আমারও কিন্তু খুব ঘুম পাচ্ছে আজ। মনিরাও উঠে নিজের কামরায় চলে গেলো।
মনিরা কক্ষে প্রবেশ করলো বটে, কিন্তু সে শয্যা গ্রহণ করলো না। সে ড্রেসিং টেবিলের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো।
মনিরা যখন ড্রেসিং টেবিলের সম্মুখে দাঁড়িয়ে নিজেকে সুন্দর করে সাজিয়ে নিচ্ছিলো তখন মাসুমা জানালার বাইরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলো আত্নগোপন করে।
আজ মাসুমার মনে সন্দেহ জেগেছিলো। মনিরার মধ্যে সে লক্ষ্য করেছিলো একটা আনমনা ভাব। বার বার যখন সে ঘড়ি দেখছিলো তখন মাসুমা আঁচ করে নিয়েছিলো–নিশ্চয়ই আজ মনিরা কিছু করবে। তাই ঘুমের ভান করে চলে গেলেও সে আসলে গেলো না, লুকিয়ে রইলো অন্ধকারে মনিরার কক্ষের পাশে।
শুধু আজ নয়, বেশ কিছুদিন হলো মাসুমা লক্ষ্য করছে মনিরার মধ্যে একটা পরিবর্তন বিশেষ করে রঞ্জন বাবু যেদিন প্রথম এসেছিলো সেই দিন হতে মনিরা যেন কেমন হয়ে পড়েছে। সবসময় অন্যমনস্ক হয়ে কি যেন ভাবে, রঞ্জন বাবু এলে সে সম্মুখে আসে না অবশ্য কিন্তু তার চোখেমুখে ফুটে উঠে এক আনন্দ উচ্ছ্বাস। তা ছাড়াও মাসুমা আরও লক্ষ্য করেছে–মনিরা আজকাল বড় উদাস হয়ে পড়েছে।
হাশেম চৌধুরী আজ জরুরি কোনো কাজে অফিসে আটকা পড়ে গেছেন। মাসুমার কোনো অসুবিধা হলো না, সে সর্তকভাবে লুকিয়ে মনিরার কার্যকলাপ দেখতে লাগলো।
মনিরা সজ্জিত হয়ে নিয়ে বোরখা পরে নিলো। তারপর বেরিয়ে এলো কক্ষ থেকে। আলগোছে। দরজা বন্ধ করে বাগানের দিকে অগ্রসর হলো।
মাসুমাও অনুসরণ করলো তাকে।
আজ সে দেখবে–মনিরা কি করে বা কোথায় যায়।
মনিরা যে-পথে অগ্রসর হলো সে-পথ নির্জন; এদিকে তেমন কোনো পাহারার ব্যবস্থা নেই। মনিরার জমকালো বোরখা মিশে গেলো অন্ধকারে।
মাসুমা গোপনে এগিয়ে চলেছে।
একি, মনিরা সোজা স্বপনদের বাড়ির দিকে অগ্রসর হলো।
মাসুমাও সাহস করে তাকে অনুসরণ করলো।
গাছের আড়ালে, কখনও বা দেয়ালের পাশ কেটে, কখনও বা লাইটপোস্টের ছায়ায় ছায়ায় এগিয়ে চললো মাসুমা।
মাসুমার বুক ঢিপ ঢিপ করছে, একটা দারুণ সন্দেহ তার মনকে অস্থির করে তুলছে। তার প্রিয় বান্ধবী মনিরা চরিত্রহীনা না না, এ কথা মনেও সে স্থান দিতে পারছে না।
কোথায় চলেছে মনিরা? তবে কি সে রঞ্জন বাবুর বাসায় যাচ্ছে? তাই তো মনে হচ্ছে। মাসুমা যা ভাবছিলো তাই হলো। মনিরা প্রবেশ করলো কল্পনাদের বাড়ির ভিতরে। পিছন দিকের সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো উপরে।
মাসুমাও চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে অগ্রসর হলো। মনিরা অদৃশ্য হতেই মাসুমা সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলো। একি, কোথাও তো ওকে দেখা যাচ্ছে না! মাসুমা জানে, এদিকের কক্ষটায় থাকে রঞ্জন বাবু।
মাসুমা অতি সন্তর্পণে এগিয়ে গেলো।
ঠিক রঞ্জন বাবুর ঘরের পাশে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। বুক ঢিপ ঢিপ করছে মাসুমার, সমস্ত শরীর ঘেমে চুপসে উঠেছে–এও কি সত্য! তার বান্ধবী মনিরা…ছিঃ ছিঃ ছিঃ ঘৃণায় মন তার বিষিয়ে উঠলো। এতোদূর এসেছে যখন–শেষ অবধি না দেখে যাবে না সে। জানালার পাশে সে দাঁড়িয়ে দৃষ্টি ফেললো কক্ষমধ্যে। সঙ্গে সঙ্গে মাসুমার দৃষ্টি আরষ্ট হয়ে গেলো, পা থেকে মাথা অবধি বিদ্যুৎ চমকে গেলো যেন। স্পষ্ট দেখলো–শয্যায় শায়িত রঞ্জন বাবুর মুখের উপর ঝুঁকে পড়েছে মনিরা, চুম্বন দিচ্ছে তার ঘুমন্ত মুখে! আশ্চর্য হলো মাসুমা, রঞ্জন বাবু যেমন আছে তেমনি রইলো–একটুও নড়ছে না সে!
আর দাঁড়াতে পারে না মাসুমা, সন্তর্পণে নেমে যায় সিঁড়ি বেয়ে। বাসায় ফিরে আসে, কিন্তু ঘুমাতে পারে না আর সে।
সমস্ত রাত কাটে অনিদ্রায়। ঘরময় পায়চারী করে মাসুমা। নিজের চোখকে যেন সে বিশ্বাস করতে পারে না। মনিরার সঙ্গে রঞ্জন বাবুর এতো গভীরতা–এ যেন তার কল্পনার বাইরে!
মাসুমা কক্ষমধ্যে পায়চারী করলেও দৃষ্টি তার ছিলো মনিরার কক্ষের দরজার দিকে। বেশ কিছু সময় কেটে গেলো, এতোক্ষণও ফিরে এলো না মনিরা।
মাসুমা ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে। বার বার হাতঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে সে। লজ্জায়-ক্ষোভে মাটিতে যেন মিশে যাচ্ছিলো মাসুমা। মনিরাকে সে কোনোদিন মন্দ মেয়ে বলে ভাবতে পারেনি, তাছাড়া তার চাল-চলন অতি সচ্ছ, সুন্দর ও স্বাভাবিক কিন্তু একি দেখলো সে আজ! রঞ্জনবাবু সুপুরুষ– যে কোনো নারী তাকে ভালবাসতে পারে, তাই বলে মনিরা বিবাহিতা মেয়ে হয়ে…না না,. এ হতে পারে না, এ হতে পারে না…
ঠিক সে মুহূর্তে কালো বোরখা-পরা মনিরা লঘু পদক্ষেপে তার ঘরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে দেখতে পেলো মাসুমা।
ক্রুদ্ধা নাগিনীর মত মাসুমা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো। এগিয়ে এলো তার পিছনে, কঠিন কণ্ঠে বললো– মনিরা!
থমকে দাঁড়ালো মনিরা, পিছনে তাকাবার সাহস হলো না তার। মাসুমা নিকটে সরে এলো, পূর্বের ন্যায় তীব্র কণ্ঠে বললো–মনিরা, ছিঃ ছিঃ ছিঃ আমি ভাবতে পারিনি তুই এত জঘন্য…
মনিরা এবার তাকালো মাসুমার দিকে, কিন্তু কোনো কথা সে উচ্চারণ করলো না বা করতে পারলো না। নির্বাক পুতুলের মত দাঁড়িয়ে রইলো স্থির হয়ে।
মাসুমা বলে চলেছে–আমি জানতাম মনিরা, তুই সচ্চরিত্রা মেয়ে কিন্তু…
এবার বললো মনিরা–মাসুমা!
এ কারণেই তুই ঢং করে রঞ্জন বাবুর সামনে না বেরিয়ে আড়ালে আড়ালে এতোদূর অগ্রসর হয়েছি, তার সঙ্গে গোপনে প্রেম করছি…
