ভীড় ঠেলে এগিয়ে গেলো স্বপন আর কল্পনা।
কেশব মাদল বাজাচ্ছিলো।
নাচছিলো নূরী।
নূরীর চরণের নুপুর ধ্বনি আর গানের সুর পথের লোকজনদের বিমুগ্ধ করে ফেলেছিলো। সবাই ভীড় জমিয়ে দেখছিলো ওর নাচ।
স্বপন আর কল্পনা ভীড় ঠেলে এসে দাঁড়ালো। ওরাও মুগ্ধ হয়ে গেলো নূরীর নাচ আর গান শুনে।
বনহুর তখন গাড়িতে বসে ধুম্র উদগীরণ করে চলেছে, সে জানে না–তারই নূরীর কণ্ঠ এটা, তার নূরীরই চরণধ্বনি তাকে আনমনা করে তুলেছে। নীরবে বসে বসে শোনে সে।
ওদিকে নূরী নাচে-গায় আর দৃষ্টি তার খুঁজে ফেরে লোকের মুখে মুখে–কোথায় তার হুর।
কেশব মাদল বাজায়।
এক সময় ফিরে আসে স্বপন আর কল্পনা, গাড়িতে চেপে বসে।
বনহুর গাড়িতে স্টার্ট দেয়।
কল্পনা বলে–রঞ্জনদা, তুমি যদি দেখতে সত্যি মুগ্ধ হয়ে যেতে।
তাই নাকি? ড্রাইভিং আসন থেকে বলে বনহুর।
হাঁ, সত্যি আশ্চর্য। বললো স্বপন।
কি আশ্চর্য? জিজ্ঞাসা করলো বনহুর।
স্বপন বললো–সবই।
তার মানে?
মানে যেমন নাচ, তেমনি গান, তেমনি রূপসী..
হেসে উঠে বনহুর রূপসীকে মনে ধরলো নাকি?
দ্যুৎ, কি যে বলেন! বললো স্বপন।
কল্পনা বললো–সত্যি রঞ্জনদা, অমন সুন্দরী মেয়ে আমি আর দেখিনি।
ওঃ তুমিও দেখছি নাচনেওয়ালীর রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছো।
শুধু আমি নই, সত্যি রঞ্জন দা আপনি যদি দেখতেন!
সর্বনাশ, আমি তাহলে না গিয়ে ভালই করেছি, কি বলো?
ঠকেছেন আপনি। বললো কল্পনা।
এ্যা, ঠকেছি তাহলে? যাক, ভাগ্য যদি থাকে তবে আর একদিন বরাৎ হয়ে যেতে পারে। এইতো রূপসী মহল এসে গেছে, চলো।
গাড়ি রেখে নেমে পড়লো বনহুর, স্বপন আর কল্পনা। টিকেট করে প্রবেশ করলো হলের মধ্যে।
তখন টাইটেল দেখানো হচ্ছে, হল অন্ধকার।
আসন গ্রহণ করলো বনহুর, স্বপন আর কল্পনা। বনহুর অন্ধকারেই লক্ষ্য করলো তার পাশেই বসে আছে একজন নারী এবং সে বোরখা পরা!
বনহুর লক্ষ্য করলেও স্বপন আর কল্পনা করেনি।
একটা গভীর সন্দেহ বনহুরের মনে দানা বেঁধে উঠলো। তবে কি পুলিশ সুপারের বাড়ির সেই মহিলা গোয়েন্দা এটা? আজ বনহুর একে হাতে-নাতে শায়েস্তা করে তবে ছাড়বে।
ছবি শুরু হলো।
একটা ইংলিশ পিকচার দেখানো হচ্ছে। ফাইটিং চিত্র। বনহুরের ছবি দেখা অভ্যাস নেই, ফাইটিং চিত্র দেখে সে তন্ময় হয়ে গেলো।
যখন ছবি শেষ হলো ফিরে তাকিয়ে দেখলো বনহুর, ওদিকের আসন শূন্য-বোরখাধারিনী নেই! কিন্তু নজর পড়লো একটা কাগজের টুকরা পড়ে আছে সে আসনের উপরে।
বনহুর এগিয়ে গেলো, সকলের অলখ্যে কাগজের টুকরাটা তুলে নিলো হাতে। মাত্র এক লাইন লেখা কাগজের টুকরায় ও
রাত একটায় আমি আসবো তোমার ঘরে, দরজা খুলে রেখো। –বান্ধবী।
কাগজের টুকরাটা পকেটে রেখে হাসলো বনহুর। বান্ধবীই বটে না-হলে তাকেও নাকানি-চুবানি খাইয়ে ছাড়ছে। আজ আবার কি মতলব নিয়ে আগমন করবে তাই বা কে জানে!
*
মনিরা সোজা এসে হাজির হলো স্বপনদের বাড়িতে। অন্দর বাড়িতে প্রবেশ করে ডাকলো– কল্পনা…কল্পনা….
ব্যস্তভাবে এগিয়ে চলো চাকর-বাকরের দল, বললো তারা–ওরা তো বাসায় নেই।
মনিরা বললো–কখন আসবে তোমরা জানো?
একজন উত্তর দিলো–ঠিক করে আমরা বলতে পারছি না, আপনি বসুন, ওরা হয়তো এক্ষুণি এসে পড়বে।
না, আমার বসবার সময় নেই, তবে রঞ্জন বাবুর সঙ্গে জরুরি একটা দরকার ছিলো। তা একটা কাগজ আর কলম দাও তো, লিখে রেখে যাই?
আমরা চাকর-বাকর মানুষ–কাগজ আর কলম কোথায় পাবো। আপনি বরং উনার ঘরে টেবিলে কাগজ-কলম সব আছে, লিখে রেখে যান।
সেই ভাল…মনিরা এটাই চাইছিলো। সে বিলম্ব করলো না, বনহুরের কক্ষে প্রবেশ করে চারদিকে তাকালো। সর্বত্র স্বামীর হস্তের ছোঁয়া যেন ছড়িয়ে আছে। বিছানায় হাত রেখে অনুভব করলো। বালিশটা তুলে গালে-মুখে-কপালে ছোঁয়ালো। তারপর আলনায় ঝুলিয়ে রাখা জামাটা তুলে চেপে ধরলো বুকে সমস্ত অন্তর দিয়ে অনুভব করলো স্বামীর স্পর্শ। টেবিলে এসে কাগজ আর কলম তুলে নিলো, কিন্তু কিছু লিখলো না সে। কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাবার সময় শুধু বালিশে ছড়িয়ে দিলো খানিকটা গুড়োর মত পাউডার।
চাকর-বাকরদের কাছে বিদায় নিয়ে চলে গেলো মনিরা।
মনিরা চলে যাবার কিছু পরে ফিরে এলো বনহুর, স্বপন আর কল্পনা।
রাত হয়ে গিয়েছিলো অনেক, কাজেই সেদিন আর কোনো গল্প-সল্পের আসর না জামিয়ে খাওয়া দাওয়া শেষ করে যে যার শোবার ঘরে চলে গেলো।
স্বপন আর কল্পনা চলে গেলে, বনহুর প্রবেশ করলো নিজের কক্ষে। বনহুর আবার পকেট থেকে বের করে পড়লো চিঠির টুকরাটা। হাসলো বনহুর আপন মনে, আজ সে দেখে নেবে–কে ঐ বোরখাধারিনী। বিছানায় শুয়ে ঘুমের ভান করে থাকবে, তারপর সে যখন এসে দাঁড়াবে তার বিছানার পাশে, তখন আচমকা ওর হাতের রিভলভার কেড়ে নিতে হবে অত্যন্ত বুদ্ধিমতী এ নারী, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নইলে তার মত দস্যুকেও নাকানি-চুবানি খাওয়াতে পারে কোনো নারী!
হাতঘড়ির দিকে তাকায় বনহুর, একটা বাজতে আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকী। বনহুর রিভলভারটা বালিশের তলায় রেখে চুপচাপ শুয়ে পড়লো বিছানায়। বালিশে মাথা রেখে পাশ ফিরে শুলো। একটা সুমিষ্ট গন্ধ অনুভব করলো বনহুর।
তারপর ধীরে ধীরে তার চোখের পাতা বন্ধ হয়ে এলো।
মনিরা বার বার তাকাচ্ছে দেয়ালঘড়ির দিকে।
মাসুমা বললো–যাই, বড়ড় ঘুম পাচ্ছে।
