সামনের গাড়িখানা শহর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো বাইরের বাঁকা পথ ধরে। বনহুর এবার খুশি হলো, এতে তার সুবিধা হলো আরও বেশি, কারণ এখন গাড়ি চালাতে তাকে বেশি বেগ পেতে হচ্ছে না।
সম্মুখের গাড়ি তীরবেগে ছুটে চলেছে। পাকা সড়ক ত্যাগ করে মেঠো পথ ধরে গাড়িখানা অগ্রসর হলো।
বনহুরের গাড়িও নেমে পড়লো মেঠো পথে।
উঁচু-নীচু অসমতল পথ।
হঠাৎ সম্মুখে আর একটি পথ দেখতে পেয়ে বনহুর সে পথে ডবলস্পীডে গাড়ি চালিয়ে দিলো। এবং কৌশলে সম্মুখস্থ গাড়ির পথ আগলে দাঁড়িয়ে পড়লো।
বাধ্য হলো শয়তান দুষ্ট লোক গাড়ি থামিয়ে ফেলতে।
বনহুর লাফিয়ে নেমে পড়লো, তরপর দ্রুত ছুটে গিয়ে গাড়ির ড্রাইভ আসন থেকে লোকটাকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে নিলো। তারপর চললো ঘুসির পর ঘুসি। তুমুল ধস্তাধস্তি শুরু হলো।
গাড়ির মধ্যে ছিলো দ্বিতীয় এক ব্যক্তি। সে-ই মেয়েটিকে এঁটে ধরে ছিলো।
বনহুর আর ড্রাইভার যখন ধস্তাধস্তি হচ্ছিলো তখন লোকটা মেয়েটিকে নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে পালাবার আয়োজন করছিলো। টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে সে মেয়েটিকে।
বনহুর ড্রাইভারের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করলেও তার দৃষ্টি ছিলো মেয়েটির দিকে। এবার সে ড্রাইভারকে পরপর কয়েকটা ঘুসি লাগিয়ে কাবু করে ফেলে ছুটে চলে যে দুষ্ট লোক মেয়েটি নিয়ে পালাচ্ছিলো তার দিকে।
লোকটা মেয়েটিকে নিয়ে অনেকটা এগিয়ে গেছে জঙ্গলের দিকে!
বনহুর ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো লোকটার উপর। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটিকে ছেড়ে দিয়ে লোকটা আক্রমণ করলো বনহুরকে।
শুরু হলো আবার মল্লযুদ্ধ।
সেকি ভীষণ লড়াই!
ধূলো-মাটি আর বালির মধ্যে তুমুল ধস্তাধস্তি।
বনহুরের সঙ্গে পেরে উঠে সাধ্য কার!
বনহুরের ঘুসি খেয়ে অল্পক্ষণেই দুষ্ট লোকটার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়লো। এবার সে ভো দৌড় দিলো জঙ্গলের দিকে।
লোকটা পালিয়ে যেতেই বনহুর ফিরে দাঁড়ালো।
অমনি ছুটে এসে বনহুরের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো মেয়েটি।
বনহুর বিস্ময়ভরা কণ্ঠে উচ্চারণ করলো–নূরী!
হুর, কোথায় ছিলে তুমি এতোদিন?
বনহুর এবার গম্ভীর হয়ে পড়লো, নূরী প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে বললো–কেশব কোথায়?
ও আছে। হুর, আমি ভাবতেও পারিনি, তুমি এসময় আসবে। কোথায় এতোদিন ছিলে বলো তো?
বনহুর কোনো জবাব দিলো না, বললো–চলো কেশবের নিকটে তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।
বনহুর গাড়ির দিকে অগ্রসর হলো।
নূরী পিছনে পিছনে এগুলো।
ড্রাইভ আসনে বনহুর উঠে বসতেই, নূরী তার পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলো–হুঁর, তুমি কোথায় ছিলো এতোদিন? আমি যে তোমার জন্য কেঁদে কেঁদে পাগল হয়ে পড়েছি।
হেসে উঠলো বনহুর…অট্টহাসি। তারপর হাসি থামিয়ে দাঁত পিষে বললো–পাগল! জানতাম না। তোমার মধ্যে এতোখানি ছলনা লুকিয়ে ছিলো।
হুর, একি বলছো তুমি! আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি না।
বনহুর গাড়িতে স্টার্ট দেয়। গাড়ি ছুটে চলে শহর অভিমুখে।
নূরী কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো–কথা বলছো না কেন? কি হলো তোমার হুর, বলো?
বনহুর তবু নীরব।
নূরী হ্যাণ্ডেলের উপর বনহুরের হাতখানা চেপে ধরে–বলো কি ছলনা আমি করেছি তোমার সঙ্গে? বলো জবাব দাও?
বনহুরের মুখমণ্ডল রাগে রক্তের মত লাল হয়ে উঠছে। অধর দংশন করছে সে।
নূরী এবার ব্রেক কষে ধরলো–জবাব না দিলে আমি তোমাকে গাড়ি চালাতে দেবো না।
নূরী! কঠিন কণ্ঠে বনহুর গর্জে উঠলো।
হুর, বলো আমি কি অন্যায় করেছি যার জন্য তুমি আমার উপর ক্রুদ্ধ হচ্ছো?
এবার বনহুর গাড়ি থামিয়ে ফেললো, গম্ভীর গলায় বললো–কেন তুমি আমাকে পূর্বে বলেছিলে না। কেশবকে তুমি ভালবাসো? আমি তাহলে তোমাকে স্পর্শ করতাম না।
নূরী অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠলো–হুর!
আমার কাছে কোনোরকম মিথ্যা কথা বলবে না নূরী।
তুমি বিশ্বাস করো, কেশবকে আমি ভালবাসি কিন্তু ভাই-এর মত। হুর, তোমার নূরী কোনোদিন অপরের হবে না বা হতে পারে না। এখনও তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
বনহুর বললো–কেশবের সঙ্গে তোমার যদি ভাই-এর সম্বন্ধ, তাহলে ওর সঙ্গে কেন তুমি পালিয়েছিলে?
কে বললো আমি কেশবের সঙ্গে পালিয়েছি? হুর, একথা তুমি ভাবতে পারলে? এবার বুঝতে পেরেছি সব…বলো তুমি কতদিন পর সেই জঙ্গলে ফিরে গিয়েছিলে?
কয়েকদিন পর জঙ্গলে ফিরে গিয়ে তোমাদের অস্তিত্ব খুঁজে পাইনি।
ওঃ তুমি তাহলে আবার গিয়েছিলে? আজ আমি সব কথা বলবো তোমাকে। বাবাজী মরে যাবার পর তোমার জন্য দুদিন অপেক্ষা করেছিলাম আমরা সেই জঙ্গলে, কিন্তু বাবাজী নেই, তুমি নেই–শুধু কেশব ভাই আর আমি কি করে ঐ জঙ্গলে দুটি প্রাণী বাস করি বলো? তার তোমার সন্ধানে শহরের দিকে রওয়ানা হলাম। তারপর থেকে খুঁজে ফিরছি তোমাকে। এক সাপুড়ে সর্দার আমাকে কন্যার মত স্নেহ করে, তাই তার ওখানেই আমরা থাকি।
বনহুর নূরীর পা থেকে মাথা অবধি লক্ষ্য করে ব্যঙ্গপূর্ণ হাসি হেসে বললো–পেট চালানোর জন্য নাচনেওয়ালী সেজেছো, না?
হা, মিথ্যা আমি কোনোদিন তোমাকে বলিনি; কোনোদিন বলতে পারবো না।
বেশ তো, ভালই এক পথ বেছে নিয়েছে। চলো তোমার আস্তানায় পৌঁছে দিয়ে আসি।
আর তুমি?
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বললো এবার আমার অনেক কাজ আছে।
না, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না, হুর, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না।
নূরী, আমি যেখানে থাকি সেখানে তোমাকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না।
