ইতিমধ্যে বীণা এসে গিয়েছিলো মাসুমার নির্দেশে। আর এসেছিলো চা-নাস্তা।
পরিবেশন করলো মাসুম।
মনিরার হাতে বীণার ঝঙ্কার উঠলো।
বিস্ময়ে তন্ময় হয়ে গেলো বনহুর, সুর তার সমস্ত মনকে আচ্ছন্ন করে ফেললো।
চা পান করছে বনহুর। রাত বেড়ে আসছে।
মনিরার হাতে বীণা আর থামতে চায় না।
বনহুর বিমুগ্ধ হয়ে গেছে।
মাসুমার দু’চোখ মুদে আসছে নিদ্রায়।
মনিরার হাত অবশ হয়ে আসে, তবু সে বীণা বাজিয়ে চলে। বীণা থেমে গেলে ওকে আর আটকে রাখতে পারবে না মনিরা। হয়তো সে ঘুমিয়ে পড়বে, সেই ফাঁকে পালিয়ে যাবে ও। না না, তা হবে না, বীণা তাকে বাজাতেই হবে।
মাসুমা সোফায় মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে।
মনিরা আসনে বসে বীণা বাজিয়ে চলেছে।
পাশের সোফায় বনহুর স্বয়ং বসে, তার দু’চোখে এক উন্মাদনা।
বীণার সুর তাকে আত্নহারা করে ফেলেছে যেন। আকাশ-বাতাস সব যেন মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে সে সুরে।
বনহুর উঠে দাঁড়ালো আসন ত্যাগ করে। তাকালো নিদ্রিত মাসুমার মুখের দিকে। এগিয়ে গেলো মনিরার পাশে। বসলো ঘনিষ্ঠ হয়ে, হাত রাখলো মনিরার হাতের উপর–বন্ধ করো আলেয়া তোমার বীণার সুর। আমাকে মুক্তি দাও…
মনিরার হাতে বীণা থেমে যায়।
বলে মনিরা–আজ তুমি মুক্তি পাবে না।
আলেয়া, আমাকে যেতেই হবে। রাত্রির ভয়ঙ্কর আসবে না। কোনো ভয় নেই তোমাদের।
ভয় আমরা করি না।
তবে কেন আমাকে এভাবে আটকে রাখলে?
আজ নয়, বলবো আর একদিন।
আমাকে যেতে দাও আলেয়া?
না।
সব নষ্ট করে দিলে?
আমি সব জানি, তোমাকে আজ ছেড়ে দিতে পারবো না। প্রাণ গেলেও না।
মনিরা আবার বীণায় ঝঙ্কার তুললো।
বনহুর ফিরে এসে বসলো তার আসনে। সিগারেট ধরালো।
মনিরা বীণা রেখে উঠে দাঁড়ালো।
মাসুমা আর জেগে থাকতে না পারায় চলে গিয়েছিলো নিজের ঘরে। শুয়ে পড়েছিলো বিছানায়, গোটা রাত জেগে থাকা তার পক্ষে অসহ্য।
বনহুর কখন যে সোফায় মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে।
মনিরা বীণা রেখে উঠে গিয়ে চাদরটা এনে বনহুরের শরীরে চাপা দিলো। মাথার নিচে একটি নরম বালিশ যত্ন সহকারে গুঁজে দিলো। তারপর বনহুরের মাথার চুলে ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে চললো।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো বনহুরের।
ঘুম ভাঙলেও সে ঘুমের ভান করেই শুয়ে রইলো। চোখ মেললো না সে।
মনিরা তখন তার মাথায় হাত বুলিয়ে চলেছে। কোমল মধুময় সে স্পর্শ।
বনহুরের শিরায় শিরায় একটা অনুভূতি আলোড়ন জাগালো। নিজেকে সে কিছুতেই ধরে রাখতে পারছে না যেন; তবু নিশ্চুপ রইলো, দেখবে কি করে আলেয়া। বনহুর নিজের ললাটে একটি উষ্ণ নিশ্বাস অনুভব করে। দুটি ওষ্ঠ স্পর্শ করে তার কপাল। ধৈর্যচ্যুত হয় না তবু সে।
ঠিক সে মুহূর্তে কোনো মসজিদ থেকে ভেসে আসে মোয়াজ্জেমের কণ্ঠ সুমধুর আযানধ্বনি।
ভোর হয়ে গেছে।
একি, আলেয়া তার পায়ে মাথা রেখে অশ্রু বিসর্জন করছে! আশ্চর্য হলো বনহুর। এবার বনহুর সোজা হয়ে বসলো, অবাক কণ্ঠে বললো–আলেয়া তুমি!
সঙ্গে সঙ্গে বোরখাধারিনী মনিরা ছুটে চলে গেলো।
স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো বনহুর। মনের মধ্যে নানারকম চিন্তা হতে লাগলো তার। আশ্চর্য মেয়ে আলেয়া, এমন মেয়ে তো সে কোনোদিন দেখেনি। তাকে ভালবাসে বলে অথচ ধরা দেওয়া বা নিজেকে কোনোসময় মুক্ত করে না তার সামনে।
বনহুর সোফা ছেড়ে উঠে পড়ে।
বাথরুমে প্রবেশ করে সে।
তারপর যখন বাথরুম থেকে ফিরে আসে তখন সে দেখতে পায় তার সোফায় একটা চিঠি পড়ে আছে। ভাঁজ করা একখানা কাগজ।
বনহুর কাগজখানা উঠিয়ে নেয় হাতে; ওটাতে লিখা আছে কয়েক লাইন—
বন্ধু, তোমাকে ধরে রেখেছিলাম কেন নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছো? আজ রাতে তোমার চৌকানিপুরে যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু সেখানে গেলে তুমি আর ফিরে আসতে না জানি। ওখানে তোমাকে হত্যার জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছিলো। তড়িতাহত হতে তোমাকে উদ্ধার করতে সক্ষম। হয়েছি বলে খোদার কাছে আমি হাজার শুকরিয়া করছি। তোমার –বান্ধবী
বনহুর চিঠিখানা হাতে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখের সম্মুখে ভাসতে লাগলো একটা মৃত্যু-বিভীষিকা রাত।
এমন সময় বাইরে মোটরের হর্ণ শোনা গেলো।
হলঘরে প্রবেশ করলেন হাশেম চৌধুরী। বনহুরকে দেখে খুশিতে আনন্দধ্বনি করে উঠলো– হ্যালো রঞ্জন বাবু, গুড মর্নিং।
গুড মর্নিং মিঃ চৌধুরী।
হাশেম চৌধুরী রিভলভারসহ বেল্ট খুলতে খুলতে বললেন–ওরা বুঝি আজ রাতে আপনার শরণাপন্ন হয়েছিলো?
হাঁ, দেখতেই পাচ্ছো। উনি না হলে উদ্ধার ছিলো আমাদের? কথাটা বলতে বলতে হলঘরে প্রবেশ করে মাসুমা। একটু থেমে বলে–কি হলো, পাকড়াও করেছে তোমার সেই রাত্রির ভয়ঙ্কর দস্যুটাকে?
হাশেম চৌধুরী বেল্টসহ রিভলভারখানা টেবিলে রেখে একটা সোফায় বসে পড়লেন, হাই তুলে বললেন–সব ব্যর্থ হয়েছে। এতো পরিশ্রম সব পণ্ড হয়ে গেছে।
বনহুর আলগোছে চিঠিখানা পকেটে রেখে বসে পড়লো। বললো সে–কেন সব পণ্ড হলো মিঃ। চৌধুরী?
আর বলবেন না, রাত্রির ভয়ঙ্করকে গ্রেফতারের জন্য আজ প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে চৌকানিপুরে একটা বাড়িতে কৌশলে ফাঁদ পেতেছিলাম। প্রায় বিশ হাজার টাকা খরচ করে সমস্ত বাড়িটার ইলেকট্রিক কারেন্ট দ্বারা তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি করা হয়েছিলো।
বনহুর অবাক হয়ে শুনছে, সত্যি তো এতোটা জানতো না। সে শুধু এটুকুই জানতো, চৌকানিপুরের ব্যবসায়ী হরিনাথ প্রায় কোটি টাকার মনি-মুক্তা ক্রয় করে এনেছে। তাই বনহুর প্রস্তুতি নিয়েছিলো ঐ মনি-মুক্তাগুলো হরিনাথের কবল থেকে উদ্ধার করে ছড়িয়ে দেবে যমুনার জলে, নয়তো দিল্লীর পথে পথে।
