মাসুমা, সংযতভাবে কথা বল?
আমি নিজের চোখকে অবিশ্বাস করতে পারি না।
মাসুমা!
হাঁ, আমি সব দেখেছি।
এবার মনিরা সরে এলো, মাসুমার পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালো, কাঁধে হাত রাখলো সে মাসুমার।
মাসুমা ক্ষিপ্রহস্তে মনিরার হাতখানা সরিয়ে দিয়ে বললো–অপবিত্র কলুষিত দেহে আমাকে স্পর্শ করিস না মনিরা। আমি যা দেখেছি, যা জেনেছি, এরপর আমাকে…
মাসুমা বোন, শোন, শোন বলছি…
না না, আমি কোনো কথাই শুনতে চাই না মনিরা। যা হবার হয়েছে। এমন জানলে তোকে আমি সঙ্গে করে কিছুতেই আনতাম না।
মাসুমা!
কালকেই আমি ওকে বলবো তোকে দেশে রেখে আসতে।
মাসুমা!
ভয় নেই, আমি আমার স্বামীর কাছে তোর সম্বন্ধে কোনো কথাই বলবো না।
মাসুমা স্থির হয়ে শোন। আমারও অনেক কথা তোকে বলবার আছে।
আমি সব জানি–আর শোনার মত প্রবৃত্তি আমার নেই।
মাসুমা, আমাকে ভুল বুঝিস না বোন।
ভুল! ছিঃ মনিরা, আমি তোকে অনেক সমীহ করতাম। তোকে আমি শ্রদ্ধা করতাম অন্তর দিয়ে। কিন্তু আজ যা দেখলাম…..
মাসুমা মাসুমা, ধৈর্য ধর বোন। আমি কোনো অসৎ কাজ করিনি। আমি কোনো অন্যায় করিনি মাসুমা। বিশ্বাস কর আমাকে।
মাসুমা কঠিন পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকে। মুখমণ্ডল গম্ভীর, স্থির দুটি আঁখি। নিশ্বাস দ্রুত বইছে।
মনিরা মাসুমার কাঁধে আবার হাত রাখলো।
চোখ দুটো তার অশ্রু ছলছল করছে। বললো মনিরা এবার–মাসুমা প্রথমেই তোকে কথাটা বললে আজ হয়তো এমন একটা বিভ্রাট ঘটতো না। মাসুমা, আমাকে তুই অবিশ্বাস করিস না বোন। আমি চরিত্রহীনা ব্যাভিচারিণী নই। রঞ্জন বাবুই আমার স্বামী,
মাসুমা বিস্ময়ে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো–রঞ্জন বাবু তোর স্বামী!
হাঁ, মাসুমা। আমি জানতাম ভারতবর্ষে এসে ওর সাক্ষাৎ পাবো।
তবে যে বলেছিলি তোর স্বামী সেনাপতি?
সে কথা মিথ্যা নয় মাসুমা, কিন্তু ও বড় খামখেয়ালী, বড় এক-গুয়ে। যখন যা খুশি তাই করে বেড়ায়। যা তার মন চায় করে। যেখানে তার মন চায় চলে যায়। ওকে ধরে রাখার সাধ্য কারো নেই।
এ সব কি বলছিস মনিরা?
সব সত্য। এতোটুকু মিথ্যা আমি বলবো না তোর কাছে। যদি খামখেয়ালী না হবে, তাহলে সুদূর কান্দাই থেকে এই দিল্লী নগরীতে সে এলো কি করে। আর মুসলমান নাম পাল্টে দিব্য হিন্দু নাম ধারণ করে স্বপন ও কল্পনার দাদা সেজে বসেছেই বা কি করে?
আশ্চর্য!
শুধু আশ্চর্য নয় মাসুমা অদ্ভুত। বড় রহস্যময় মানুষ সে! আমি ওকে প্রথম দিন থেকেই চিনতে পেরেছি। কেউ না চিনলেও আমার চোখে ও গোপন থাকতে পারবে না। আমি ওর স্ত্রী।
মনিরা, আমি যে বিশ্বাস করতে পারছি না তোর কথা।
সব শুনলে অবিশ্বাস করতে পারবি না মাসুমা। জানিস, ওর জন্য আমি আজ সর্বহারা পৃথিবীর হাসি, আনন্দ সব নীরস শুধু ওর জন্য। মাসুমা, তোর জন্যই আজ আমি খুঁজে পেয়েছি ওকে। আবার আমার জীবন পূর্ণতায় ভরে উঠেছে। আবার আমার মনে ফিরে এসেছে আনন্দের উৎস। মাসুমা, আমি ওকে দেখার পর থেকে কি করে সে নিজেকে শক্ত করে রেখেছি, আমি নিজেই জানি না।
মনিরা, তাই তোর এই বোরখা পরার ছলনা।
হাঁ, আমি এতো সহজে ওকে ধরা দেবে না বলেই ওর কাছ থেকে নিজেকে এভাবে গোপন রেখেছি।
এবার মাসুমার মুখে হাসি ফুটে উঠে। বলে মাসুমা, আমাকে তুই ক্ষমা কর বোন।
দোষ তোর নয় মাসুমা, দোষ আমার। অন্ততঃ তোকে বলাটা আমার উচিৎ ছিলো। কিন্তু তোকেও বলতে পারিনি। কেন পারিনি বলব?
বল্।
ভেবেছিলাম সবার কাছেই গোপন রাখবো এবং কত দূরে গিয়ে এর শেষ হয় দেখবো। আর দেখবো ওর ভিতরের রহস্য কি কারণে সে কান্দাই ছেড়ে চলে এসেছে এই সুদূর ভারতবর্ষে।
এবার সব বুঝেছি মনিরা। কিন্তু কই ওর কাছে নিজেকে তো গোপন রাখতে পারলি না?
রেখেছি। এখনও আমি ওকে আমার পরিচয় জানতে তো দেইনি।
তবে যে তুই…
ওঃ আমি গিয়েছিলাম তাই?
হাঁ।
মাসুমা…হাসলো মনিরা একটু, তারপর বললো আবার–মাসুমা, ও যে ঘুমিয়ে ছিলো।
কিন্তু মনিরা, আমাকে ক্ষমা কর–আমি সব দেখেছি।
ওঃ তাই? তবে শোন, আমি আজ সন্ধ্যায় মার্কেটে যাবো বলে বাইরে গিয়েছিলাম, মনে পড়ে?
হাঁ, কি সব আনতে গিয়েছিলি জানি।
সত্যি আমি মার্কেটে যাইনি, গিয়েছিলাম ওর ওখানে। আর যাবার সময় একটা ডাক্তারের দোকান থেকে কয়েকটা টাকা কম্পাউণ্ডারকে দিয়ে খানিকটা ক্লোরফরম ঔষধ সংগ্রহ করে নিয়েছিলাম। তারপর রঞ্জন বাবুর ঘরে প্রবেশ করে ছড়িয়ে দিয়েছিলাম তার বালিশে। তখন রঞ্জন বাবু বা স্বপন, কল্পনা কেউ ছিলো না বাসায়।
হুঁ, এবার বুঝেছি সব। মাসুমা মনিরার গালে মৃদু টোকা দেয়।
মনিরার মুখ এবার লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো, বললো–মাসুমা, আমার একটা অনুরোধ রাখতে। হবে তোকে।
একটা কেন, হাজারটা অনুরোধ রাখতে রাজি আছি। বল এবার?
তুই জানলি শুধু এ কথা, আর যেন কেউ না জানে। এমনকি হাশেম সাহেবকেও বলবি না কিছু।
না না, বলবো না, বলবো না। সত্যি, মনির সাহেব যে রঞ্জন বাবু সেজে বসে আছেন একেবারে কল্পনার বাইরে।
সেদিন গোটা রাত দুই বান্ধবী মিলে আর ঘুমাতে পারলো না। হাশেম চৌধুরী জরুরি কাজে সন্ধ্যার পর অফিসে গিয়ে আটকা পড়ে গিয়েছিলেন, তিনি ফিরে আর এলেন না সে রাতে। ফোনে জানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি; আজ আমার বাসায় যাওয়া হবে উঠবে না, তোমরা খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়ো।
মাসুমা আর মনিরার রাতভর চললো গল্প আর গল্প। কত কথা মনিরা স্বামীর সম্বন্ধে বলতে লাগলো, শুনতে লাগলো মাসুমা। গল্পের যেন শেষ নেই। সব কথা বললেও মিনরা একটি কথা গোপন করে গেলো, যে কথা কাউকে বলার নয়। তার স্বামী দস্যু বনহুর–এ কথাটা বললো না সে ওকে।
