এতো রাতে এলে কেন?
বন্ধু, আমাকে ফিরিয়ে দিও না।
আলেয়া, তুমি আমার মনে আগুন ছড়িয়ে দিয়েছো। তবু আমি তোমাকে ক্ষমা করলাম–যাও, যাও আলেয়া, ফিরে যাও তুমি।
বন্ধু, তুমি এত হৃদয়হীন!
আমি তার চেয়েও কঠিন।
কিন্তু একদিন আমার কাছে তুমি ধরা দিতে বাধ্য হবে।
আমি শুনতে চাই না তোমার কোনো কথা। যাও তুমি। তোমার মত মনোবৃত্তিসম্পন্না মেয়েকে আমি ঘৃণা করি।
বনহুরের কঠিন কথাগুলো মনিরার হৃদয়ে যেন সুধা বর্ষণ করলো। তার স্বামীর চরিত্র সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হলো আজ মনিরা। অনাবিল এক আনন্দ নিয়ে ফিরে এলো সে বাংলোয়।
*
কয়েকদিন বেশ কেটে গেলো।
একদিন সন্ধ্যায় মনিরা নিজের কামরা থেকে শুনতে পেলো মাসুমার কণ্ঠস্বর–রিভলভারে গুলী ভরে কোথায় যাচ্ছো শুনি?
চাপা স্বরে বললেন হাশেম চৌধুরী–চৌকানিপুরে যাবো। সেখানে এক বাড়িতে আজ রাত্রির ভয়ঙ্কর হানা দেবে বলে জানা গেছে।
কি বললে রাত্রির ভয়ঙ্কর হানা দেবে? মাসুমার গলার আওয়াজ কম্পিত মনে হলো!
হাশেম চৌধুরী বললেন–এটা আমাদের চক্রান্ত, বুঝলে? চৌকানিপুরের ব্যবসায়ী হরিনাথ আজ এক কোটি টাকা ব্যাংক থেকে উঠিয়ে কিছু হীরা-মনি-মুক্তা ক্রয় করেছে। এই হীরা-মনি-মুক্তা ক্রয় সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছে দিল্লীর নগরীতে। কাজেই রাত্রির ভয়ঙ্করের কানেও এ সংবাদ পৌঁছতে বিলম্ব হয়নি। নিশ্চয় সে ঐ মনি-মুক্তা সংগ্রহে সেখানে গমন করবে।
সর্বনাশ, পারবে তাকে গ্রেফতার করতে? শুনেছি সেই রাত্রির ভয়ঙ্কর নাকি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর
তার চেয়েও আমরা ভয়ঙ্কর ব্যবস্থা অবলম্বন করেছি। বাড়ির চারদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে। এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে বিদ্যুৎ নেই। নিশ্চয়ই আজ রাত্রির ভয়ঙ্করের শেষ রাত্রি। আজ সে তড়িতাহত হয়ে মৃত্যুবরণ করবে। সে টেরও পাবে না আমাদের এ ষড়যন্ত্রের কথা।
তাহলে রিভলভার কি হবে শুনি?
কোনো সময় অস্ত্র ছাড়া পথ চলতে নেই। এটা রেখে দিলাম হঠাৎ যদি কোনো প্রয়োজন বোধ করি তখন কাজে লাগবে।
মনিরার মুখ কালো হয়ে উঠলো। স্বামীর অমঙ্গল চিন্তায় মন তার অস্থির হয়ে পড়লো। কেমন করে আজ ওকে আটকানো যায়। সত্যি যদি চৌকানিপুরে যায় সে, তাহলে তড়িতাহত হয়ে মৃত্যুবরণ করবে তাতে কোনো ভুল নেই। যেমন করে হোক বাঁচাতেই হবে তাকে।
হাশেম চৌধুরী পোশাক পরে পুলিশ ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
মনিরা অমনি মাসুমার কক্ষে এসে হাজির হলো–হ্যাঁ রে, চৌধুরী সাহেব কোথায় গেলেন?
ও নাম করতে আমার ভয় হয়। রাত্রির ভয়ঙ্করকে গ্রেফতার করতে গেলো। কিন্তু কি যে হবে, আমার কিন্তু বড্ড ভয় করছে।
সত্যি, আমারও কিন্তু বড্ড ভয় হচ্ছে মাসুমা। হঠাৎ যদি সে আমাদের বাংলোয় হানা দিয়ে বসে! মানে উল্টা কাজ করে?
তাই তো, রাত্রির ভয়ঙ্করের অসাধ্য কিছু নেই।
এক কাজ করবি মাসুমা?
কি কাজ?
ওকে যদি ধরে এনে আজ রাতটা এখানে রাখা যেতো।
ঠিক বলেছিস মনিরা। এখন আমাদের আপন জন বলতে ঐ রঞ্জন বাবু ছাড়া আর কে আছে বল। হাঁ, ওকেই আনতে হবে। বাংলো পাহারা দেওয়াও হবে, পিয়ানো শোনাও হবে। সত্যি, ঠিক বুদ্ধি বের করেছিস্ মনিরা।
তাহলে চল্ যাওয়া যাক্।
হ চল্।
মনিরা আর মাসুমা স্বপনদের বাড়ি এসে হাজির হলো। কল্পনা তো ওদের দু’জনাকে দেখে আনন্দে উচ্ছল হয়ে উঠলো। স্বপন ছুটে গেলো রঞ্জন বাবুর ঘরেরঞ্জনদা, দেখবে এসো কারা এসেছেন!
বনহুর এলো, দেখলো মিসেস চৌধুরী আর বোরখাধারিনী এসে তাদের হলঘরে দাঁড়িয়েছে।
বললো মাসুমা–রঞ্জন বাবু, বিশেষ প্রয়োজনে এলাম আপনার কাছে।
আমার কাছে?
হাঁ, শুধু আপনার কাছে।
কেন বলুন তো?
আজ আমাদের বাংলোয় আপনাকে যেতে হবে।
অসম্ভব।
কেন?
আমার একান্ত প্রয়োজন আছে, একটু পরে বাইরে যেতে হবে।
এবার বোরখাধারিনী বলে উঠলো–আমাদের চরম বিপদ, না গেলেই নয়।
কিন্তু আমার পক্ষে আজ সম্ভব হবে না।
আর যদি সে-পথ বন্ধ হয়ে যায়?
বনহুর ক্রুদ্ধভাবে তাকালো বোরখাধারিনীর দিকে।
বোরখাধারিনী বললো–আমি বললাম আজ আমাদের বাংলোয় তোমাকে যেতে হবে। এসো, এক্ষুণি এসো আমার সঙ্গে।
স্বপন আর কল্পনা আশ্চর্য হয়ে গেছে।
মাসুমা কিন্তু মুখ টিপে হাসছে।
বনহুর বললো–আচ্ছা আপনারা যান, আমি যাবো।
তা হবে না, আমাদের সঙ্গে এসো। এসো বলছি,
চলুন…বনহুর অন্য সময় হলে বোরখাধারিনীকে তুমি বলে সম্বোধন করতো, কিন্তু এ মুহূর্তে সে তাকে আপনি বলে।
বনহুরসহ ফিরে এলো মাসুমা আর মনিরা বাংলোয়।
মাসুমা বললো–আমাদের বিপদকালে আপনি আমাদের সহায়। উনি নেই, আপনিই আমাদের ভরসা।
ভয় কি, পুলিশ ফোর্স আছে।
আপনার পিয়ানো শুনে রাত কাটিয়ে দেবো রঞ্জন বাবু।
উঁহু, আজ পিয়ানো বাজবে না আমার হাতে।
কেন?
মনের অবস্থা ভাল নেই।
তাহলে আমার বান্ধবীর বীণার সুর শুনুন। কি রে আলেয়া, রাজি আছিস তো?
উনি যখন পিয়ানো শোনাবেন না তখন আমি বীণা বাজাতে রাজি আছি। কিন্তু এক শর্তে আমি বীণা বাজাবো।
বল কি সে শর্ত?
আমি যতক্ষণ বীণা বাজাবো ততক্ষণ তোরা শুনবি। কারো ঘুমানো চলবে না কিন্তু।
মাসুমা বললো–বেশ আমি রাজি। কি বলেন রঞ্জন বাবু, আপনি?
আমার শরীর আজ ভাল নয়, কাজেই..
ও, আপনি তাহলে ঘুমাবেন এই তো? বেশ যতক্ষণ পারেন জেগে থাকবেন…নাও শুরু করো আলেয়া।
আলেয়া বোরখার মধ্য হতে তার সুন্দর সুকোমল হাত দু’খানা বের করে বীণাটা তুলে নিলো কোলের উপর।
