কেন?
পরে বলবো, আজ চলো তোমাকে কেশবের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসি।
তাই চলো তবে।
গাড়ি পুনরায় চলতে শুরু করলো।
নূরী বনহুরের কাঁধে মাথা রেখে বললো–হুর, আজ আমার কি আনন্দ হচ্ছে জানো? আকাশের চাঁদ পেলেও এতো খুশি হতাম না। ইস, কি যে আনন্দ…
বনহুরের মুখে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠে, বিশেষ করে নূরীকে পেয়ে সে নিজেও কম খুশি হয়নি! তবু নিজেকে যতদূর সম্ভব গম্ভীর রাখার চেষ্টা করে বনহুর।
নূরী বলে আবার–হুর, আমাকে রেখে চলে যাবে–আবার আসবে তো?
চেষ্টা করবো।
না, সত্যি করে আমাকে কথা দিয়ে যেতে হবে। যদি আবার এসো তবেই আমি তোমাকে ছেড়ে দেবো।
আসবো।
শপথ করো আমাকে স্পর্শ করে?
গাড়ি চালাচ্ছি, দেখছো না আমার দু’হাত বন্ধ?
নূরী দুটি বাহু দিয়ে বনহুরের গলা জড়িয়ে ধরে বলো সত্যি?
হেসে বলে বনহুর–সত্যি!
বনহুরের মুখের হাসি নূরীর গোটা মনে ছড়িয়ে পড়ে। উচ্ছল হয়ে উঠে নূরী, বনহুরের বুকে মুখ লুকিয়ে বলে–আমার হুর!
সাপুড়েদের আস্তানায় পৌঁছবার পূর্বে বনহুর নূরীকে নিয়ে ফিরে আসে এক জায়গায়, যেখান থেকে নূরীকে জোর করে দুষ্ট লোক দুটো ধরে নিয়ে গিয়েছিলো।
বনহুর আর নূরী ফিরে এসে দেখলো, সাপুড়ে সর্দার নূরীর জন্য মাথা ঠুকে বিলাপ করছে…সত্যি সে নূরীকে এতোখানি ভালবেসে ফেলেছিলো! কেশবও অশ্রু বিসর্জন করে চলেছে।
চারদিকে ঘিরে ধরেছে অসংখ্য জনতা।
বনহুর আর নূরী নেমে দাঁড়াতেই সাপুড়ে সর্দার বনহুরকে জড়িয়ে ধরলো–বাবুজী, তুই বহুৎ ভাল কাম করিয়ছি। হামার মাইয়ারে তুই বাঁচাইয়া নিয়াছি…
কেশব তো বনহুরকে দেখতেই ছুটে এসে জাপটে ধরলো–বাবু তুমি? তুমি ফুলকে উদ্ধার করেছে।!
অগণিত জনতা সবাই স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখছে।
এমন সময় রংলাল কোথা থেকে ভীড় ঠেলে এগিয়ে আসে, বনহুরের সম্মুখে দাঁড়িয়ে ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলে–হামাদের মাইয়্যাকে তুমি বাঁচাইবার কে। তুমি নিজের পথ দেখো।
বনহুর তখন প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট কেসটা বের করে একটা সিগারেট ঠোঁটের ফাঁকে চেপে ধরে অগ্নি সংযোগ করে নিলো, তারপর একমুখ ধূয়া সম্মুখে ছুঁড়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বললো–তুমি কে?
বুক ফুলিয়ে, দক্ষিণ হস্ত মুষ্ঠিবদ্ধ করে বললো রংলাল–হামি হীরালালের ভাতিজা রংলাল। হামাকে এ গাঁয়ের সবাই ভয় করে। আইসেছো, আর কোনোদিন এ পথে পা দিবে না।
রংলালের কথায় বনহুরের রাগ চরমে উঠে, পূর্বের ন্যায় কণ্ঠে বলে–আসবো, হাজার বার আসবো, তাতে তোমার কি?
খবরদার, এলে জান নিয়ে ফিরে যেতে পারবে না….
রংলালের কথা শেষ হয় না, বনহুরের বলিষ্ঠ হাতের ভয়ংঙ্কর একটি ঘুসি গিয়ে পড়ে তার নাকের উপর, সঙ্গে সঙ্গে হুমড়ি খেয়ে ছিটকে পড়ে রংলাল ভূতলে।
এতোক্ষণে রংলাল বুঝতে পারে, যার সঙ্গে সে তাচ্ছিল্যভাবে কথা বলছে সে সাধারণ লোক নয়। গায়ের ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায় রংলাল, নাক বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে তার।
বনহুর কোনো কথা না বলে ক্রুদ্ধদৃষ্টিতে একবার রংলালের দিকে তাকিয়ে গাড়িতে গিয়ে উঠে বসে।
গাড়ি দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।
সাপুড়ে সর্দার হীরালাল ফিরে তাকায় রংলালের মুখে। রাগে-ক্ষেভে অধর দংশন করে বলে সে– এতো বড় হারামি লোক তুই, বাবুজী ফুলেরে বাঁচাই নিলো আর কিনা..
হাতের পিঠে নাকের রক্ত মুছে ফেলেছিলো রংলাল, দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বললো–জানো, ও বাবুজী তুহার ফুলের রূপ দেইখ্যা পাগল হই গেছে। তাই তো ওহারে বাঁচাইয়া নিছে…
খুব ভাল কাম করিয়াছে। বাবুজী তো তোমার মত শয়তান আছে না। চল মাই ফুল, ঘর চল।
সাপুড়ে সর্দার হীরালাল নূরী আর কেশবকে নিয়ে ফিরে যায় তাদের সাপুড়ে পল্লীতে।
*
বনহরের দেখা পেয়েছে নূরী–আর কি তার মন স্থির থাকে! সব সময় তার প্রতীক্ষায় প্রহর গুণে সে। দিন যায়, রাত আসে রাত যায়, দিন হয়।
চঞ্চল হয়ে উঠে নূরী।
গভীর রাতে সমস্ত সাপুড়ে পল্লী যখন সুপ্তির কোলে ঢলে পড়ে তখন নূরী শয্যা ত্যাগ করে পা টিপে টিপে বেরিয়ে আসে বাইরে।
কুঠিরের দাওয়ায় শোয় কেশব। সে যেন জেগে না উঠে তাই পায়ের নূপুর জোড়া খুলে রাখে বালিশের তলায়।
সাপুড়ে পল্লীর অদুরে বেশ কিছু ফাঁকা জায়গা আছে, আশেপাশে আছে ছোট-বড় কিছু সংখ্যক শাল, পিয়াল আর দেবদারু গাছ।
নূরী দস্যু-কন্যা, সাহসী তার প্রাণ। ভয় বলতে কিছু জানে না সে। এগিয়ে যায় নূরী সেই নির্জন ফাঁকা প্রান্তরে। উঁচু একটা স্থানে দাঁড়িয়ে ইংগিতপূর্ণ শব্দ করে। সুমিষ্ট কণ্ঠের মিষ্টি একটা সুর ছড়িয়ে পড়ে সাপুড়ে পল্লীর চারদিকে।
নূরী তার আকুল কণ্ঠে আহ্বান করে বনহুরকে। যদি সে ফিরে যায়, চিনতে না পারে তার কুঠির।
প্রহর কেটে যায়।
নূরীর আশা সফল হয় না। আসে না তার আকাঙ্খিত জন। শেষ রাতের আকাশে জেগে উঠে ধ্রুবতারা, ফিরে আসে নূরী নিজের কুঠিরে, বিছানায় লুটিয়ে পড়ে কাঁদে। অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠে নূরীর তেলচিটে বালিশটা।
হঠাৎ কারো করস্পর্শে চমকে উঠলো নূরী। মুখ মুলে তাকালো, সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলোতার চোখ দুটো। অস্পষ্ট স্বরে বললো–হুঁর!
নূরী! বনহুর ওর নামটা উচ্চারণ করলো। তারপর ওকে নিবিড় করে টেনে নিলো কাছে।
নূরীর আনন্দ-অশ্রু ঝরে পড়তে লাগলো, ভিজে গেলো বনহুরের জামার কিছু অংশ।
