বললো বনহুর–তাই বুঝি বান্ধবীর প্রতি এতো দরদ আপনার?
মিথ্যা নয় রঞ্জন বাবু, মাসুমা বান্ধবীর নামে পাগল। দেখছেন না কেমন নিজের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। কথাটা বললেন হাশেম চৌধুরী।
মাসুমা ক্রুদ্ধ হবার ভান করে বলেছিঃ ও যদি শোনে তাহলে কি মনে করবে বলো তো? আপনি ওর কথা শুনবেন না রঞ্জন বাবু। জানেন, আমার বান্ধবী অনেক বড়ঘরের মেয়ে। কোটি কোটি টাকার ঐশ্বর্য তার আছে। শুধু তার মনে শান্তি নেই এবং সে কারণেই আমি ওকে সঙ্গে এনেছি…
বলেই ফেলো না, এতোই যদি বললে। বললেন হাশেম চৌধুরী।
বনহুর বিপুল আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে, তার মনেও যে এ কথা জানার প্রবল বাসনা।
বলতে শুরু করে মাসুমা আমার বান্ধবী বিবাহিতা।
কি বললেন, আপনার বান্ধবী বিবাহিতা?
হাঁ, রঞ্জন বাবু।
তার স্বামী…সংসার…
সে কথাই আপনাকে বলবো। আমার বান্ধবীর স্বামী সেনা বিভাগের সেনাপতি। স্ত্রীর প্রেমের চেয়ে তার কাছে দেশপ্রেম অনেক শ্রেয়। কাজেই সেনাপতি তার দেশ নিয়ে মেতে থাকেন দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। আর আমার বান্ধবী স্বামীর প্রেমে আত্নহারা, সে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত প্রতীক্ষা করে তার স্বামীর; কিন্তু হতভাগ্য স্বামী কোনোদিন তার স্ত্রীকে স্মরণ করে না।
অবাক হয়ে শুনছিলো বনহুর মাসুমার কথাগুলো। নিশ্চুপ নিস্পন্দ হয়ে শুনে চলেছে সে, কেমন যেন অসাড়ের মত।
মাসুমা বলে যাচ্ছে–অপদার্থ স্বামী বুঝলো না তার সতী লক্ষ্মী স্ত্রীর মর্যাদা। স্ত্রীর প্রেম-প্রীতি আর ভালবাসা কোনোটাই তাকে ঘরে বন্দী করে রাখতে পারলো না।
বনহুর নিজের মনে কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করছে। মাসুমার কথাগুলো তারই অন্তরে এসে বিদ্ধ হচ্ছিলো যেন।
মাসুমা যখন বনহুরের কাছে সব বলছিলো তখন বাগানের একটা হাহানার ঝাড়ের আঁড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলো মনিরা, সে লক্ষ্য করছিলো স্বামীর মুখোভাব। মাসুমাকে মনিরা শত শত ধন্যবাদ দিচ্ছিলো অন্তরে অন্তরে।
বলে চলেছে মাসুমা–আমার বান্ধবীর মত মেয়েকে যে স্বামী তুচ্ছ জ্ঞানে ভুলে থাকতে পারে, তার মত হতভাগ্য স্বামী আর কে আছে বলুন?
হাঁ সত্যি বলেছেন মিসেস চৌধুরী। হতভাগ্য স্বামীই বটে।
মনিরা উপলব্ধি করে বনহুরের অন্তরের ব্যথা। সে দেখে, ওর চোখ দুটো কেমন সকরুণ হয়ে। উঠেছে। সুন্দর ললাটে ফুটে উঠেছে গভীর চিন্তার ছাপ। আর কেউ না বুঝলেও মনিরা বুঝতে পারলো ওর মনের কথা।
মাসুমা বলে চলে–তাই বেচারী বড় মনমরা হয়ে থাকে। কোনো সময় তার মনে আনন্দ নেই। স্বামীর বিরহে বিরহিনী…ব্যথা-ভরা একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক চিরে।
হঠাৎ বনহুর লক্ষ্য করলো, হাহানার আঁড়াল থেকে সরে গেলো একটা ছায়ামূর্তি। আনমনা হয়ে পড়লো সে, তাহলে বোরখাধারিনী এতোক্ষণ আঁড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনেছিলো। সব যেন কেমন রহস্যপূর্ণ মনে হয়।
*
মাসুমার অনুরোধে পিয়ানো বাজাতে হয় বনহুরকে।
ড্রইংরুমে বসে পিয়ানো বাজাচ্ছিলো বনহুর। হঠাৎ তার দৃষ্টি চলে যায় ওদিকের জানালায়। দেখতে পায়–এক জোড়া ব্যাকুল আঁখি স্থিরভাবে তাকিয়ে আছে তার দিকে। বনহুরের দৃষ্টি ওদিকে পড়তেই সরে গেলো জোড়া আঁখি দুটি।
বনহুরের দৃষ্টি ফিরে এলো পিয়ানোর বুকে, কিন্তু হাতখানা মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠলো তার।
পিয়ানো বাজানো শেষে বনহুর বিদায় নিয়ে যখন গাড়ির দিকে পা বাড়ালো তখন আবার সে লক্ষ্য। করলো-দরজার আঁড়াল থেকে কেউ যেন তাকিয়ে আছে তার দিকে।
গাড়িতে বসে বনহুরের মনে নানারকম চিন্তার উদ্ভব হতে লাগলো! বোরখাধারিনী কে? কি চায়। সে তার কাছে? শুধু আজ নয়, আরও অনেক দিন সে লক্ষ্য করেছে দুটি ব্যাকুল আঁখি তাকে যেন অন্বেষণ করে ফিরছে। বনহুর বুঝতে পেরেছে–ও আঁখি দুটি অন্য কারো নয়–ঐ বোরখাধারিনীর। কিন্তু কেন, কেন সে অমন করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে? মিসেস চৌধুরী বললেন তার বান্ধবী বিবাহিতা…বিবাহিতা নারীর পক্ষে কোনোসময় উচিৎ নয় এসব, তবে কি মিসেস চৌধুরীর বান্ধবী চরিত্রহীনা।
কল্পনা আর স্বপন ধরে বসলো এতো শীঘ্র বাসায় ফিরবে না, বেড়াতে যাবে কোথাও।
অগত্যা বনহুর রাজি হলো কিন্তু কোথায় যাওয়া যায়। স্বপন বললো যমুনা তীরে আর কল্পনা ধরলো সিনেমায় যাবে। শেষ পর্যন্ত কল্পনার কথাই মেনে নিতে হলো স্বপনকে। বনহুরও রাজি হয়ে গেলো। অনেক দিন ছবি দেখা হয়নি তার, কাজেই বেশি আপত্তি করলো না বনহুর।
দিল্লীর শ্রেষ্ঠ ছবিঘর রূপসী মহল। বনহুরের গাড়ি রূপসী মহলের দিকে অগ্রসর হলো।
আনন্দ ধরে না কল্পনার।
স্বপনও খুশি হয়েছে।
বনহুর স্বয়ং ড্রাইভ করছিলো।
হঠাৎ বনহুর দেখলো–পথের এক জায়গায় লোকজন ভীড় করে কিছু দেখছে।
বনহুর গাড়িখানার স্পীড কমিয়ে দিলো। শোনা গেলো একটা সুমিষ্ট সুর আর তার সঙ্গে নুপুর ধ্বনি।
কল্পনা আর স্বপন আগ্রহভরা নয়নে দেখার চেষ্টা করলো, কিন্তু এতো ভীড়ের চাপে ওরা কিছু দেখতে পেলো না।
কল্পনার বড় সখ সে দেখবে।
বনহুর বললো–যাও, তাহলে দেখে এসো গিয়ে। স্বপন, তুমিও যাও।
আর আপনি? বললো কল্পনা।
আমি এখানে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছি, তোমরা দু’জনা যাও, দেখে এসো গে।
কল্পনা আর স্বপন নেমে গেলো গাড়ি থেকে।
বনহুর ড্রাইভিং আসনে বসে সিগারেট কেসটা বের করে একটা সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করলো।
