অনেক কথাই ভাবছিলো মনিরা, স্বামীকে এতো কাছে পেয়েও না পাওয়ার ব্যথা যে কত গভীর তা একমাত্র মনিরা ছাড়া কেউ বুঝতে পারবে না।
মাসুমা বললো হঠাৎ–আচ্ছা রঞ্জন বাবু, একটা কথা বলবো?
বলুন? একটা কেন যত খুশি বলুন আপনি। গাড়ির হ্যাণ্ডেলে হাত রেখে সম্মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো বনহুর।
মাসুমা বললো–রঞ্জন বাবু, আপনার জন্মভূমি কি এই দিল্লী নগরী?
বললো বনহুর–হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন মিসেস চৌধুরী?
আমি জানতে চাই আপনি আসল দিল্লীবাসী কিনা?
মনিরাই অবশ্য মাসুমাকে এ প্রশ্ন করবার জন্য তার কানে মুখ নিয়ে মৃদুস্বরে বলে দিয়েছিলো।
বনহুর বুঝতে পারে–বোরখাধারিনীই এ প্রশ্নের জন্য দায়ী মাসুমা নয়। বলে বনহুর–আমার জন্মভূমির সঠিক সন্ধান আমি জানি না। তবে সমস্ত পৃথিবীটাই আমার জন্মভূমি–এই জানি।
হেসে উঠেন হাশেম চৌধুরী, স্বপন আর কল্পনা।
হাশেম চৌধুরী বলে উঠেন–ঠিক বলেছেন রঞ্জন বাবু। মনে পড়ে কোনো এক কবি বলেছিলেন—
বিশ্ব আমার জন্মভূমি।
বিশ্ব আমার মা বিশ্ব মায়ের চরণ সেবায়
বিলিয়ে দেবো গা,
মাসুমা বললো আবার–অমন সোজা উত্তর সবাই দিতে জানে রঞ্জন বাবু। আপনি যে বাংলাদেশের সন্তান নন, এ কথা আমি জানি।
চমকে উঠে বনহুর, তবে কি বোরখাধারিনী তার পরিচয় প্রকাশ করেছে মিসেস চৌধুরীর কাছে?
অসম্ভব কিছু নয়, এতো যখন ঘনিষ্ঠতা, তখন না বলার কোনো কারণ নেই। তবে এটুকু সান্ত্বনা হাশেম চৌধুরী এখনও জানেন না এ সব কিছু। জানলে নিশ্চয়ই তিনি তার সঙ্গে এমনভাবে মিশতে পারতেন না। কে এই মহিলা–একবার নয়, দু’বার সে তাকে জব্দ করে দিয়েছে? পুরুষ নয়–একটা নারীর কাছে তার চরম অপমান!
কি ভাবছেন রঞ্জন বাবু? বললো মাসুমা।
ভ্রূকুঞ্চিত করে বললো বনহুর–বাংলাদেশে বাস করি। বাংলা কথা বলি। তবু আমি বাঙালির সন্তান নই–আশ্চর্য! আফসোেস, আজও আমি নিজের পরিচয় নিজেই জানি না।
হাশেম চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন–স্বপন আর কল্পনা তবে….
যদিও আমার মার গর্ভে তাদের জন্ম হয়নি তবু ওরা আমার ঠিক সহোদরের মত।
এ-কথা সে-কথার মধ্যে গাড়ি এক সময় তাজমহলের অদূরে এসে থামলো।
গাড়ি থেকে বনহুর নেমে পিছন আসনের দরজা খুলে ধরলো। বললো সে–নামুন।
মাসুমা নামলো।
কল্পনাও নেমে দাঁড়ালো এবার।
মনিরা নামবার সময় ইচ্ছা করেই তার হাতখানা না জানার ভান করে বনহুরের হাতের উপর। রাখলো।
বনহুর চট করে তার নিজের হাতখানা সরিয়ে নিতে চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না। মনিরার হাতখানা তখনও তার হাতের উপর বেশ চেপে রয়েছে।
বনহুর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে হাতখানা লক্ষ্য করলো মুহূর্তের জন্য–হ সুন্দরী বটে–হাতেই তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। দুগ্ধ ধবল সুকোমল একটি হাত।
হাশেম চৌধুরী নেমে পড়ে বললেন–চলে এসো তোমরা।
সবাই অগ্রসর হলো তাজমহলের দিকে।
হঠাৎ বনহুরের মনটা বেদনায় চড়াৎ করে উঠলো। মনে পড়লো একদিনের কথা…সে আর লুসী পাশাপাশি এই পথ ধরে এগুচ্ছিলো সেদিন। ক’দিনের পরিচয়ে লুসী তাকে কত আপন করে নিয়েছিলো…
বনহুরের চিন্তাজাল ছিন্ন হয়ে যায়। মনিরা ঠিক তার পাশে পাশে এগিয়ে চলছিলো। মাসুমা ছিলো একটু আগে।
হাশেম চৌধুরী, স্বপন আর কল্পনা অনেকটা এগিয়ে গেছে।
মনিরা হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় ভূতলে, আর্তকণ্ঠে উচ্চারণ করে–উঃ মাগো।
সঙ্গে সঙ্গে বনহুর ধরে ফেলে।
স্বামীর বলিষ্ঠ হাতের ছোঁয়ায় মনিরার সমস্ত দেহটা যেন অবশ শিথিল হয়ে আসে। শিরায় শিরায় বয়ে যায় এক অপূর্ব আনন্দদ্যুতি।
মাসুমা ততক্ষণে ধরে ফেলেছে মনিরাকে, রাগত কণ্ঠে বলে সে–এতো করে বললাম বোরখা পরার ঢং ত্যাগ কর, তবু বোরখা ছাড়বে না–এবার হলো? দেখি কোথাও চোট লেগেছে কিনা?
বনহুর আর মাসুমার হাতের মধ্য হতে মনিরা নিজেকে সংযত করে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। বলে। সেনা না, আমার কিছু হয়নি।
আবার চলতে শুরু করে ওরা।
মনিরার মনেও একটা আলোড়ন শুরু হয়েছে। কিন্তু না, কিছুতেই এতো সহজে ধরা দেবে না সে ওকে।
তাজমহলের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো সবাই মিলে।
স্বপন ক্যামেরা এনেছিলো সঙ্গে ছবি তুললো কয়েকটা। তারপর আবার সকলে মিলে অগ্রসর হলো তাজমহলে।
তাজমহলের প্রথম সোপানে এসে দাঁড়াতেই একজন সকলের জুতো খুলে নিলো। হাশেম চৌধুরী সাহেবী ক্যাপ পরে গিয়েছিলেন, তার ক্যাপটাও নিয়ে রাখলো সে।
বনহুরের শরীরে ছিলো সাধারণ ড্রেস। শুধু স্যুট পরেছিলো, কোনো টুপী বা হ্যাট ছিলো না তার মাথায়। কাজেই কোনো অসুবিধা হলো না।
সমস্ত তাজমহলটা ঘুরেফিরে দেখতে লাগলো সবাই মিলে।
যদিও তারা আরও কয়েকবার এসেছে এখানে, তবু তাজমহল দেখার বাসনা তাদের প্রত্যেকের প্রবল রয়েছে। শ্বেত পাথরের তৈরি মমতাজের স্মৃতিসৌধ যেন নতুন হয়ে ফুটে উঠে তাদের চোখে।
সমস্ত তাজমহলটা দেখা শেষ করে পিছন দিকে যমুনার উপরে এসে দাঁড়ায় সবাই। বেলাশেষের অস্তগামী সূর্য তখন যমুনার নীল জলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। ছোট ছোট পালতোলা নৌকাগুলো হাওয়ায় তর তর করে ভেসে চলেছে।
তন্ময় হয়ে এ দৃশ্য উপভোগ করছিলো মাসুমা আর মনিরা।
হাশেম চৌধুরী, স্বপন আর কল্পনা এগিয়ে গেছে ওদিকে আরও কিছুটা।
মনিরা রেলিং-এর উপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিলো।
মাসুমাও কখন যে সরে গেছে তার পাশ থেকে, কিছু খেয়াল করেনি মনিরা।
