বনহুর চিঠিখানা মনোযোগ সহকারে পড়ে নিয়ে বললো–আশ্চর্য, রাত্রির ভয়ঙ্করের চিঠি এটা!
এবার বুঝতে পারছেন কেন সশস্ত্র পুলিশের প্রয়োজন।
হাঁ, এবার সব বুঝতে পারলাম। চিঠিখানা ফেরৎ দিলো রঞ্জন।
হাশেম চৌধুরী চিঠিখানা পকেটে ভাঁজ করে রেখে বললেন–এবার বলুন রঞ্জনবাবু, কিভাবে রাত্রির ভয়ঙ্করের কবল থেকে বেচারীকে বাঁচানো যায়!
আবার হাসলো বনহুর–অসংখ্য পুলিশ ফোর্স থাকতে দুশ্চিন্তার কারণ নেই মিঃ চৌধুরী।
তা অবশ্য ঠিক্ বলেছেন। শুধু পুলিশ ফোর্সই থাকবে না রঞ্জন বাবু, আমি নিজেও থাকবো। আর আপনি যদি আমাকে সাহায্য করেন!
এটুকুরই প্রতীক্ষা করছিলো বনহুর, তবু বললো সে–আমি আপনাকে কি সাহায্য করতে পারি?
আপনি যা পারেন অনেকেই তা পারে না রঞ্জন বাবু। আপনার পিয়ানোর সুর রাত্রির ভয়ঙ্করের কবল থেকে রক্ষা করতে পারে।
বেশ, তাহলে তাই হবে।
সত্যি রাজি আছেন আপনি, ঐ দিন থাকবেন আমার সঙ্গে?
আপনার অনুরোধ না রেখে পারি!
এরা যখন বাগানে বসে রাত্রির ভয়ঙ্কর সম্বন্ধে নানারকম আলোচনা করছিলো তখন মনিরা ও মাসুমা ওপাশে আড়ালে বসে সব কথাবার্তাই শুনছিলো।
মুহূর্তে মুহূর্তে মনিরার মুখোভাবে পরিবর্তন আসছিলো।
যখন হাশেম চৌধুরী আর মাড়োয়ারী ভদ্রলোক রাত্রির ভয়ঙ্করের চিঠির ব্যাপার নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করছিলো তখন মনিরা আঁচ করে নিয়েছিলো সমস্ত ঘটনাটা। রাত্রির ভয়ঙ্কর যে তারই প্রিয়তম তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তারপর যখন স্বয়ং রঞ্জন বাবু এসে উপস্থিত হলো তখন তার চোখেমুখে হঠাৎ একটা পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছিলো।
মাসুমা লক্ষ্য করেছিলো মনিরার মুখোভাব। রঞ্জন বাবুর আগমনে মনিরার চোখ দুটো যেন উজ্জ্বল দীপ্ত হয়ে উঠলো। ভাবে মাসুমা, তবে কি তার বান্ধবীর মনে রঞ্জন বাবু রেখাপাত করেছে। পরপর কয়েকটা ঘটনা মনে পড়ে তার। প্রথম পিয়ানোর সুর মনিরার অন্তরকে বিমুগ্ধ করে ফেলেছিলো। সেদিন মনিরার মধ্যে লক্ষ্য করেছিলো মাসুমা অদ্ভুত এক অস্বাভাবিকতা। তারপর আরও কয়েকদিন মাসুমা মনিরার মধ্যে দেখতে পেয়েছে ঐ রকম তন্দ্রাচ্ছন্নভাব। রঞ্জন বাবু সুন্দর সুপুরুষ, তাই বলে মনিরা…না না, এ কি করে সম্ভব হবে, মনিরা যে বিবাহিতা। শুধু তাই নয়–তার স্বামী আছে, সন্তান আছে।
মনে পড়ে মাসুমার সেদিনের কথা–আগ্রায় যেদিন তারা তাজমহল দেখতে গিয়েছিলো। সকলের অলক্ষ্যে রঞ্জন বাবু মনিরার পাশে দাঁড়িয়ে কিছু যেন চাপা স্বরে বলেছিলো স্পষ্ট স্মরণ আছে তার। আজও মাসুমা মনিরার মুখোভাব তীক্ষ্ণভাবে খেয়াল করছিলো। রঞ্জনবাবুর কণ্ঠস্বর তার অন্তরে যেন সুধা বর্ষণ করে চলেছে।
মাসুমা বললো হঠাৎ মনিরা, একটা কথা বলবো, সঠিক জবাব দিবি?
মনিরা তখন তন্ময় হয়ে হাশেম চৌধুরী আর রঞ্জন বাবুর কথাবার্তা শুনছিলো। মাসুমার প্রশ্নে সজাগ হয়ে সোজা হয়ে বসলো, বললো সে–নিশ্চয়ই দেবো।
আচ্ছা মনিরা, রঞ্জনবাবুকে তোর কেমন লাগে?
অনেক ভাল।
তাকে না তার পিয়ানোর সুর?
মাসুমা, তুই আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিস রঞ্জনবাবুকে আমার কেমন লাগে, তার পিয়ানোর সুর নয়।
হাঁ।
কোন্ টা?
রঞ্জনবাবু না তার পিয়ানোর সুর?
হাঁ, দুটোই আমার খুব ভাল লাগে!
মনিরা!
জানি এ আমার অন্যায়, তবুও…
মাসুমা গম্ভীর হয়, কোনো কথা বলে না।
মনিরা বলে–চল ভিতরে যাই।
চল্। উঠে দাঁড়ায় মাসুমা।
*
এতো সতর্ক পাহারা থাকা সত্ত্বেও সেদিন মাড়োয়ারীর বাড়িতে রাত্রির ভয়ঙ্কর হানা দিয়ে একশত ভরি সোনা হরণ করে নিয়ে গেছে। পুলিশ সুপার স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন, ছিলো রঞ্জনবাবু আর ছিলো অগণিত পুলিশ ফোর্স।
গভীর রাতে এতো কড়া পাহারার মধ্যেও জমকালো পোশাক পরা রাত্রির ভয়ঙ্কর গুলীভরা রিভলভার নিয়ে হানা দেয়।
এতোগুলো পুলিশ বাহিনীর চোখে ধূলো দিয়ে গভীর রাতে একেবারে মাড়োয়ারী ভদ্রলোকের শোবার কক্ষে হাজির হয় রাত্রির ভয়ঙ্কর।
একশত ভরি সোনা অবশ্য ছিলো না, তবু প্রায় সত্তর ভরি সোনা ছিলো আর ছিলো পঞ্চাশ হাজার টাকা। সব লুটে নিয়েছে রাত্রির ভয়ঙ্কর।
পাশের কামরাতেই ছিলেন পুলিশ সুপার আর রঞ্জনবাবু।
জেগেই ছিলো তারা, মাঝে মাঝে চা পান করছিলো। এক সময় চা পান করে হাশেম চৌধুরী ঝিমিয়ে পড়লেন, কেমন যেন তার দু’চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসতে লাগলো। কিছুতেই জেগে থাকতে পারলেন না। এক সময় সোফার উপর ঢলে পড়লেন তিনি।
ভোর বেলা জেগে উঠলে হাশেম চৌধুরী মাড়োয়ারী ভদ্রলোকের আকুল আর্তনাদে–বাবুজী হাম্ খতম্ হুগিয়ে। ডাকু হামারা সব লুট লেগিয়ে। বাবুজী …বাবুজী…
ধড়মড় করে জেগে সোজা হয়ে বসলেন হাশেম চৌধুরী, বিস্ময়ে হতবাক হলেন, কখন সে এভাবে ঘুমিয়ে পড়েছিলো বুঝতেই পারেনি।
ভালো করে তাকিয়ে দেখলো পাশের সোফায় রঞ্জনবাবু দিব্য আরামে নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে।
হাশেম চৌধুরী–তাকে ধাক্কা দিয়ে জাগালেন –রঞ্জনবাবু, রঞ্জনবাবু, সর্বনাশ হয়ে গেছে।
জেগে উঠে রঞ্জনবাবু, কিছু বুঝতে না পেরে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছিলো।
বললো হাশেম চৌধুরী–আমাদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে রঞ্জনবাবু।
হ্যাঁ বলেন কি! ডাকু এসেছিলো তাহলে?
হাঁ বাবুজী, ডাকু মেরা সব কুছ লেগিয়ে ..মাড়োয়ারী ভদ্রলোক হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলেন।
রঞ্জনবাবু ব্যস্ত হয়ে পড়লো, দুঃখিতভাবে বললো-হায়, কখন এমনভাবে আমরা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম?
