মনিরা অন্ধকারে আত্মগোপন করে দেখছে স্বামীর কাণ্ডকলাপ।
তার স্বামী যে দস্যু এ কথা সে জানে কিন্তু তার কার্যকলাপ তো কোনোদিন দেখেনি। অবাক হয়ে দেখে মনিরা।
গাড়ির দু’পাশে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে অগণিত নারী-পুরুষ। কারো দেহে বস্ত্র আছে কিনা ঠিক বোঝা যায় না–সামান্য একখণ্ড ন্যাকড়ায় ওরা কোনোরকমে লজ্জা নিবারণ করছে। কারো কারো হস্তে লণ্ঠন ছিলো, লণ্ঠনের আলোতে অস্পষ্ট প্রেত আত্মার মতই লাগছিলো ওদের।
দু হাত প্রসারিত করে দিয়েছে সবাই গাড়ির দিকে।
বনহুর একটা থলির মধ্য থেকে টাকা-পয়সা আর সোনার টুকরা ওদের হাতে মুঠি মুঠি তুলে দিচ্ছে। সে কি অদ্ভুত অপূর্ব দৃশ্য!
বনহুরের মুখমণ্ডল দীপ্ত উজ্জল। স্বল্প আলোতে তাকে দেব পুরুষের মত লাগছে। সেকি জ্যোতির্ময় চেহারা! স্বামীর কার্যকলাপ লক্ষ্য করে মনিরার দু চোখে আনন্দ অশ্রু ঝরে পড়ে।
ফিরে আসে বনহুর তার দীন-হীন অসহায় বন্ধুদের কাছ থেকে।
.
বনহুর গাড়ি রেখে চলে যায় ভিতরে।
মনিরা তখন ফিরে যায় বাংলোয়।
আকাশে অসংখ্য তারার মেলা। বাংলোর গেটে রাইফেলধারী পুলিশ টুলেন উপর বসে বসে ঝিমুচ্ছে।
সমস্ত দিল্লী নগরী গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে।
মনিরা নিজ কক্ষের পিছন দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো।
পাশের কামরায় তখন হাশেম চৌধুরী আর মাসুমা গাঢ় নিদ্রায় অচেতন।
*
সারাটা দিন শহরময় সাপের খেলা দেখিয়ে বেড়ায় কেশব আর নূরী। কোনোদিন বা নূরী নাচ দেখায়, কেশব মাদল বাজায় তার সঙ্গে।
নূরী জংলী মেয়ে।
জঙ্গলে তার জন্ম। নূরীর তাই এ-সবে কোনো লজ্জা বা সংকোচ নেই। ঘাগড়া পরা, গায়ে আঁট সাট ব্লাউজ, একটা ওড়না জড়িয়ে থাকে সে গলায় আর বুকে। মাথার চুলগুলো ওর চিরকালই খাটো আর কোকড়ানো। ডাগর ডাগর হরিণ আঁখির মত দু’টিচোখ।
নূরী যখন নাচ দেখায় তখন অগণিত জনতা চারপাশে ভীড় জমিয়ে ফেলে। তারিফ করে নূরীর নাচের; পয়সাও হয়–ওদের দুজনার খাওয়া-পরা চলে যায় কোনো রকমে।
সারাদিন পর ফিরে যায় তাদের ছোট্ট কুঠিরে।
নূরী রান্না করে, আর কেশব বসে থাকে তার পাশে। বন থেকে শুকনো কাঠ সংগ্রহ করে এনে দেয় সে নূরীকে।
রান্না শেষ হলে দুজনে বসে খায়।
নূরী শয়ন করে কুঠিরের মধ্যে আর কেশব থাকে কুঠিরের দাওয়ায়।
ওরা যে পল্লীতে বাস করে ওটা সাপুড়েদের আবাসভূমি।
নূরীদের কুঠিরের আশে-পাশে বেশ কয়েকটা কুঠির আছে। আর আছে বেশ কিছু তাঁবু।
সাপুড়েদের দলপতি হীরালা বয়স্ক হলেও অত্যন্ত দুঃসাহসী। তার মনে যেমন সাহস, দেহে তেমনি অসীম বল। সমস্ত সাপুড়ে দল তাকে ভয় করে–সমীহ করে।
হীরালাল ভালোবাসতো কেশব আর নূরীকে। সে-ই আশ্রয় দিয়েছিলো ওদের দু’জনকে। নূরী হীরালালকে বাবা বলে ডাকতো, কেশবও তাই। হীরালালও ওদের পুত্র-কন্যার মতই স্নেহ করতো।
হীরালাল কেশব আর নূরীকে ভালবাসে–এটা সহ্য হতো না হীরালালের ভ্রাতুস্পুত্র রংলালের। সে কিছুতেই কেশবকে বরদাস্ত করতে পারতো না। রংলালের লোভ ছিলো নূরীর উপর। নূরীকে সে হাতের মুঠোয় পাবার জন্য নানা রকম উপায় খুঁজে ফিরতো।
অনেকদিন কেশবের অজ্ঞাতে সে ওর কাছে প্রেম নিবেদন করেছে, কিন্তু সর্বতোভাবে বিমুখ হয়েছে সে। নূরীকে সে কিছুতেই বশে আনতে সক্ষম হয়নি।
একদিন রাতে নূরী শুয়ে আছে নিজের কুঠিরের মধ্যে। ঘুমিয়ে পড়েছে সে।
বারান্দায় শুয়েছে কেশব।
সারাটা দিন ওরা সাপ খেলা দেখিয়ে আর নাচ দেখিয়ে পয়সা রোজগার করেছে; তারপর ক্লান্ত অবশ দেহ নিয়ে অল্পক্ষণেই ঘুমিয়ে পড়েছে ওরা।
হঠাৎ নূরীর ঘুম ভেঙে যায়–অন্ধকারে কে যেন তার মুখ টিপে ধরেছে।
নূরী চিৎকার করতে যায়, কিন্তু একখানা বলিষ্ঠ হাত তার কণ্ঠ রোধ করে দেয়।
ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
বাইরে ঘুম ভেঙে যায় কেশবের। ধড়ফড় উঠে কুঠিরে প্রবেশ করে, ম্যাচ জ্বালে কেশব। সঙ্গে সঙ্গে চোখ দুটো তার বিস্ময়ে চক চক্ করে উঠে।
কেশবকে দেখেই নূরীকে ছেড়ে দেয় রংলাল।
কিন্তু কেশবের মাথায় রক্ত তখন গরম হয়ে উঠেছে। ঝাঁপিয়ে পড়ে সে রংলালের উপর। শুরু হয় আবার ধস্তাধস্তি।
নূরী আর্ত চিৎকার করে উঠে–বাবা,বাবা, বাঁচাও, বাঁচাও…
সাপুড়ে সর্দার হীরালালের নিদ্রা ছুটে যায়, সে সূতীক্ষ্ণ ছোরা হস্তে ছুটে আসে নূরীর কুঠিরে। রংলাল আর কেশবকে কুঠিরের মেঝেতে ধস্তাধস্তি করতে দেখে থমকে দাঁড়ায়।
নূরী তখন এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
হীরালালকে দেখতে পেয়ে ছুটে এসে তার বুকে মাথা রাখে –বাবা, রংলাল আমাকে পাকড়াও করেছিলো। কেশব আমাকে বাঁচিয়ে নিয়েছে।
হীরালালের চোখ দুটো আগুনের গোলার মত জ্বলে উঠে।
কঠিন কণ্ঠে বলে–রংলাল খবরদার!
বাধ্য হয় রংলাল কেশবকে ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়াতে। হিংস্র জন্তুর মত ফোঁস ফোঁস করতে থাকে সে।
হীরালাল হাতের সূতীক্ষ্ণ-ধার ছোরাখানা উদ্যত করে বলে–ফের যদি ফুল মাইয়ার গায়ে হাত দিবি তাহলে তোকে খতম করিয়া দিবো। বেরিয়ে যা, আমাদের আস্তানায় আর তোর জায়গা হবি না।
রংলাল রক্তচক্ষু বিস্ফারিত করে তাকালো হীরালাল, কেশব আর নূরীর দিকে, তারপর দ্রুত কক্ষ ত্যাগ করে চলে গেলো।
হীরালাল ওর চলে-যাওয়া পথের দিকে খানিকটা থুথু নিক্ষেপ করে বললো–যা চলে যা….
এবার কেশব আর নূরীকে লক্ষ্য করে বললো হীরালাল-তোরা নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে যা। বদমাস আর আসবি না।
