বললো হাশেম চৌধুরী–আমিও ঠিক তাই ভাবছি। ঠিক আমাদের চায়ে কিছু মেশানো হয়েছিলো, না হলে এমনভাবে আমরা দুজনা ঘুমিয়ে পড়তাম না।
হাশেম চৌধুরী তক্ষুণি পুলিশদের আদেশ করলেন–রাতে যারা চা তৈরি করেছিলো সেই সব বয় আর রান্নার বামুন ঠাকুরদের গ্রেফতার করো।
আদেশের সঙ্গে সঙ্গে মাড়োয়ারী বয় আর বামুন ঠাকুর যে রাতে চা তৈরি করেছিলো তাকে গ্রেফতার করা হলো।
অনেক কান্নাকাটি করা সত্ত্বেও হাশেম চৌধুরীর কড়া আদেশ শিথিল হলো না।
শহরে এ-ব্যাপার নিয়ে বেশ তোলপাড় শুরু হলো। স্বয়ং পুলিশ সুপার এবং অগণিত পুলিশ ফোর্স সতর্ক পাহারারত থাকা সত্তেও মাড়োয়ারী বাড়ি রাত্রির ভয়ঙ্কর হানা দিয়ে বহু সোনা ও অর্থ হরণ করে নিয়ে গেছে।
পুলিশ রাত্রির ভয়ঙ্করের কিছু করতে পারেনি।
কথাটা হাশেম চৌধুরীর মনে খুব করে লাগলো। এবার সে রাত্রির ভয়ঙ্করকে গ্রেফতারে কঠিন শপথ গ্রহণ করলেন। যেমন করে হোক তাকে গ্রেফতার করতেই হবে।
*
পরদিন বাংলোর ড্রইংরুমে বসে এসব ব্যাপার নিয়েই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছিলো। এতো সাবধানতা অবলম্বন করেও রাত্রির ভয়ঙ্করের কবল থেকে মাড়োয়ারী ভদ্রলোককে রক্ষা করতে পারেননি বলে আফসোস করছিলেন হাশেম চৌধুরী।
বললেন তিনি রঞ্জনবাবু, রাত্রির ভয়ঙ্করকে গ্রেফতার না করে আমি স্বস্তি পাবো না। শয়তান অত্যন্ত চতুর। সে জানতো–আমি এবং আপনি মাড়োয়ারী বাড়ি রয়েছি, তাই কৌশলে বামুন ঠাকুর আর বয়কে হাত করে নিয়ে আমাদের চায়ের সঙ্গে ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে দিয়েছিলো।
ঐ রকম আমারও মনে হয় মিঃ চৌধুরী। না হলে ওভাবে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি একটুও খেয়াল নেই।
এবার আমিও দেখে নেবো রাত্রির ভয়ঙ্কর কত চালাক।
নতুন কোনো কৌশল মাথায় এসেছে নাকি?
আসেনি, তবে নতুনভাবেই তাকে ফাঁদে ফেলবো।
হাঁ, সেই ভাল হবে। রাত্রির ভয়ঙ্করকে গ্রেফতার করে দক্ষ পুলিশ সুপার নামটা কিনে নেবেন– তাহলে এবার?
দেখি কতদূর পারি। বললেন হাশেম চৌধুরী।
*
রাতে স্বামীকে খেতে দিয়ে বললো মাসুমা–খুবতো বড় বড় কথা বলেছিলে, কই পারলে রাত্রির ভয়ঙ্করকে গ্রেফতার করতে?
খেতে খেতে জবাব দিলেন হাশেম চৌধুরী–একবার পারিনি বলে হতাশ হবার লোক হাশেম চৌধুরী নয়, রাত্রির ভয়ঙ্করের চেয়েও ভয়ঙ্কর আমি।
হেসে উঠলো মাসুমা সেতো দেখতেই পাচ্ছি। দুইবন্ধু মিলে গিয়েছিলে, খুব বড় বড় কথা বলেছিলে। রাত্রির ভয়ঙ্করের হাত থেকে বেঁচে ফিরে এসেছে –এইতো বড় কথা।
মাসুমা, হাশেম চৌধুরীকে আজও চেনো না। বাছাধন যাবে কোথা? এবার সঙ্গী-সাথী কেউ নয়, আমি একাই দেখবো রাত্রির ভয়ঙ্কর কেমন!
এ ঘরে যখন স্বামী-স্ত্রী রাত্রির ভয়ঙ্কর নিয়ে আলাপ, আলোচনা চলছিলো তখন পাশের ঘরে মনিরা ছিলো। অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনছিলো সে। হাশেম চৌধুরী যে গত রাতে মাড়োয়ারী বাড়ি পুলিশ ফোর্সসহ রাত্রির ভয়ঙ্কর গ্রেফতারে গিয়েছিলো–জানে মনিরা। সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে, তাও জানে সে।
হাশেম চৌধুরী এবার বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন। যেমন করে হোক রাত্রির ভয়ঙ্করকে শায়েস্তা না করে ছাড়বেন না। মনিরা একটু আশঙ্কিত হয়। যদিও সে জানে, তার স্বামীই রাত্রির ভয়ঙ্কর আরও জানে, তাকে গ্রেফতার করা বা শায়েস্তা করা কারো সাধ্য নয় তবু বিচলিত হয় মনিরা অন্তরে অন্তরে।
কখন কোথায় কে রাত্রির ভয়ঙ্কর সম্বন্ধে আলাপ করছে সেদিকে থাকে তার সতর্ক দৃষ্টি।
মনিরা প্রাণ দেবে তবু স্বামীর অমঙ্গল হতে দেবে না– এটাই তার কামনা।
হাশেম চৌধুরী পুলিশ বাহিনী নিয়ে রাত্রির ভয়ঙ্কর গ্রেফতারে ঝাঁপিয়ে পড়লো।
আশঙ্কিত হলো মনিরা।
বনহুর তখন তার লুণ্ঠিত অর্থ আর সোনা-দানা আনন্দোদ্দীপ্ত মনে বিলিয়ে দিয়ে চলেছে। কোথায় কার ঘরে খাবার নেই।
কোথায় কে অসুখে ধুকে মরছে, কোথায় কার ঘরে বয়স্ক মেয়ে অর্থের অভাবে বিয়ে দিতে পারছে না। বনহুর প্রত্যেকের ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের অভাব পূরণ করে চলেছে।
সেদিন বনহুর তার অদ্ভুত ড্রেসে সজ্জিত হয়ে গাড়িতে উঠে বসলো।
রাত তখন গভীর।
একটা ছায়ামূর্তি তার অলক্ষ্যে গাড়ির পিছন আসনের নিচে লুকিয়ে পড়েছিলো।
বনহুরের গাড়ি যখন ছুটে চলেছে তখন ছায়ামূর্তি অন্ধকারে নিশ্চুপ বসে ছিলো।
গাড়ি দিল্লীর অদূরে নিকৃষ্ট পল্লী অভিমুখে চলেছে। পথ নির্জন এবং অপরিসর মেঠোপথ। দু ধারে শাল আর পাইন গাছ।
আরও কত নাম-না-জানা গাছও রয়েছে। এ পথে কোনো লাইট-পোষ্ট নেই, গাড়ির আলোতে পথ দেখে গাড়ি চালাচ্ছিলো বনহুর।
পিছন আসনের ছায়ামূর্তি বোরখাধারিনী মনিরা। সে আজ-কাল প্রতি রাতেই স্বামীকে ফলো করে থাকে। অত্যন্ত সাবধানে গোপনে লুকিয়ে থাকে সে। বনহুর অতো সতর্ক থাকা সত্তেও মনিরার চাতুরির কাছে পরাজিত হয়েছে।
বনহুরের গাড়ি গিয়ে থামলো একটা পল্লী অঞ্চলে। ঘন বনানী ঢাকা ছোট ছোট ঘরের চালা ঘরগুলো যেন সুপ্তির কোলে ঢলে পড়েছে। দিল্লী নগরীর বাইরে এমন নির্জন পল্লী আছে–ভাবাও কঠিন।
বনহুরের গাড়ি থামতেই কতগুলো হাড়-জিরজিরে নারী-পুরুষ এসে তার গাড়ির চারপাশে ঘিরে দাঁড়ালো।
এতো রাতেও এরা জেগে ছিলো।
বনহুরের গাড়ির হর্ণ শোনামাত্র সবাই বিপুল উৎসাহ নিয়ে ছুটে এসেছে। তারা যেন জানতো আসবে বনহুর।
