গভীর আবেগে বনহুর বললো–কেন কাঁদছিলে?
বাস্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো নূরী–সেই যে চলে গেলে, কই তারপর তো একদিন এলে না?
অনেক কাজ ছিলো নূরী, শেষ করলাম।
চিরদিন তোমার কাজ আর কাজ। অবসর হবে না?
এবার হয়েছি, তোমাকে নিতে এসেছি নূরী। চলো আবার আমরা ফিরে যাই কান্দাই নগরে। রহমান কেমন আছে, আমার অনুচরগণ সবাই কেমন আছে কে জানে! তাজ হয়তো এতোদিনে শুকিয়ে মরে গেছে। নূরী, আর আমি দেশে থাকতে চাই না..
তোমার মত আমার মনও অস্থির হয়ে উঠেছে হুর। কতকাল আমি জন্মভূমি ত্যাগ করে এসেছি। আমিও যেতে চাই।
তবে চলো আমার সঙ্গে, আমি প্রস্তুত হয়ে এসেছি।
তা হয় না হুর। সাপুড়ে বাবা আমাকে নিজের মেয়ের মত স্নেহ করে, তাকে না বলে কি করে যাবো বলো? তাছাড়া কেশব ভাইকে একা ফেলে আমার যাবার উপায় কই?
নূরী, সাপুড়ে সর্দার যদি কোনোরকম আপত্তি করে বসে?
না না, বাবা তেমন লোক নয়।
সেদিনের সেই দুষ্ট লোকটা…
রংলাল! ওর কথা রেখে দাও। তুমি যদি পাশে থাকো তাহলে কাউকে ভয় করি না।
নূরী! বলো?
ভোর হয়ে এলো প্রায়।
হাঁ। ভোর হয়ে আসছে।
বনহুর ওকে বলিষ্ঠ বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে ফেললো। মুখখানা নেমে এলো ওর মুখের কাছে, আবেগভরা কণ্ঠে ডাকলো–নূরী!
বললো নূরী–ছিঃ, বাইরে কেশব ভাই আছে।
তাকে বলেই আমি এসেছি, কাজেই…
তাই তো এতো স্পর্ধা তোমার!
হঠাৎ বনহুরের দৃষ্টি চলে যায় নূরীর গলায়, চমকে উঠে বনহুর। লণ্ঠনের আলোতে নূরীর গলায় মনিরার দেওয়া চেন-মালাটাই তার নজরে পড়েছে।
বনহুর নূরীকে মুক্তি দিয়ে লণ্ঠনটা তুলে নেয় হাতে। সলতে বাড়িয়ে উঁচু করে ধরে নূরীর গলার কাছে, তারপর বামহস্তে চেন-মালাটা উল্টেপাল্টে দেখে এক জায়গায় চাপ দিয়ে ঢাকনাটা খুলে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে পাশাপাশি ছোট্ট দুটি মুখ বেরিয়ে আসে।
বনহুর বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলে-নূরী, এ মালা তুমি কোথায় পেলে?
নূরীও অবাক হয়ে গেছে, সে জানতো না চেনের লকেটের মধ্যে দুটি শিশুর মুখ লুকিয়ে আছে। এমনি একটা চেন-মালা সে তার হুরের গলায় দেখেছিলো, সে কথা সম্পূর্ণ ভুলেই গিয়েছিলো নূরী। আজ স্মরণ হয় স্পষ্টভাবে। বলে নূরী–আমার নাচ দেখে খুশি হয়ে এক যুবতী আমাকে এ মালা দান করেছে।
যুবতী!
হাঁ। কিন্তু এ মালা যে তোমার গলায় ছিলো?
যদিও জামার নিচে আজও বনহুরের গলায় তার সেই দস্যু-পিতা কালু খাঁর দেওয়া স্মৃতি চেন মালাটা পরা রয়েছে, তবু সে-কথা গোপন রেখে বললো বনহুর–আমার মালাটা চুরি গিয়েছিলো। বলো, বলো নূরী কে সে যুবতী? কোথায় থাকে সে?
আমি ঠিক জায়গাটা খেয়াল করতে পারবো না, তবে কেশব ভাই বলতে পারবে। চলো হুর, রাত ভোর হয়ে গেছে; কেশবের কাছে জেনে নেবে চলো।
তাই চলো নূরী।
বনহুর আর নূরী কুঠিরের মধ্য হতে বেরিয়ে এলো।
কেশব ঘুম থেকে জেগে উঠেছে অনেকক্ষণ, বনহুর আর নূরীর আগমনে উঠে বসলো।
বনহুর বললো–কেশব, নূরীর গলায় এ মালা কে দিয়েছে জানো?
কেশব নূরীর মালায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো–ও মালা এক মহিলা দিয়েছেন ওর নাচ দেখে খুশি হয়ে।
সে কথা আমি শুনেছি। আমি জানতে চাইছি কে সে মহিলা? কোথায় থাকে সে? আমি তার পরিচয় জানতে চাই।
বেশ তো বলছি–সেলুকা রোড আছে না?
হ আছে। বললো বনহুর।
ঐ রোড দিয়ে কিছুদূর গেলে সাবেরা কোয়ার্টার আছে। তার ওদিকে….
অতো বলতে হবে না, একবার বলো–আমি দিল্লীর সব পথঘাট চিনি।
পুলিশ সুপারের বাংলো চেনো বাবু?
আচমকা একটু চমকে উঠলো যেন বনহুর, বললো-হা-হা চিনি।
ঐ বাংলোয় ফুল নাচ দেখিয়েছিলো তাই বেগম সাহেবা ঐ মালাটা দিয়েছেন।
বলে উঠে নূরী–বেগম সাহেবা না কে জানি না, দু’জন মেয়ে ছিলো; তার মধ্যে একজন টাকা দিয়েছিলো আর একজন এই মালাটা।
হাঁ তারপর?
তারপর আবার কি, ঐ তো মালা নিয়ে চলে এলাম খুশি হয়ে। তখন কি আমি খেয়াল করেছি এ মালা তোমার?
নূরীর কথায় বলে উঠে কেশব–কি বলো ফুল? ও মালা তোমার বাবুর?
হাঁ কেশব, এ মালা আমার।
তাহলে ওটা কি করে…
বললো নূরী–চুরি গিয়েছিলো।
বনহুরের মনে তখন নানারকম চিন্তার জাল ছড়িয়ে পড়েছে। এ মালা যে তার মনিরার কণ্ঠে সব সময় পরা থাকে। এ মালা ভারতে এলো কি করে? পুলিশ সুপারের বাড়ির মহিলার কণ্ঠেই বা গেলো কি করে? তবে কি ঐ বোরখাধারিনী তার মনিরা? বনহুরের কানে বোরখাধারিনীর কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি বেজে উঠে। তাই তো, আজ যেন মনে হচ্ছে–ও স্বর তার কত পরিচিত। এতোদিন বনহুর ভাবতেও পারেনি–তার মনিরা এই সুদূর ভারতে আসতে পারে।
বনহুরের মুখোভাব লক্ষ্য করছিলো নূরী, বললো সে–হঠাৎ কি হলো তোমার হুর?
আনমনা ভাবে উচ্চারণ করলো বনহুর–উ।
মালা তো পেয়েছো আর কি?
হাঁ মালা পেলাম, কিন্তু চোরকে শায়েস্তা না করে ছাড়বো ভেবেছো?
কি দরকার। বড় ভাল মেয়ে বলেই আমার মনে হলো।
ওঃ বখসীশ মোটা পেয়েছিলে তাই এতো দরদ! আচ্ছা বলো তো, বাংলোয় দুটো মেয়ে থাকে– একজন বোরখা পরে আর একজন অতো পর্দার বাড়াবাড়ি নেই, কোন্ জনা তোমাকে এ মালা খুশি। হয়ে দিয়েছিলো?
চট করে বললো নূরী–যে বোরখা পরে থাকে সেই দিয়েছে।
হুঁ এবার বুঝেছি। বনহুর কথাটা বলে মৃদু হাসে।
নূরী বলে–দেখো আমি তোমাকে অনুরোধ করছি তাকে জানে মেরো না।
তাহলে বন্দী করে নিয়ে আসবো?
তাই এনো।
কিন্তু তুমি কিছু মনে করে বসবে না তো?
