মনিরা এবার এসে দাঁড়ায় মাসুমার পাশে–একি তামাসা শুরু করলি মাসু?
এই তো সবে শুরু। বলে হাসে মাসুমা।
বনহুর চলে গেলো বটে, কিন্তু তার মন সচ্ছ হলো না। সুযোগের প্রতীক্ষায় রইলো সে। যেমন করে লোক দেখবে–কে আছে ঐ বোরখার নিচে।
*
সন্ধ্যার পর আবার এলো বনহুর, এখন তার মুখমণ্ডল সকালের মত গম্ভীর নয়।
হাশেম চৌধুরী আজ সন্ধ্যায় বাসায় আছেন। তিনি রঞ্জন বাবুকে পেয়ে খুশি হলেন অনেক।
মাসুমাও আনন্দিত হলো।
ভিতরে গিয়ে মনিরার কানে মুখ নিয়ে বললো সে–মনিরা, ঔষধ ধরেছে।
মনিরা হাসলো শুধু।
সন্ধ্যায় চায়ের আসর জমলো ভাল।
হাশেম চৌধুরী বললেন–চলুন না আজ লেকের পানিতে নৌকা-ভ্রমণ করে আসা যাক।
খুশি হলো মাসুমা সত্যি কত দিন নৌকা ভ্রমণে যাওয়া হয়নি। আলেয়াও যাবে আমাদের সঙ্গে।
বনহুর অমত করতে পারলো না।
সবাই মিলে চললো ওর লেকের ধারে।
আজ বনহুর একটা কৌশল অবলম্বন করলো। সে দেখবে, কে ঐ বোরখাধারিনী। বনহুর নিজে একটা বৈঠা নিয়ে নৌকায় মাঝি হয়ে বসলো।
মনিরা বুঝতে পারলো স্বামীর মনোভাব। সে বললো–আমার শরীর বড় অসুস্থ লাগছে, নৌকায় যাবো না।
মনিরাকে কিছুতেই রাজি করানো গেলো না। শেষ পর্যন্ত মনিরাকে ছেড়েই ওরা নৌকা বিহারে গমন করলো।
ব্যর্থ হলো বনহুরের মনোভাব। সে ভেবেছিলো, আজ নৌকাডুবি করবে এবং উদ্ধারের ছলনায় বোরখাধারিনীর বোরখা উন্মোচন করে ফেলবে।
মনিরা তীরেই বসে রইলো, আর রইলো কয়েকজন মহিলা। অবশ্য মহিলাগণ সন্ধ্যা ভ্রমণেই এসেছিলো লেকের ধারে। মনিরা অল্পক্ষণে তাদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে নিলো।
গল্পসল্প করে কেটে গেলো কিছু সময়। ফিরে এলো ওরা।
বনহুরের মুখোভাব খুব সচ্ছ নয়, সবার কাছে বিদায় নিয়ে চলে গেলো সে।
মনিরা মাসুমার কানে মুখ নিয়ে কিছু বলে হাসলো। তারপর সবাই মিলে ফিরে চললো বাসার দিকে।
*
বনহুর গাড়ি রেখে নামতে যাবে এমন সময় গাড়ির আসনে একটা চিঠি পেলো সে। বুঝতে পারলো, নিশ্চয়ই বোরখাধারিনীর কাজ। কাগজের টুকরাটা উঁচু করে ধরলো চোখের সামনে। ওতে লিখা আছে দেখলো বনহুর
বন্ধু, সব আশা ব্যর্থ হলো, কেমন তাই নয় কি? নৌকাডুবি থেকে নিজেকে বাঁচাতে পেরেছি বলে নিজেকেই ধন্যবাদ দিচ্ছি–বান্ধবী।
বনহুর সোজা চলে গেলো নিজের ঘরে, রাগে-ক্ষোভে দাঁতে দাঁত পিষতে লাগলো। এতো বড় ধূর্ত মেয়ে বোরখাধারিনী! তার মনের কথা জানলো কি করে! আবার তার ঢং দেখো, আমাকে সে ভালবেসে ফেলেছে। সব শয়তানি, সব চালাকি।
বনহুর ওকে কি করে হাতের মুঠায় পাবে সে চিন্তা করতে লাগলো। যেমন করে লোক, বোরখাধারিনীকে একবার কৌশলে কোথাও নিয়ে যেতে হবে। তারপর কেমন করে তার খোলস খুলে ফেলতে হয় দেখে নেবে।
পরদিন মনিরা বাইরে যাবে বলে তৈরি হয়ে নিলো। মাসুমা আজ যাবে না, হাশেম চৌধুরীর শরীর অসুস্থ থাকায় সে আজ বাসায় রয়েছে।
মনিরা বোরখা পরেই গাড়িতে চেপে বসলো।
ড্রাইভিং আসনে উপবিষ্ট একজন পুলিশ ড্রাইভার। বললো মনিরা–চলো ফজলে এলাহির দোকানে।
বহুৎ আচ্ছা।
চমকে উঠলো মনিরা, এ কণ্ঠ যে তার চির পরিচিত। বললো মনিরা–একটু দেরী করো, আমার ব্যাগটা ফেলে এসেছি।
মনিরা গাড়ি থেকে নেমে গেলো।
মাসুমা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো–ব্যাপার কি? ফিরে এলে যে?
হেসে বললো মনিরা–বন্ধু ড্রাইভার সেজে এসেছে, কাজেই রিভলভারটা দাও, হঠাৎ যদি আত্নরক্ষার প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
ভ্যানিটি মধ্যে রিভলভার নিয়ে ফিরে আসে মনিরা। গাড়ির পিছন আসনে না বসে এবার বসলো ডে ড্রাইভিং আসনের পাশে।
ড্রাইভার গাড়িতে স্টার্ট দিলো।
ড্রাইভার বেরিয়ে এলো বাংলোর গেট পেরিয়ে।
দিল্লীর রাজপথ বেয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে। মনিরা লক্ষ্য করলো–গাড়ি সোজা পথে না গিয়ে একটা গলির মধ্যে প্রবেশ করলো।
সঙ্গে সঙ্গে মনিরা দক্ষিণহস্তে রিভলভার চেপে ধরলো ড্রাইভারবেশী বনহুরের পাঁজরে–খবরদার, একচুল বদমাইসি করলে মরবে।
বনহুর কল্পনাও করতে পারেনি, ছদ্মবেশ বুঝতে পারবে বোরখাধারিনী। হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে ফেললো, বললো–গাড়ি তো নেহি চলেগা বিবি সাব।
কোনোরকম চালাকি কোরো না, আমি জানি তুমি এমনিভাবে আমাকে বিপদে ফেলবে, তাই আমি প্রস্তুত হয়েই এসেছি।
গাড়ি নেহি চলেগা তব হাম কিয়া করেগা বিবি সাব?
তাহলে গাড়ি থেকে নেমে যাও।
বনহুর উঠতে যাচ্ছিলো।
মনিরা বললো–থামো।
বনহুর চুপ করে বসলো।
মনিরা দক্ষিণহস্তে রিভলভার বনহুরের পাঁজরে চেপে বামহস্তে তার পকেট হাতড়ে ওর ছোট্ট পিস্তলটা বের করে নিলো। তারপর বললো–গাড়ি চালাও।
গাড়ি নেহি চলেগা।
তবে কি মরতে চাও?
এবার বনহুর হেসে উঠলো–হাঃ হাঃ হাঃ কে তুমি নারী? তোমার কাছে দস্যু বনহুর আজ পরাজিত…বলো, বলো কে তুমি?
মনিরা বললো আমার পরিচয় জানতে তুমি পারবে না।
ভালবাসার বিনিময়েও তুমি..
না।
আমি জানি তুমি আমাকে ভালবাসো।
হাঁ বাসি, তাই বলে পরিচয় দিতে রাজি নই।
তুমি বান্ধবী, বন্ধুর কাছে আত্মগোপন করে লাভ?
বন্ধু, আমি তোমাকে ভালবাসি, কিন্তু আমার কুৎসিত মুখ তোমাকে দেখাতে পারবো না। তুমি আমাকে দেখলে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেবে।
তাই তুমি আমার কাছে আত্মগোপন করে থাকো?
হাঁ। আমি একজন অসহায় নারী। আমার জীবন অত্যন্ত বিষাদময়।
সব শুনেছি তোমার বান্ধবী মিসেস চৌধুরীর কাছে। সত্যই কি তোমার স্বামী…
