*
মাসুমার কাছে খুলে বলে মনিরা নিজকে অনেকখানি হালকা বোধ করে। এতোদিন তার বুকের মধ্যে যে একটা জমাট আনন্দ চাপা পড়ে ছিলো, আজ যেন সে আনন্দ-উৎস পথ পেয়ে হু হু করে বেরিয়ে আসে। খুশিতে উচ্ছল হয়ে উঠে মনিরা।
সকাল বেলা ঘর গোছাচ্ছিলো আর গুন গুন করে গান গাইছিলো মনিরা।
পা টিপে টিপে কক্ষে প্রবেশ করে মাসুমা। পিছন থেকে ওর চোখ দুটো ধরে ফেলে।
মনিরা হেসে বলে-মাসু।
চোখ ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায় মাসুমা, বলে সে–আজ যে বড় আনন্দময় দেখছি।
অধরে অধর মিলায়ে করিয়াছ সুধা পান।
তাই বুঝি এতো আনন্দ, এতো মধুময় গান?
মাসুমা সুর করে বললো কথাটা–কেমন তাই না?
যাও তুমি বড় দুষ্ট মাসুমা।
দাঁড়াও এবার কেমন দুষ্টামি করি, তখন আমাকে দুষ্ট না বলে বলবে লক্ষী বান্ধবী আমার।
আচ্ছা তখন দেখা যাবে।
শোন মনিরা…ওর কানে মুখ নিয়ে ফিস্ ফিস্ করে কিছু বললো মাসুমা।
হাসলো মনিরা।
এখানে দুই বান্ধবী মিলে যখন কথাবার্তা হচ্ছিলো, তখন বনহুর কেবলমাত্র ঘুম থেকে জেগে উঠে হাই তুলে ভাবছিলো, কই সে তো এলো না। তবে কি তার কথা মিথ্যা? হয়তো তাকে ধোকা দিয়েছে। হঠাৎ নজর পড়লো তার নিজের বুকে আলপিন আঁটা একটা কাগজের টুকরায়। তাড়াতাড়ি খুলে নিলো কাগজের টুকরাটা সে, মেলে ধরলো চোখের সামনে। নজরে পড়লো লেখাটা?
বন্ধু– এসে ফিরে গেলাম। কই আমার জন্য তুমি তো জেগে থাকনি? নিয়ে গেলাম আমার যা পাওনা।
বান্ধবী
বনহুর শয্যা ত্যাগ করে মেঝেতে নেমে দাঁড়ালো, বার বার পড়লো কাগজের টুকরায় লেখাটা। লজ্জায় বনহুরের মুখমণ্ডল আরক্ত হয়ে উঠলো। একটা মেয়ের কাছে তার এমন পরাজয়–একবার নয়, দুবার নয়–পর পর সে তাকে এভাবে জব্দ করে চলেছে। কে এই বোরখা পরিহিতা? যেমন করে হোক জানতেই হবে কে সে?
বনহুর বাথরুমে প্রবেশ করে ভাবে, কি তার পাওনা যা সে নিয়ে গেছে। আবার ঘরে ফিরে এসে তার জিনিসপত্র সব খুঁজে দেখে, না কিছুতো হারায়নি–সব ঠিক আছে। এমন কি তার সুটকেসের মধ্যে ছিলো প্রচুর টাকা-পয়সা আর সোনা। যেমন ছিলো তেমনি আছে।
আশ্চর্য হলো বনহুর।
চা-নাস্তা পর্ব শেষ করে বেরিয়ে পড়লো তখনই, চললো সে বাংলোর দিকে। আজ সে মিসেস চৌধুরীর কাছে জিজ্ঞাসা করবে–বোরখা পরা মহিলা কে, কি তার পরিচয়?
*
বাংলায় এসে হাজির হলো বনহুর।
মাসুমা আর মনিরা জানালায় দাঁড়িয়ে দেখলো।
মাসুমা মনিরার চিবুকে মৃদু টোকা দিয়ে বললো–দেখলি তো, যাদুকাঠির স্পর্শে আত্নহারা হয়ে ছুটে এসেছেন দেবকুমার।
হাসলো মনিরা।
মাসুমা বেরিয়ে গেলো তাড়াতাড়ি করে।
ড্রইংরুমে প্রবেশ করে বললো মাসুমা রঞ্জন বাবু যে, হঠাৎ অসময়ে।
রঞ্জন বাবুর মুখমণ্ডল গম্ভীর, বললো–বসুন, একটা কথা বলবো বলে অসময়ে বিরক্ত করতে এসেছি।
বিরক্ত নয়, খুশি হয়েছি অনেক। বলুন, তারপর খবর কি?
বসুন বলছি। বলবো বনহুর।
মাসুমা বয়কে ডেকে চা-নাস্তা আনতে বললো, তারপর আসন গ্রহণ করলো।
বললো বনহুর–মিসেস চৌধুরী, আজ আমাকে একটা কথা আপনি খুলে বলবেন আশা করি?
বলুন বলবো।
আপনার বান্ধবীর পরিচয় আমি জানতে চাই।
আমার বান্ধবীর পরিচয়?
হাঁ। বলুন কে সে? আর কেনই বা সে নিজেকে অমন করে আত্নগোপন করে রাখে?
এ কথা জানার জন্যই কি আপনি…
হাঁ হাঁ–বলুন কে সে? আমি সে কথাই জানতে এসেছি।
সে আমার বান্ধবী একথা আপনি জানেন। তার নাম যে আলেয়া একথাও আপনি জানেন। আরও জানেন আমার বান্ধবী পর্দানশীন মেয়ে।
না। তার আরও কোনো গোপন পরিচয় আছে।
আমার বান্ধবীর এমন কোনো গোপন পরিচয় নেই যা আমি জানি না। আমার বান্ধবী বিবাহিতা, তার স্বামী-পুত্র-সংসার এও আছে–তাও জানি। কিন্তু আপনি আজ হঠাৎ তার সম্বন্ধে এমন ভাবে প্রশ্ন করে বসবেন ভাবতে পারিনি।
বেয়াদবী মাফ করবেন, আমি আপনার বান্ধবীর কতগুলো আচরণে বেশ আশ্চর্য হয়েছি।
হাঁ, তা সত্য, ওর কতগুলো চাল-চলন আশ্চর্য বটে। যেমন, আজকালকার মেয়ে হয়ে সে বোরখা পরে। নিজে ভাল সঙ্গীত-চর্চা করতে পারে অথচ অপরের সঙ্গীত শুনে আত্নহারা হয়ে যায়। তারপর নিজের স্বামী থাকতে অপরজনকে যে ভালবাসতে পারে…রঞ্জন বাবু, আপনি শুনে অবাক হবেন না যেন। আমার বান্ধবী আপনার পিয়ানোর সুরে মুগ্ধ হয়ে আপনাকে ভালবেসে ফেলেছে।
বনহুরের ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে উঠে, বিশেষ করে মিসেস চৌধুরীর মুখে এ কথা তার মনে অসহ্য লাগে। গম্ভীর হয়ে বসে থাকে সে।
বলে মাসুমা–আপনি হয়তো ক্রুদ্ধ হচ্ছেন, কিন্তু আমার বান্ধবীর প্রেম পাওয়া পরম ভাগ্যের কথা।
ছিঃ আপনি এ সব কি বলছেন মিসেস চৌধুরী?
দেখুন যা সত্য তাই বলছি, আপনার অপরূপ সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছে রঞ্জন বাবু।
অধর দংশন করে বনহুর।
মাসুমা যখন এসব কথা বলছিলো, তখন মনিরা আড়ালে লুকিয়ে স্বামীর মুখোভাব লক্ষ্য করছিলো আর মুখ টিপে হাসছিলো সে।
মাসুমা বললো আবার–যদি ওর সঙ্গে চাক্ষুস পরিচয় করতে চান তবে আমি ওকে ডাকছি।
উঠে দাঁড়ালো বনহুর–যাক কাজ নেই আর চাক্ষুস পরিচয়ে। চলি তাহলে?
মাসুমাও উঠে দাঁড়িয়েছিলো, বললো এবার সে–ওকি, চা না খেয়েই যাবেন?
হা।
আমার বান্ধবীর পরিচয়টা…
থাক, দরকার নেই।
বসুন না আর একটু রঞ্জন বাবু।
এখন নয়।
তবে আবার আসছেন তো?
আসবো। বলে বেরিয়ে যায় বনহুর।
মাসুমা হাসে।
