাকে মাসুমা হাশেম চৌধুরীর বোন বলেই পরিচয় দিতো সবার কাছে। স্বপন আর কল্পনাও জানতো–আলেয়া পুলিশ সুপারের বোন।
মনিরা বললো এবার–রঞ্জন বাবু কোথায় গেছেন বলে গেছেন কিছু?
স্বপন জবাব দিলো না, তিনি কোথায় গেছেন বলে যাননি।
এরপর বেশিক্ষণ মাসুমা আর মনিরা স্বপনদের বাড়িতে অপেক্ষা করলো না।
বিদায় নিয়ে চলে গেলো ওরা।
রায়বাবুও উঠে পড়লেন–আজ চলি কেমন?
স্বপন আর কল্পনা আপত্তি তুললো, এক্ষুণি চলে যাবেন রায়দাদু। আরও কিছু সময় থেকে যান না?
না ভাই, আজ আর দেরী করবো না, আসবো আবার। রায়বাবুবেশী দস্যু বনহুর বিদায় নিয়ে চলে গেলো।
*
পেয়েও তাকে হারাবো ভাবতে পারিনি মাসুমা। মাসুমার বুকে মুখ গুঁজে কেঁদে উঠে মনিরা।
মাসুমা ওর মাথায়-পিঠে সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে হয়তো দিল্লী নগরীতেই আছে সে, অধৈর্য হচ্ছো কেন বোন!
না, সে দিল্লীতে থাকলে নিশ্চয়ই স্বপন আর কল্পনাদের ওখান থেকে যেতো না। বড্ড খেয়ালী হয়তো চলে গেছে দূরে কোথাও।
যদি তোর কথা মনে পড়ে থাকে তাহলে দেশেও চলে যেতে পারে।
মিথ্যা নয় মাসুমা। আমার মন যেন বলছে সে আবার ফিরে গেছে কান্দাই শহরে। আমাকে যদি গিয়ে না পায় তাহলে কি হবে মাসুমা?
আমি বলেছিলাম এবার ওকে পরিচয় দে। বেশিদিন এমন করে নিজেকে বঞ্চিত রাখিস্ না মনিরা, কিন্তু তুই আমার কথায় কান দিসনি এবার হলো তো?
মাসুমা, আমি দেখতে চেয়েছিলাম কেন সে সুদূর কান্দাই থেকে এই ভারতবর্ষে আত্নগোপন করে আছে। কেন সে নিজেকে রঞ্জন বাবু সাজিয়ে হিন্দু ভদ্রলোক সেজেছেন। কিন্তু সব আমার ব্যর্থ হয়ে গেলো মাসুমা, আমি নিজের পায়ে নিজেই কুঠারাঘাত করলাম।
মনিরার বেদনা-বিধুর দিনগুলো এমনি নিরানন্দভাবে কেটে চললো।
বান্ধবীর মনঃকষ্টে মাসুমার মনেও শান্তি নেই, সব সময় কেমন একটা থমথমে ভাব বাংলোতে বিরাজ করতে লাগলো।
স্ত্রী এবং মনিরার গম্ভীর চিন্তাযুক্ত ভাব দেখে হাশেম চৌধুরীও উদ্বিগ্ন হলেন, ব্যাপার কি-বাংলোয় যেন কেউ মারা পড়েছে। শেষ পর্যন্ত স্বামীর জেদে মাসুমা সব কথা তাকে খুলে বলতে বাধ্য হলো।
ঘটনা শুনে হাশেম চৌধুরী হাসবেন না কাঁদবেন ভেবে পান না। এমন একটা ব্যাপার অথচ তিনি তার কিছু জানেন না। জানলে আজ এমন হতেও পারতো না। কবে তিনি ওদের দু’টিকে মিলন সূত্রে গেঁথে দিতেন।
হাশেম চৌধুরীও এবার রঞ্জন বাবুর সন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
*
সেদিন হাশেম চৌধুরী স্বয়ং গাড়ি নিয়ে বের হলেন, সন্ধান করে ফিরলেন সমস্ত দিল্লী নগরী কিন্তু রঞ্জন বাবুর সন্ধান তিনি পেলেন না।
বাড়ি ফিরে এসে শুনলেন তার ড্রাইভার হঠাৎ অসুস্থ হওয়ায় নতুন এক শিখ ড্রাইভার এসেছে তার জায়গায়। দোহারা লম্বা চেহারা, মাথায় পাগড়ি, মুখে চাপদাড়ি। চোখে চশমা, হাতে লোহার এক গাছা বালা। বিশেষ করে শিখ ড্রইভারের চোখ দুটি তীক্ষ্ণ এবং বুদ্ধিদীপ্ত বলে মনে হলো।
হাশেম চৌধুরী নাম জিজ্ঞাসা করলেন–তোমার নাম কি ড্রাইভার?
শিখ ড্রাইভার বললো–শিবাজী।
বাঃ বহুৎ আচ্ছা নাম তোমহারা হেসে বললেন হাশেম চৌধুরী।
