অমনি নারীকণ্ঠে হাস্যধ্বনি হলো-হাঃ হাঃ হাঃ….
চমকে ফিরে তাকালো বনহুর।
বোরখাধারিনীর হস্তে উদ্যত রিভলভার লক্ষ্য করলো। চোখ দুটো বনহুরের আগুনের ভাটার মত জ্বলে উঠলো মুহর্তে। নারীকণ্ঠে প্রতিধ্বনি হলো–হ্যাণ্ডস আপ।
স্বামীকে নিয়ে মনিরা তামাসা করছে।
বনহুর জানে না এ বোরখাধারিনী কে। সে ধারণাও করতে পারে না, সুদূর কান্দাই থেকে মনিরা আসতে পারে এখানে। মনিরার কণ্ঠ যদিও তার পরিচিত কিন্তু এখন তার মনিরার কণ্ঠ সম্বন্ধে কোনোরকম কল্পনা করা সম্ভব নয়। কাজেই বনহুরের কাছে মনিরা সম্পূর্ণ অজ্ঞাত।
মনিরার অনুরোধেই হাশেম চৌধুরী তাদের দেশ কোথায় কাউকে জানাননি। যদিও তিনি এ ব্যাপারে আশ্চর্য হয়েছেন তবু স্ত্রীর বান্ধবীর অনুরোধ অমান্য করতে পারেননি। হাশেম চৌধুরীর দেশের সন্ধান তাই সর্বসাধারণের অজ্ঞাত রয়ে গেছে। এমনকি তার বাংলোর বয়-বাবুর্চি–এরাও জানে না হাশেম চৌধুরীর জন্মভূমির সন্ধান।
বনহুর ধীরে ধীরে হাত তুলে দাঁড়ালো।
রাগে গস গস করছে বনহুর, বোরখাধারিনীর দুঃসাহস দেখে অবাকও হয়েছে সে।
বললো বনহুর–বান্ধবী, কি চাও তুমি আমার কাছে?
মনিরা ক্রুদ্ধ কণ্ঠের ভান করে বললো তোমার দস্যুতার সমাপ্তি করতে চাই।
হাঃ হাঃ হা-অট্টহাসি হেসে উঠলো বনহুর, তারপর হাসি থামিয়ে বললো–বান্ধবী, তোমার ভয়ে আমি দস্যুতা ত্যাগ করতে রাজি নই। তোমার অনুরোধে আমি দস্যুতা পরিহার করতে রাজি আছি, যদি তুমি আমার কথায় রাজি হও।
বলো, কি বলতে চাও তুমি?
কে তুমি, তোমার আসল পরিচয় কি–জানতে চাই।
অসম্ভব! আমার পরিচয় আমি কাউকে জানাতে রাজি নই।
তাহলে আমিও তোমার কথা রাখতে পারবো না।
বনহুর কথার ফাঁকে অগ্রসর হচ্ছিলো ধীরে ধীরে, নিকটে পৌঁছে চট করে ওর হাতখানা ধরে ফেলবে–এই তার উদ্দেশ্য।
মনিরা স্বামীর উদ্দেশ্য বুঝতে পারে, তাই সে সতর্ক করে বলে উঠে–খবরদার, এক পা এগুলে আমি তোমাকে গুলী করবো। পিছু হঠতে লাগলো মনিরা।
বনহুর হঠাৎ বলে উঠলো–স্বপন ওকে ধরে ফেলো। ধরে ফেলো–
মনিরা জানে, এটা বনহুরের মিথ্যা উক্তি। হেসে উঠে মনিরা–স্বপন এখন গভীর নিদ্রায় অচেতন। বনহুর, তুমি নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাও….কথা শেষ করে মনিরা ঘরের বাইরে গিয়ে চট করে দরজা বন্ধ করে দেয়।
আটকা পড়ে যায় বনহুর।
মনিরা তখন অন্ধকারে অদৃশ্য হয়েছে।
ফিরে আসে মনিরা বাংলোয়।
শয্যা গ্রহণ করে সে, মনে তার অফুরন্ত আনন্দ–দস্যু স্বামীকে সে ভীষণভাবে জব্দ করে দিয়েছে। মনিরা শোবার সময় সমস্ত দরজা-জানালা মজবুতভাবে বন্ধ করে শোয়। কারণ, বনহুর যে কোনোভাবে তার কক্ষে প্রবেশ করতে পারে, তাই সে সর্তকতা অবলম্বন করে।
আজকাল শহরে রাত্রির ভয়ঙ্করের উৎপাত অনেক কমে এসেছে বটে কিন্তু আশঙ্কা কমেনি এখনও। সদা ভয় আর দুর্ভাবনা নিয়ে কাটায় নগরবাসী।
সেদিন মাসুমা, মনিরা আর হাশেম চৌধুরী বাগানে বসে চা পান করছিলেন, এমন সময় ব্যস্তভাবে একজন পুলিশ এসে সেলুটু করে দাঁড়ালো, তারপর বললো–স্যার, এক ভদ্রলোক আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। জরুরি দরকার আছে।
হাশেম চৌধুরী বললেন–মাসুমা, তোমরা ভিতরে যাও, ওকে এখানেই ডাকি।
মাসুমা আর মনিরা উঠে দাঁড়ালো, কারণ তাদের চা পান শেষ হয়ে গিয়েছিলো।
ওরা চলে যেতেই হাশেম চৌধুরী পুলিশকে বললো–যাও তাকে এখানে নিয়ে এসো।
পুলিশটা চলে গেলো।
অল্পক্ষণ পর ফিরে এলো সঙ্গে এক মাড়োয়ারী ভদ্রলোক। মুখমণ্ডল তার ভয়ে বিবর্ণ, দুরু দুরু বক্ষে এসে আদাব জানালো।
হাশেম চৌধুরী বললেন–বসুন।
মাড়োয়ারী ভদ্রলোক আসন গ্রহণ করে প্রায় কেঁদেই ফেললেন।
হাশেম চৌধুরী বললেন–বলুন কি বলতে চান?
ভদ্রলোক পকেট থেকে একটা ভাঁজ-করা কাগজ বের করে হাশেম চৌধুরীর হাতে দিলেন।
হাশেম চৌধুরী কাগজখানা হাতে নিয়ে খুলে ফেললেন, তারপর পড়লেন–ভানুসিং, আজ রাত্রে চার ঘটিকায় আমি আসবো। এক শত ভরি সোনা আমার জন্য মজুত রাখবে। ঠিক্ তোমার শয়নকক্ষে দেখা করবো।
চিঠিখানা বার দুই পড়ে নিয়ে পকেটে রাখলেন পুলিশ সুপার হাশেম চৌধুরী। বললেন তিনি রাত্রির ভয়ঙ্কর হঠাৎ আপনার কাছে সোনা চেয়ে বসবে–এর কারণ কি?
হাভী কুছু সমঝতা নেহি বাবুজি। তব হামারা সোনা কি দোকান ন্যায়, উছিসে ডাকু হামারা পাশ সোনা কি জলুম কিয়া।
হাঁ ঠিক বলেছেন, তা আপনি কি রাজি আছেন এতে?
নেহি বাবুজী। হাম মর যায়েগা একশো ভরি সোনে হাম কাহাছে দেগা বাবুজী!
আচ্ছা, আপনি এক কাজ করুন। এক শো ভরি সোনা দেবার জন্য স্বীকার হয়ে যান এবং আপনার কক্ষে সেভাবে তৈরি থাকবেন।
ইয়া আল্ কেইছে বাৎ কহিতেছেন বাবুজী? হাম একশো ভরি সোনে দিবে তব কেইছে বাঁচেগা–
আপনাকে বাঁচানোর জন্যই তো এতো করছি। আপনি ঠিভাবে তৈরি থাকবেন কিন্তু সোনা আপনার খোয়া যাবে না।
বাবুজি!
হাঁ, আপনার কক্ষের আশেপাশে গোপনে লুকিয়ে থাকবে আমার পুলিশ ফোর্স।
হাঃ হাঃ হাঃ সশস্ত্র পুলিশ ফোর্স…ব্যাপার কি মিঃ চৌধুরী? কথাটা বলতে বলতে এগিয়ে এলো রঞ্জন।
আরে রঞ্জনবাবু যে, আসুন আসুন…
রঞ্জনবেশী দস্য বনহুর আসন গ্রহণ করলো।
বললেন হাশেম চৌধুরী–শুনুন, আজ আবার নতুন খবর।
নতুন খবর?
হাঁ, এই দেখুন…হাশেম চৌধুরী প্যান্টের পকেট থেকে চিঠিখানা বের করে রঞ্জনবাবুর হাতে দিলেন–পড়ে দেখুন আপনি।
