এ তো জানতো না সে নিশ্চয়ই আজ সেখানে গেলে মৃত্যু তার সুনিশ্চয় ছিলো। বনহুর বোরখাধারিনীকে অন্তরে অন্তরে ধন্যবাদ জানায়।
তারপর চলে চা-নাস্তা পর্ব।
খেতে খেতে নানারকম গল্পসল্প বলে। হাশেম চৌধুরীর কথা শুনে হাসে বনহুর। রাত্রির ভয়ঙ্করই যে স্বয়ং দস্যু বনহুর!
এক সময় বনহুর বিদায় নিয়ে চলে এলো। কিন্তু গত রাতের ঘটনা তার মনের আকাশটাকে আচ্ছন্ন করে রাখলো। বার বার দুটি উষ্ণ ওষ্ঠের কোমল স্পর্শ অনুভব করতে লাগলো নিজের ললাটে। সব সময় মনে পড়তে লাগলো–বোরখাধারিনী তার পায়ে মাথা রেখে অশ্রু বিসর্জন করছিলো কেন।
সমস্ত দিন বনহুর একটি মুহূর্তের জন্য ভুলতে পারলো না বোরখাধারিনীকে।
স্বপন আর কল্পনা এ কথা সে-কথা নিয়ে তাকে কত কি প্রশ্ন করতে লাগলো কিন্তু আজ বড় গম্ভীর উদাসীন মনে হলো রঞ্জন দাদাকে!
বিকেলে বনহুর একাই গাড়ি নিয়ে বের হলো। কোথায় চলেছে, কেন চলেছে, সে নিজেই জানে না।
দিল্লীর রাজপথ।
অগণিত-পথচারী ফুটপাত ধরে এগিয়ে চলেছে! সবাই কর্ম ব্যস্ত।
এদিক-সেদিন ছুটে চলেছে অগণিত যানবাহন।
বনহুর আপন মনে গাড়ি চালাচ্ছে। মনের মধ্যে তার নানা চিন্তাজাল ঘুরপাক খাচ্ছিলো। দৃষ্টি ছিলো তার সম্মুখে। হঠাৎ একটা আর্ত চিৎকারে বনহুর ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে ফেলে।
একটা বৃদ্ধ সাপুড়ে চাপা পড়েছে তার গাড়ির নিচে।
বনহুর দ্রুত নেমে গিয়ে বৃদ্ধকে তুলে ধরলো, মাথায় আঘাত লাগায় লোকটা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। বনহুর তাড়াতাড়ি তাকে গাড়িতে তুলে নিলো, তারপর চললো হসৃপিটালে।
হসপিটালে ভর্তি করে দিলো বনহুর বৃদ্ধ সাপুড়েকে। যত টাকা-পয়সা লাগে দেবো আশ্বাস দিলো ডাক্তারকে বনহুর। নিজে বসে রইলো তার পাশে, যতক্ষণ সংজ্ঞা ফিরে না আসে ততক্ষণ বনহুর উঠলো না।
হসপিটালের বড় ডাক্তার চিকিৎসা শুরু করলেন।
বনহুর বিপুল উদ্বিগ্নতা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। তার দস্যুপ্রাণ আজ ব্যথায় কাতর হয়ে পড়লো, এক বৃদ্ধ সাপুড়ের জন্য তার মনে শুরু হলো দারুন অস্থিরতা। একি হলো, এমন ভাবে একটা জীবন তার গাড়ির তলায় বিনষ্ট হবে, এ যেন সে ভাবতেও পারেনি। না জানি বৃদ্ধের স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, আত্নীয়স্বজন তারা কত আশা নিয়ে প্রতীক্ষা করছে। হয়তো বা বৃদ্ধ সাপুড়ের রোজগারের উপরই নির্ভর করছিলো তাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব-ভার। এখন কে দেখবে তাদের, কে জোগাবে তাদের মুখে আহার। বনহুর এসব চিন্তা করতে লাগলো।
*
সেদিন গোটা রাত প্রায় হসপিটালে কাটিয়ে অনেক রাতে ফিরে এলো বনহুর।
স্বপন আর কল্পনা পরদিন উদ্বিগ্নভাবে জিজ্ঞাসা করলো, কাল কোথায় গিয়েছিলে রঞ্জনদা? কেন ফেরেননি? কোনো বিপদ ঘটে নি তো!
বললো বনহুরহ, বিপদই ঘটেছিলো। তারপর সব কথা খুলে বললো বনহুর স্বপন ও কল্পনার কাছে।
এরপর থেকে বনহুর রোজ হসপিটালে যাওয়া-আসা শুরু করে দিলো। ঔষধপথ্য, টাকা-পয়সা যা লাগে সব দিতে লাগলো অজস্রভাবে।
চিকিৎসায় একদিন আরোগ্য লাভ করলো বৃদ্ধ সাপুড়ে।
আনন্দ ধরে না বনহুরের। বৃদ্ধ সাপুড়েকে জড়িয়ে ধরে বুকে, তারপর এক থলে টাকা গুঁজে দেয় তার হাতে, বলে তাকে–যতদিন বাঁচবে বসে খেও। সাপ খেলা আর তোমাকে দেখাতে হবে না।
আনন্দে বৃদ্ধ সাপুড়ের চোখ দুটো চক্ চক্ করে উঠে। খুশি হয় সাপুড়ে বৃদ্ধ বনহুরের ব্যবহারে।, তাদের সাপুড়ে ভাষায় আশীর্বাদ করে সে তাকে।
বনহুর তো অবাক।
তার গাড়ির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ যাচ্ছিলো, অথচ তাকেই এতো সমীহ! বললো বনহুর–চলো তোমাকে তোমার আস্তানায় পৌঁছে দিয়ে আসি।
সাপুড়ে বললো–আপনার বড় দয়া বাবুজী।
বনহুর নিজের গাড়িতে তুলে নেয় সাপুড়ে বৃদ্ধকে।
শহরের শেষ প্রান্তে সাপুড়ে পল্লী।
বনহুর গাড়ি ড্রাইভ করে চলেছে।
পিছন আসনে বসে আছে সাপুড়ে বৃদ্ধ।
শহরের মধ্যপথ ধরে গাড়ি এগিয়ে চলেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বনহুরের গাড়ি শহরের প্রান্তে এসে পৌঁছলো।
এক জায়গায় কতগুলো লোক হইহুল্লোড় করে চিৎকার করছে। সমস্ত কণ্ঠ ছাপিয়ে একটা নারীকণ্ঠ শোনা গেলো–বাচাও, বাঁচাও…
বৃদ্ধ সাপুড়ে বলে উঠলো–বাবুজী, আমার মাইয়াকে কেউ ধরিয়া নিয়া যাইতেছে। ঐতো হামার ম্যাইয়ার আওয়াজ পাইতেছি। বাবুজী ঐ যে দেখা যাইতেছে।
বনহুরের দৃষ্টি চলে গেলো সম্মুখের ভীড়ের দিকে কিছু দুরে। দেখলো একটা সাহেবী পোশাক-পরা লোক একটি ঘাগড়া-পরা মেয়েকে টেনে-হিঁচড়ে গাড়িতে তুলছে।
বনহুর মুহূর্তে নেমে পড়লো গাড়ি থেকে। দ্রুত এগিয়ে চললো ভীড় ঠেলে। কিন্তু সে গাড়ির নিকটে পৌঁছবার পূর্বেই লোকটা মেয়েটিকে গাড়ির মধ্যে তুলে নিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিলো।
থমকে দাঁড়ালো বনহুর।
সাপুড়ে ততক্ষণে নেমে এসে বনহুরের পা জাপটে ধরলো। বাবুজী বাঁচাইয়া নিন। ওকে বাঁচাইয়া নিন বাবুজী…
বনহুর কোনোদিকে লক্ষ্য না করে ক্ষিপ্রগতিতে এসে গাড়িতে চেপে বসলো, সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি উল্কা বেগে ছুটতে শুরু করলো।
সম্মুখের গাড়ি তখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে। গাড়িতে দু’জন আছে বুঝতে পারে বনহুর। কোনোদিকে না তাকিয়ে সামনের গাড়িখানাকে ফলো করে চললো সে। অগণিত ভীড়ের মধ্যে সাবধানে তাকে গাড়ি চালাতে হচ্ছে, কিন্তু সামনের গাড়িখানা যেন দৃষ্টির আড়ালে চলে না যায় সেদিকে বনহুরের তীব্র নজর রয়েছে।
