হঠাৎ একটা হাতের স্পর্শ অনুভব করলো মনিরা নিজের হাতের উপর, সঙ্গে সঙ্গে চাপা মৃদু কণ্ঠস্বর–বান্ধবী, নিজেকে এমনভাবে আড়াল করে রাখলেও বেশিদিন আপনি আমার কাছ থেকে গোপন থাকতে পারবেন না।
মনিরা বোরখার আড়ালে মৃদু হাসলো, কোনো জবাব দিলো না। বনহুর দ্রুত সরে গেলো কিছুটা, তারপর সিগারেট কেসটা বের করে একটা সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করলো।
বনহুর যখন মনিরার পাশে গিয়ে ফিস ফিস করে কথাগুলো বলছিলো, তখন কেউ লক্ষ্য না। করলেও মাসুমা একটু আঁচ করে নিয়েছিলো। এবং চমকে উঠেছিলো সে। কারণ রঞ্জন বাবুর সঙ্গে মনিরার কোনো রকম পরিচয় বা ঘনিষ্ঠতা নেই। রঞ্জন বাবু মনিরাকে কি বললেন তবে?
মনিরার পাশে এলো মাসুমা, বললো–চ ফেরা যাক।
মনিরা বললো হাঁ চল্ মাসুমা।
হাশেম চৌধুরী, কল্পনা আর স্বপনসহ বেশ কিছুদূর এগিয়ে গেছেন। মিনারের পাশে দাঁড়িয়ে কিছু আলোচনা করছিলেন।
বনহুর মাসুমা আর মনিরা এসে দাঁড়ালো তাদের পাশে।
বললো বনহুর–মিঃ চৌধুরী, চলুন এবার।
বেড়ানো হলো তোমাদের? মাসুমাকে লক্ষ্য করে বললেন হাশেম চৌধুরী।
এবার কথা বললো মনিরা-রাত্রির ভয়ঙ্কর হঠাৎ হামলা দিয়ে বসতে পারে!
মাসুমা চমকে উঠলো, এতোক্ষণ তার মনেই ছিলো না এ কথাটা। বললো সে–সত্যি বলেছে মনি,
মনিরা সঙ্গে সঙ্গে খুব জোরে একটা চিমটি কাটলো মাসুমার গায়ে।
মাসুমা অমনি মুখটা বিকৃত করে বলে উঠলো–মানে আলেয়া যা বললো একেবারে সত্যি! তাই তো, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, হঠাৎ রাত্রির ভয়ঙ্কর হামলা করে বসতে পারে।
হাঁ, নির্ঘাৎ সত্যি, এভাবে বাইরে রাত্রি করা মোটেই উচিৎ হবে না। চলুন, এবার যাওয়া যাক। কথাটা বললো রঞ্জনবেশী দস্যু বনহুর।
মনিরা বোরখার অন্তরালে হাসলো!
গাড়ির পাশে যখন ওরা ফিরে এলো তখন বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে।
হাশেম চৌধুরী পুলিশগণকে আদেশ দিলেন তারা যেন সতর্কভাবে লক্ষ্য রেখে তাদের সঙ্গে চলে।
গাড়িতে বসে বললো মাসুমা–এতোগুলো পুলিশ রয়েছে, সাধ্য কি রাত্রির ভয়ঙ্কর আমাদের গাড়ির আশেপাশে আসে।
মনিরা মৃদুস্বরে বললো-রাত্রির ভয়ঙ্করের অসাধ্য কিছু নেই; হয়তো সে আমাদের গাড়িতেও থাকতে পারে।
বলো কি? বললো মাসুমা।
হাঁ। মনিরা বললো আবার।
বনহুর ড্রাইভিং আসনে বসে সব শুনলো, তার মুখেও ফুটে উঠলো একটা হাসির রেখা।
হাশেম চৌধুরী বললেন–রাত্রির ভয়ঙ্করের সাধ্য কি আমার গাড়ির পাশে আসে।
এবার অদ্ভুতভাবে হেসে উঠলো বনহুর হাঃ হাঃ হাঃ….
আশ্চর্য হলো সবাই।
চমকে উঠলো মনিরা।
হাশেম চৌধুরী অবাক কণ্ঠে বললো–ব্যাপার কি রঞ্জন বাবু?
বনহুর হাসি বন্ধ করে বললো–অহেতুক আপনাদের আশঙ্কা দেখে আমার হাসি পেলো, তাই।
মাসুমা বললো–আপনি বীর পুরুষ কিনা, তাই আপনার কোনো দুশ্চিন্তা নেই।
বনহুরের হাতে গাড়িখানা তখন উক্কাবেগে ছুটে চলেছে।
*
বনহুর সে রাতে বাসায় ফিরে বেশ উত্তেজনা বোধ করলো নিজের মনে। বোরখাধারিনী যে তার সব কিছুই জানে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এতো জেনেও সে তার কথা আজও কাউকে বলেনি। কেন। এমনকি পুলিশ সুপার তার আত্নীয়–তাকেও জানায়নি সে। নিশ্চয়ই কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে ঐ বোরখার নিচে।
অনেক রাত।
বনহুর পায়চারী করছে মেঝেতে।
ললাটে তার চিন্তারেখা ফুটে উঠেছে।
বনহুর যখন কক্ষমধ্যে পায়চারী করছে তখন একটা ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়ালো তার কক্ষের বাহিরে জানালার পাশে। বোরখায় আবৃত তার সমস্ত দেহ।
বোরখা আবৃত ছায়ামূর্তি অন্য কেহ নয়–মনিরা। সে গোপনে বেরিয়ে এসেছে বাংলো থেকে, সন্ধান নিতে স্বামীর। মনিরা বুকে সাহস সঞ্চয় করে নিয়েছে, দুর্গম পথে পা বাড়াতে এখন তার কোনো ভয় নেই।
মনিরা কোনোদিন দুঃসাহসিনী ছিলো না। ইদানিং তার হৃদয়ে এক অদ্ভুত সাহস দানা বেঁধে উঠেছে। সে স্বাভাবিক নারী বটে, কিন্তু তার স্বামী অস্বাভাবিক পুরুষ; কাজেই তাকেও হতে হবে অস্বাভাবিক নারী, না হলে স্বামীকে সে কোনোদিন জয় করতে পারবে না।
মনিরা সেদিন প্রথম স্বামীকে দেখার পর নিজেকে কিছুতেই সংযত রাখতে পারছিলো না। একটা অদ্ভুত আলোড়ন তাকে চঞ্চল করে তুলেছিলো। ইচ্ছা হচ্ছিলো তখনই ছুটে গিয়ে স্বামীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে, কিন্তু অনেক কষ্টে আত্মসংযত করে নিয়েছিলো মনিরা সেদিন। না, এতো সহজেই তাকে ধরা দেবে না সে। গোপনে সন্ধান নেবে এই সুদূর দিল্লী নগরীতে কি উদ্দেশ্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। মনিরা অশিক্ষিত নারী নয়, সে উচ্চশিক্ষিতা এতোটুকু ধৈর্য যদি সে না ধারণ করতে পারে তাহলে চলবে কি করে।
মনিরা তার দস্যুস্বামীকে এবার পরীক্ষা করে দেখবে। তাই সে দুঃসাহসে বুক বেঁধে এ পথে অগ্রসর হয়েছে।
বনহুর যখন কক্ষমধ্যে পায়চারী করছিলো তখন মনিরা তার কালো বোরখার মধ্য থেকে সব লক্ষ্য করছিলো। বনহুর প্রবেশ করলো ড্রেসিংরুমে। মনিরা তখন অতি সন্তর্পণে প্রবেশ করলো কক্ষে, বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। বালিশটা উঁচু করতেই নজরে পড়লো রিভলভারখানা। মনিরা দ্রুতহস্তে রিভলভারখানা তুলে নিলো হাতে।
তারপর আলমারীর আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালো।
প্রতীক্ষা করছিলো ড্রেসিংরুম থেকে কখন বের হবে বনহুর।
কিছুক্ষণ পর বনহুর বেরিয়ে এলো ড্রেসিংরুম থেকে। সমস্ত দেহে জমকালো ড্রেস, মাথায় পাগড়ি। বনহুর এবার বিছানার পাশে এসে বালিশটা সরিয়ে ফেললো। বিস্ময়ে তার চোখ দুটো জ্বলে উঠলো যেন! বালিশটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো মেঝেতে।
