হীরালাল তার ছোরাখানা কোমরের ফাঁকে খুঁজে রেখে বেরিয়ে যায়।
নূরীর চোখে ঘুম আর আসে না, তার মনের আকাশে তখন চিন্তার জাল ছড়িয়ে পড়ে। কোথায় তার হুর, এতোবড় শহরের বুকে আর কত তাকে খুঁজে ফিরবে! দিনের পর দিন চলে যাচ্ছে, কত জায়গাতেই না নূরী আর কেশব ঘুরে ফিরেছে–সাপ খেলা দেখিয়েছে। নাচ দেখিয়ে পয়সা উপার্জন করেছে: কিন্ত নজর তার সব সময় অম্বেষণ করে ফিরেছে প্রতিটি লোকের মুখে মুখে, খুঁজেছে তার বনহুরকে।
কত আশা নিয়েই না রোজ বের হয় ওরা, ভাবে আজ নিশ্চয়ই তার সন্ধান পাবে। যে বেশেই। থাক নূরীর চোখে ধুলো দিতে পারবে না সে। শহরের প্রতিটি রাস্তায় বাড়ি বাড়ি সাপ খেলা দেখিয়েছে। প্রতিটি দোকানে দোকান, হোটেলে হোটেলে, ক্লাবে–সব জায়গায় ফিরেছে; কিন্তু তার দেখা পায়নি। তবে কি বনহুর আবার ফিরে গেছে তার আস্তানায়! নূরী শুয়ে শুয়ে ভাবে এসব। তারপর এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে।
*
কেশবও ঘুমিয়ে পড়েছে।
রংলাল চলে যায় তাদের আস্তানা ছেড়ে। আর ফিরে আসার সাহস তার হয় না। কিন্ত চলে গেলেও রাগ তার কমে না একটুও।
বরং নূরীকে হস্তগত করার জন্য সে উন্মত্ত হয়ে উঠে। গোপনে সে কৌশল অবলম্বন করে–কেমন করে প্রতিশোধ নেবে হীরালালের উপর, কেমন করে কেশবকে পথ থেকে সরাবে, কেমন করে নূরীকে করবে আত্মসাৎ।
রংলাল ক্ষিপ্তের ন্যায় অস্থির হয়ে পড়েছে। সে বিষাক্ত সর্প জোগাড় করেছে, সে সর্প দিয়ে হত্যা করবে কেশবকে, হত্যা করবে রংলালকে। সূতীক্ষ্ণ ছোরা সংগ্রহ করেছে; বাধা দিতে আসবে যে, তাকে খতম করবে।
সাপুড়ে রংলাল ভীষণ রুদ্রমূর্তি ধারণ করলো। আস্তানা থেকে বাইরে যেয়ে সে নানাভাবে বুদ্ধি। আটতে লাগলো কিভাবে সে ওদের সর্বনাশ করবে।
কেশব আর নূরী প্রতিদিনের মত সেদিনও সাপ খেলা দেখাতে বের হয়। আজ আবার নূরী ও কেশব যায় পুলিশ সুপারের বাংলোয়।
নূরী আর কেশবকে দেখে খুশিতে আত্মহারা হলো মাসুমা আর মনিরা।
হাশেম চৌধুরীও আনন্দিত হলো ওদের দেখে, হেসে বললো কিরে, তোরা এতোদিন পর এলি?
কেশব বললো–বাবুজী, আমরা বহু দূরে থাকি। এক একদিন এক একদিকে চলে যাই। এদিকে এলে তবে তো আসবো!
বেশ, এসেছিস যখন সাপ খেলা দেখা।
হাঁ বাবুজী, দেখাচ্ছি। বললো কেশব।
ওরা দুজনে মিলে সাপ বের করলো।
বাঁশি বাজাতে লাগলো কেশব। নুরী সাপ খেলা করতে লাগলো।
দাঁতভাঙ্গা বিষধর সাপ, তাই নূরী আর কেশব সহজেই ওদের বশে আনতে পারতো।
নূরী বাঁশির সুরে সুরে মিলিয়ে গান গায়।
মনিরা আর মাসুমা মুগ্ধ হয়ে যায়।
হাশেম চৌধুরীও বিমুগ্ধ হয়। এমন সুমধুর সুর জীবনে বুঝি শোনেনি তারা।
খেলা শেষ হলে হাশেম চৌধুরী দশ টাকার একখানা নোট দেন কেশবের হাতে।
মনিরা আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলো; সে নিজের কণ্ঠ থেকে খুলে দেয় চেন মালাটা, যে মালার লকেটে আছে তার আর বনহুরের ছোট্ট বেলার ফটো দুটো।
এ মালা মনিরা সব সময় গলায় পরে থাকতো। বিশেষ করে বনহুরের সঙ্গে তার মিলন হবার পর থেকে কোনোদিন এ মালা সে গলা থেকে খোলেনি।
আনন্দের আতিশয্যেই মালাটা মনিরা তুলে দেয় নূরীর হাতে! নূরী খুশি হয়ে গলায় পরে সেটা।
কিন্তু পরক্ষণেই মনিরা নিজের ভুল বুঝতে পারে। নূরী তখন মালাটা গলায় পরে নিয়েছে, খুশিতে চোখ দুটো তার দীপ্ত উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
মনিরা মালাটা আর ফিরিয়ে নিতে পারে না।
নূরী আর কেশব খুশি হয়ে চলে যায়।
ঠিক সে সময় বাংলোর গেটে বনহুরের গাড়ি এসে থামলো। কল্পনা ও স্বপনকে নিয়েই এসেছে সে।
মাসুমা বললো–রঞ্জন বাবু এসেছেন।
মনিরা আর মুহূর্ত বিলম্ব না করে বাগানবাড়ি থেকে উঠে গেলো ভিতরে।
মাসুমা আর হাশেম চৌধুরী এগিয়ে গেলো।
বনহুর, স্বপন আর কল্পনা গাড়ি থেকে নেমে বাগানের দিকে অগ্রসর হলো।
হাশেম চৌধুরী বললো–হ্যালো রঞ্জন বাবু।
বনহুর এগিয়ে এসে করমর্দন করলো পুলিশ সুপারের, তারপর হেসে বললো–কেমন আছেন ভাবী?
বনহুর মাসুমাকে ভাবী বলে ডাকতো।
কল্পনা আর স্বপন ডাকতো বৌদি বলে।
বনহুরের কথায় বললো মাসুমা–খুব ভাল আছি। আপনি কেমন আছেন রঞ্জন বাবু?
আসন গ্রহণ করতে করতে বললো বনহুর–রাত্রির ভয়ঙ্করের ভয়ে সব সময় আতঙ্কিত।
মাসুমা বললো–তাতো হবেই, যাদের প্রচুর অর্থ-ঐশ্বর্য তাদের আতঙ্কিত হবার কথাই যে। তা যাই বলুন–আজ পিয়ানো শোনাতে হবে। রঞ্জন বাবু, শুধু আপনার হাতে পিয়ানো শুনব বলেই আমি পিয়ানো কিনেছি।
বনহুরের মুখে একটা হাসির আভাস ফুটে উঠলো, বললো–আমার মত ভাগ্যবান কে আছে বলুন। পুলিশ সুপার-স্ত্রী আমার পিয়ানোভক্ত।
শুধু আমিই আপনার পিয়ানোভক্ত নই রঞ্জন বাবু। আমার বান্ধবী আলেয়া আপনার পিয়ানোর সুরে আত্মহারা।
মৃদু হেসে বলে বনহুর–তাই নাকি!
হাঁ, শুধু আত্নহারাই নয় রঞ্জন বাবু। একেবারে সম্বিৎহারা…কথাটা বলে হাসেন হাশেম চৌধুরী।
মাসুমা বলে রঞ্জন বাবু, আপনি আলেয়াকে জানেন না, বড় হাসি-খুশি আর আনন্দ প্রিয়…
কিন্তু তাকে বড্ড বেরসিক মনে হয়। বললো বনহুর।
কেন?
আজকাল কেউ অমন বোরখা পরে নাকি?
ওঃ, তাই বলছেন বড় বেরসিক? আপনি ওর সম্বন্ধে কিছুই জানেন না রঞ্জন বাবু। আমার বান্ধবীর মত মেয়েই হয় না, বেচারী বড় অসুখী। একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে মাসুমা।
বলে উঠে কল্পনা–সত্যি আলেয়াকে দেখলে কেমন মায়া হয়। সব সময় তার মুখমণ্ডল কেমন যেন চিন্তাযুক্ত লাগে।
