হাঁ, যা শুনেছো সব সত্য।
বলো আমার পরিচয় তুমি জানলে কি করে?
সে কথা আজ নয়, বলবো একদিন। বন্ধু, বলো তুমি আমার মুখ কোনোদিন দেখতে চাইবে না?
তা হলে তুমি সুখী হবে?
হাঁ, আমি সুখী হব। আর শপথ করছি, কাউকে কোনো দিন বলবো না তোমার পরিচয়।
বেশ, চাই না আমি তোমার মুখ দেখতে।
বাঁচালে বন্ধু।
রিভলভার সরিয়ে নাও।
তুমি যদি জোরপূর্বক আমার বোরখা উন্মোচন করো?
দস্যু বনহুর যা বলে তার অন্যথা করে না। তুমি আমাকে বিশ্বাস করো।
মনিরা বনহুরের বুকের কাছ থেকে রিভলভার সরিয়ে নেয়। সে জানে, তার স্বামী যা বলে তা মিথ্যা। নয়।
বনহুর বললো এবার–আলেয়া।
বলো?
আমাকে তুমি চেনো অথচ তুমি পুলিশ সুপারের আত্নীয়া হয়েও আমার পরিচয় তাকে জানাওনি কেন?
তোমাকে আমি ভালবাসি বলে।
আমাকে তুমি ভালবাসো? কিন্তু তাতে তোমার লাভ কি আলেয়া?
লাভ তোমার ভালবাসা পাবো বলে।
আলেয়া, তুমি বিবাহিতা। জানো না অপর পুরুষকে ভালবাসা তোমার পাপ?
যে নারীকে তার স্বামী অবহেলা করে, যাকে ত্যাগ করে স্বামী ভুলে থাকে সুদূর কোনো দেশে কি করে সে স্বামীর ভালবাসাকে আঁকড়ে ধরে একটা নারী জীবন কাটাতে পারে বলো?
আলেয়া!
তুমি জানো না, দিনের পর দিন আমি তার প্রতীক্ষায় প্রহর গুণেছি। কত রাত আমার কেটেছে অনিদ্রায়। কত রাত আমি তার পথ চেয়ে নীরবে অশ্রু বর্ষণ করেছি। তবু সে ফিরে আসেনি–নিষ্ঠুর পাষাণ সে।
দেশপ্রেমিক স্বামীর স্ত্রী তুমি, তাই তোমাকে এটুকু সহ্য করে নিতে হবে। তোমার স্বামী যে একজন মহান ব্যক্তি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আলেয়া, তুমি সৌভাগ্যবতী নারী।
না না, আমি অমন সৌভাগ্য চাই না। বন্ধু, আমাকে তুমি মিথ্যা সান্ত্বনা দিও না। আমার মন আছে, প্রাণ আছে। স্বামী-সংসার নিয়ে সুখে ঘর করি–এ সাধ আমারও আছে। দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে মনিরা।
এ কাদা তার অভিনয় নয়, স্বামীর সান্নিধ্য তার অন্তরকে বিচলিত করে তোলে। মনিরা যা বলে চলে সেকথা তার হৃদয়ের কথা। মিথ্যা সে বলেনি, সত্যই তার কথাই সে ব্যক্ত করে চলেছে।
বনহুর সত্যই সঙ্কোচিত হয়ে পড়ে, বলে সে–আলেয়া, নারীর স্বামীই যে সবকিছু। স্বামীর জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে দেওয়াই নারীর ধর্ম।
উঃ কি নিষ্ঠুর তুমি!
হাঁ, একথা সত্য। আলেয়া, আমিও কম অপরাধী নই। আমার জীবনটাও অত্যন্ত বেদনাভরা। আলেয়া, তুমি আমাকে অভিসম্পাত করো।
আমি চাই না তোমাকে অভিসম্পাত করতে। বলো তুমি আমাকে ভালবাসতে পারবে কিনা?
আমার জীবন সম্বন্ধে তুমি সব জানো না আলেয়া, তাই আমার মত একটা জঘন্য দস্যুর ভালবাসার জন্য তুমি লালায়িত হচ্ছে। তোমার স্বামীর চেয়েও আমি বেশি দোষী–বেশি অপরাধী।
হোক, আমি কিছু জানতে চাই না। আমি চাই তোমার মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দিতে।
আলেয়া, নিজেকে সংযত করো।
না, আমি তোমার জন্য পাগল হয়ে যাবো।
চলো তোমাকে বাংলোয় পৌঁছিয়ে দিয়ে আসি।
আমি বাংলায় যাবো না।
যাবে না?
না।
কোথায় যাবে?
তোমার সঙ্গে।
হেসে উঠলো বনহুর–আমার সঙ্গে? কিন্তু জানো আমার সঙ্গে গেলে তুমি নিজেকে গোপন রাখতে পারবে না?
তবু তুমি আমাকে গ্রহণ করবে তো?
আলেয়া-না না, তা হয় না।
কেন হয় না, আমি কুৎসিত কদাকার বলে?
না, আমি দস্যু কিন্তু শয়তান, পাপাচার নই। আলেয়া, তুমি আমাকে ক্ষমা করো।
বনহুর এবার ড্রাইভিং আসনে সোজা হয়ে বসে গাড়িতে স্টার্ট দিলো।
আলেয়া নিশ্চুপ বসে রইলো মূর্তির মত।
মনিরা বাংলোয় ফিরে এলো।
মাসুমা অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছিলো, মনিরাকে নিয়ে প্রবেশ করলো তার কক্ষে। বললো মাসুমা–কি ঘটলো বোন্ এবার?
মনিরা সব খুলে বললো।
মাসুমা আনন্দভরা কণ্ঠে বললো–তোর স্বামীকে আমি শ্রদ্ধা জানাই মনিরা। নির্জন পথে একটা নারীর প্রেমকে যে পুরুষ উপেক্ষা করতে পারে সে সত্যি কত বড় হৃদয়বান–কত বড় মহৎ-চরিত্র।
*
বনহুর বাসায় ফিরে গভীরভাবে চিন্তা করে, আজ নতুন করে মনে পড়ে তার মনিরার কথা। সত্যি কতদিন তার সংবাদ জানে না সে। সেও তো নারী, তারও তো মন আছে, প্রাণ আছে–স্বামী, সংসার। নিয়ে ঘর করার বাসনা আছে। ছিঃ ছিঃ কি ভুলই না সে করেছে। একটা নিষ্পাপ ফুলের মত জীবনকে সে এভাবে বিনষ্ট করে দিয়েছে। আজ মনিরার জন্য কোথাও বিয়ে হলে সে কত সুখী হতো! আর আজ। তার মনে অহরহ দুর্বিসহ জ্বালা বহন করে চলেছে। আবার কতদিন পর ফিরে যেতে পারবে সে কান্দাই শহরে, তবেই না তার দেখা হবে মনিরার সঙ্গে।
তবে কি মনিরাও আলেয়ার মত অপর কোনো পুরুষের কাছে প্রেমভিখারিনী! না, না, মনিরা সে রকম মেয়ে নয়, সে ধর্মশীলা নারী। তার মধ্যে পাপ বাসনা কোনোদিন উদয় হতে পারে না। মা আছেন, নূর আছেন, সরকার সাহেব আছেন….
বনহুর শয্যায় গা এলিয়ে দেয়।
রাত বেড়ে আসে।
আজ বনহুরের চোখে ঘুম নেই–আলেয়ার সান্নিধ্য তাকে মনিরার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। বার বার চোখের সম্মুখে ভেসে উঠেছে ঐ মুখখানা। কতদিন মনিরাকে দেখেনি সে।
বনহুর পায়চারী করছে।
সিগারেটের পর সিগারেট নিঃশেষ করে চলেছে সে।
রাত গম্ভীর হয়ে আসে।
হঠাৎ একটা ছায়ামূর্তি দেখতে পায় বনহুর। থমকে দাঁড়ায়, কোনো শব্দ উচ্চারণ করে না সে।
ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসে।
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বলে–আলেয়া তুমি!
হাঁ, পারলাম না থাকতে।
