না।
বেশ তাই করবো।
বনহুর ভাবে, নূরী ইতিপূর্বে কান্দাই জঙ্গলে মনিরাকে বেশ কিছু সময়ের জন্য দেখেছিলো। তার জন্যই বনহুরকে সে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলো। নূরী সব ভুলে গেছে, ভুলে গেছে সম্পূর্ণভাবে মনিরার চেহারা। সরল সহজ মেয়ে নূরী…হাসে বনহুর।
নূরী বলে–হাসলে কেন?
হাসলাম, একটা নারী সে কি করে একজন পুরুষের গলার চেন চুরি করলো?
কেশব অবাক হয়ে বললো–ও চেন বাবুর?
বললো নূরীহ, ও চেন-মালা ওর।
বনহুরের আর বিলম্ব সইছিলো না, নূরীকে নিয়ে সে বিদায় নেবে দিল্লী নগরী থেকে ভেবে এসেছিলো আজ–কিন্তু সে আর হলো না।
বনহুর বললো–নূরী, আজ তাহলে চললাম।
যাও কিন্তু মেয়েটিকে যেন হত্যা করো না।
না, ওকে নিয়ে আসবো তোমার কাছে।
তাই এনো।
বনহুর কেশবের করমর্দন করে বিদায় নিলো।
*
বনহুর সেদিন স্বপন আর কল্পনার নিকটে বিদায় চেয়ে বসলো–এবার তোমাদের মায়াজাল আমাকে বিচ্ছিন্ন করতে হচ্ছে ভাই।
অবাক হয়ে বললো স্বপন আর কল্পনা–তার মানে?
মানে আমাকে এবার বিদায় নিয়ে চলে যেতে হচ্ছে দূরে–অনেক দূরে।
বনহুরের কথা শুনে স্বপন আর কল্পনার মাথায় যেন বাজ পড়লো। তারা ভাবতেও পারেনি রঞ্জনদা একদিন তাদের ছেড়ে চলে যাবে। প্রায় কেঁদে ফেললো দু’জনা।
স্বপন বললো–রঞ্জনদা, আপনি চয়ে যাবেন? কিন্তু আমাদের কে দেখাশোনা করবে বলুন তো?
হেসে বলে বনহুর–এখন তোমার বড় হয়েছে। জ্ঞান-বুদ্ধি অনেক বেড়েছে। তাছাড়া তোমাদের যে সব কর্মচারী বা আত্মীয়-স্বজন আছে সবাই তোমাদের সমীহ করে। কাজেই আমি না থাকলে কোনো অসুবিধাই হবে না তোমাদের।
শেষ পর্যন্ত বনহুরকে বিদায় দিতে হল স্বপন আর কল্পনাকে।
ওদের ছেড়ে যেতে বনহুরের যে কষ্ট হচ্ছিলো না, তা নয়। কিন্তু কি করবে সেবনহুরের স্বভাব নয় স্থির হয়ে চিরদিন এক স্থানে আবদ্ধ হয়ে থাকা। এমন কোনো শক্তি নেই তাকে ধরে রাখতে পারে।
বনহুর স্বপন আর কল্পনার কাছে বিদায় নিয়ে চলে গেলেও সে সত্যিই একেবারে দূরে চলে গেলো না। কারণ এখনও তার কিছু কাজ বাকী আছে।
দিল্লীর অনতিদূরে এক নির্জন স্থানে সে একটি বাড়ি ভাড়া নিলো। বাড়িখানা বহুদিনের পুরানো বাদশাদের আমলের তৈরি। এককালে বাড়িখানার জৌলুস ছিলো। রাজ প্রাসাদের মত বিরাট বাড়ি। সিংহাদ্বারের পরেও পর পর কয়েকটি দ্বার আছে। এককালে এ সব দ্বারে খোঁজা দারওয়ান পাহারা থাকতো। ভিতরে ছিল বেগম মহল। হয়তো কোনো রাজা বা বাদশাহ সখ করে নির্জন স্থানে বসবাস করবার জন্য এ বাড়িটা তৈরি করেছিলেন। আজ পূর্বের ন্যায় সুন্দর আর ঝকঝকে নেই, ভেঙে ধসে পড়েছে অনেক জায়গা। সিংহদ্বারের উপরে জন্মেছে অসংখ্য আগাছা।
বনহুর এ বাড়িটাই ভাড়া নিলো এক মহাজনের নিকট হতে। এ বাড়ির আশেপাশে কোনো বাড়ি নেই, নেই কোনো লোকজনের বসবাস।
এ বাড়িটাই বনহুরের পছন্দ হলো।
দিল্লীতে বাকী যে ক’দিন কাটাবে এ বাড়িটাই তার এখন প্রয়োজন। এ বাড়ির ভিতরে ঘুরেফিরে দেখে নিজের পছন্দ মত একটা ঘর বেছে নিয়েছে থাকার জন্য। শুধু একা বনহুর থাকবে। ঘরটা ঠিক মাঝের একটা ঘর, ভাঙাচুরা তেমন নয়, পরিস্কারও বটে।
বনহুর এ ঘরেই তার আস্তানা গাড়লো।
বাড়িখানার আশেপাশে বেশ জনভূমি এবং উঁচু-নীচু জায়গা। ঝোপঝাড়ও জন্মেছে অনেক। বনহুরের এ সব পছন্দই হলো। সে তার গাড়িখানা রাখবার জন্য গ্যারেজ না পেলেও ভাঙা ধসে-পড়া ঘর পেলো ঠিক গ্যারেজের মতই। বনহুর তার উপার্জিত লক্ষ লক্ষ টাকা বিলিয়ে দিলেও এখনও তার নিকটে যে সোনা-দানা, মনি-মুক্তা ছিল তা কোটি কোটি টাকা মূল্যের চেয়েও বেশি হবে।
বনহুর এসব মূল্যবান মনি-মুক্তা, সোনা-দানা লুকিয়ে রাখলো তারই কক্ষের এক গোপন প্রকোষ্ঠে। ইচ্ছামতো সে বিলিয়ে দিতে দীনদুঃখী আর অনাথদের মধ্যে।
নিজের প্রয়োজন তার কতটুকুই বা লাগতো! তবু বনহুরের স্বভাব–যদি কোনো দুষ্ট ধনপতির সন্ধান পেতো, যেমন করে হোক তার সর্বস্ব লুটে নিতে দ্বিধা বোধ করতে না সে এতটুকু।
স্বপন আর কল্পনাদের বাড়ি ত্যাগ করে চলে এলেও বনহুর এক বৃদ্ধ আত্নীয়ের বেশে মাঝে মাঝে গিয়ে তাদের সব খোঁজ-খবর নিয়ে আসতো।
স্বপন আর কল্পনা এতটুকু বুঝতে পারতো না কিন্তু বৃদ্ধের ব্যবহারে আত্নহারা হয়ে যেতো। বনহুর। বৃদ্ধ সেজে তাদের বাবার কাকার বলেই পরিচয় দিয়েছিলো।
স্বপন আর কল্পনা সরল বিশ্বাসে তাকে স্থান দিয়েছিলো অন্তরে। বৃদ্ধ রায়বাবুর বেশে যখন যেতো। বনহুর তখন স্বপন আর কল্পনার আনন্দের সীমা থাকতো না। কোথায় বসাবে, কি খাওয়াবে–ভেবে আকুল হতো ওরা।
বনহুরও বৃদ্ধের মত গলা কাঁপিয়ে কথা বলতো, স্নেহ-আদরে ভরে দিতে দুটি ভাই-বোনকে। যতক্ষণ ওদের মধ্যে থাকতো পরম আনন্দে সময় কাটতো তার।
*
বেশ কয়েকদিন রঞ্জন বাবুর সন্ধান না পেয়ে পুলিশ সুপার হাশেম চৌধুরী এবং তার পরিবারবর্গ উদ্বিগ্ন হলো। কোনো অসুখ-বিসুখ করেনি তো রঞ্জন বাবুর! বেশি করে চিন্তিত হলো মনিরা–হঠাৎ এমন করে কোথায় নিখোঁজ হলো!
একদিন মনিরা আর মাসুমা হাজির হলো গিয়ে স্বপন আর কল্পনাদের বাড়িতে।
স্বপন আর কল্পনা মনিরা আর মাসুমাকে দেখে খুশিতে উচ্ছল হয়ে উঠলো।
হলঘরেই তারা বসেছিলো। তাদের রায় দাদু এসেছেন। তার কাছেই বসে গল্পসল্প করছিলো ওরা।
