মনিরা রিভলভারখানা উদ্যত করে ধরে আছে, তার উপর নজর পড়তেই যেন প্রথম রিভলভারখানা চোখে পড়ে। মনিরা জানালার আড়ালে আত্মগোপন করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।
এমন সময় জানালার শার্শী খুলে যায়।
সঙ্গে সঙ্গে কক্ষে প্রবেশ করে বনহুর, মেঝেতে লাফিয়ে পড়ে সে, তারপর এগিয়ে যায় খাটের দিকে।
মনিরা লক্ষ্য করে বনহুরের কার্যকলাপ।
খাটের উপর তার কোলবালিশটা চাদর দিয়ে বেশ করে ঢেকে রেখেছিলো মনিরা।
বনহুর মনে করে, নিশ্চয়ই সেই বান্ধবী নামধারিনী মহিলা শুয়ে আছে বিছানায়। এবার জানতে পারবে সে–কে এই মহিলা।
সন্তর্পণে এগিয়ে যায় সে।
মনিরা রুদ্ধ নিশ্বাসে তাকিয়ে থাকে। মনিরার হস্তেও রিভলভার, কিন্তু রিভলভার গুলীশূন্য।
বনহুর শয্যার পাশে এসে দাঁড়ায়।
রিভলভার উদ্যত রেখে সরিয়ে ফেলে চাদরখানা। মুহূর্তে ক্রুদ্ধ হয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয় চাদরখানা মেঝেতে।
অমনি মনিরা বনহুরের পিঠে তার ফাঁকা রিভলভারের মুখটা চেপে ধরে পিছন থেকে খবরদার, একচুল নড়বে না।
বনহুর বিস্ময়ে আড়ষ্ট হয়ে যায়।
মনিরা তীব্র কণ্ঠে বলে দাও, রিভলভার আমার হাতে দাও।
বনহুর পিঠে রিভলভারের মুখের শক্ত চাপ অনুভব করে। বাধ্য হয়ে হাতের রিভলভারখানা তার সম্মুখে এগিয়ে ধরা হাতখানার উপরে রাখে।
মনিরা এবার বলে উঠে বেরিয়ে যাও, যে পথে এসেছো ঐ পথে। খবরদার, আমার দিকে ফিরে তাকাবার চেষ্টা করো না, সঙ্গে সঙ্গে গুলী করবো।
বনহুর যেন হকচকিয়ে যায়। এমন নিপুণ কৌশলে তাকে কে জব্দ করলো? তবে হাঁ, বান্ধবীই বটে, তাকে হাতের মুঠায় পেয়েও গ্রেফতার না করে চলে যাবার জন্য নির্দেশ দিচ্ছে। বনহুর বললো– কে তুমি না দেখে আমি যাবো না।
বেশ, তাহলে মরতে রাজি আছো?
বনহুর মরতে ভয় করে না, তবে নারীর হস্তে সে মরতে রাজি নয়।
তবে সসম্মানে বেরিয়ে যাও। যাও বলছি, নইলে এক্ষুণি পুলিশ সুপার এসে পড়বেন।
বনহুর বিলম্ব না করে যে পথে এসেছিলো ঐ পথে অদৃশ্য হলো।
মনিরা হেসে উঠলো হাঃ হাঃ হাঃ….
বনহুরের কানে সে হাসির শব্দ যেন গরম সীসার মত জ্বালাময় মনে হলো।
মনিরা এবার তার বোরখা উন্মোচন করে ফেললো। নিজের হস্তের রিভলভারখানা শয্যায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে স্বামীর রিভলভারখানা চেপে ধরলো বুকে। গণ্ড বেড়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু।
*
পরদিন মনিরা যখন ঘুম থেকে জাগলো তখন অনেক বেলা হয়ে গেছে। অবশ্য এতো বেলা ঘুমানোর কারণ আছে যথেষ্ট। প্রায় সমস্ত রাত্রি জেগেই কেটেছে মনিরার। বনহুর চলে যাবার পরও বহুক্ষণ ঘুমাতে পারে না সে।
ভোরের দিকে ঘুমিয়েছিলো মাত্র, তাই জাগতে বেশ বেলা হয়ে গেছে।
চায়ের টেবিলে বসে নানারকম গল্প শুরু হলো।
গত রাতে কল্পনাদের বাড়িতে বেড়ানো ব্যাপার থেকে রঞ্জন বাবুর পিয়ানো বাজানো সম্বন্ধে সব আলোচনাই চললো।
মনিরা কিন্তু সব কথায় ঠিকভাবে যোগ দিতে পারছিলো না। মনের মধ্যে নানারকম চিন্তা জট পাকাচ্ছিলো ওর, তবু যোগ না দিয়ে উপায় ছিলো না। বিশেষ করে মাসুমা তাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে ব্যস্ত করে তুলছিলো।
মাসুমা বললো হঠাৎ–ওগো, চলো না আজ আমরা আগ্রা তাজমহল দেখতে যাই? সত্যি, যত বার দেখি আরো যেন দেখবার সখ জাগে মনে। কি বলিস মনি, তাই না?
হাঁ। ছোট্ট জবাব দিলো মনিরা।
মাসুমা রাগতভাবে বললো–তুই বড্ড বুড়িয়ে গেছিস, মনিরা। বেশি কথা বলবি না। বেশি খাবি না, বেড়াবি না। সব সময় কেমন যেন ভাবগম্ভীর স্বভাব নিয়ে থাকবি।
হাশেম চৌধুরী হেসে বলেন–তোমার মত অমন রসিক মেয়ে তো সবাই নয়।
আমি বুঝি রসিক মেয়ে!
তা নয় তো কি? তোমার বান্ধবীর চেয়ে তুমি বড় ছেলেমানুষী করো।
যাও আর কথা বলবো না বা কোথাও বেড়াতে যাবো না। তোমার সঙ্গে আড়ি…
আঃ বাচলাম তাহলে।
কিন্তু বাঁচতে তোমাকে দেবো না আমি।
তার মানে?
মানে রঞ্জন বাবুকে বলেছি, তিনি নিয়ে যাবেন আমাদের। আর তুমি যাবে আমাদের পাহারাদার হিসেবে।
সবাই এবার হেসে উঠলো হো হো করে।
মনিরাও জোরে হেসে উঠলো এবার।
মাসুমা বললো–দেখলে আমার বান্ধবী নাকি হাসতে জানে না, এবার দেখলে তো?
*
বিকেলে হাশেম চৌধুরী সপরিবারে আগ্রার দিকে রওয়ানা দিলেন। স্বপন, কল্পনা আর রঞ্জন বাবুও সঙ্গে রইলো তাদের। আর রইলো কয়েকজন সশস্ত্র পুলিস ফোর্স।
হাশেম চৌধুরীর নিজস্ব কারেই রওয়ানা দিলো সবাই মিলে।
পিছনে চললো পুলিশ ভ্যান।
এক সময় বনহুর হেসে বললো–মিঃ চৌধুরী, পুলিশ ফোর্স নিয়েছেন ব্যাপার কি? ডাকু গ্রেফতারে চলেছেন নাকি?
হাশেম চৌধুরী বললেন–সাবধানতা রক্ষার জন্য ওদের সঙ্গে নিলাম রঞ্জন বাবু। হঠাৎ যদি… রাত্রির ভয়ঙ্কর হামলা দিয়ে বসে, তাই?
হাঁ, আপনি ঠিক বলেছেন রঞ্জন বাবু। সত্যি, আমি অবাক হয়ে গেছি এই রাত্রির ভয়ঙ্করের অদ্ভুত কার্যকলাপে। শত শত পাহারার মধ্যেও এই দস্যু তার কাজ ঠিকভাবে করে চলেছে।
মনিরা, মাসুমা আর কল্পনা বসেছিলো পিছনের আসনে। সম্মুখে বসেছিলেন হাশেম চৌধুরী আর স্বপন। ড্রাইভারের কাজ করছিলো রঞ্জনবেশী দস্যু বনহুর।
অবশ্য ইচ্ছা করেই বনহুর নিজে নিয়েছিলো এই ভারটা।
আজও মনিরার শরীরে বোরখা আবৃত ছিলো। বনহুরের মিষ্ট গম্ভীর কণ্ঠস্বর তার অন্তরে এক আনন্দ উৎসব বইয়ে দিচ্ছিলো। নিশ্চুপ বসে শুনছিলো সব। রাত্রির ভয়ঙ্কর যে অন্য কেহ নয় তা বেশ উপলব্ধি করছিলো মনিরা। তার স্বামী যে রাত্রির ভয়ঙ্কর নাম ধারণ করে দিল্লী নগরী তোলপাড় করে তুলেছে– একথা কেউ না জানলেও জানে সে। হাশেম চৌধুরীর কথায় বনহুরের টিপ্পনি-ভরা বাক্যগুলো শুনে মনে মনে হাসছিলো মনিরা। সুচতুর স্বামীর কার্যকলাপ সে নিপুণভাবে লক্ষ্য করে চলেছে। সুদূর। ভারতে এসেও সে তার স্বভাব ত্যাগ করতে পারেনি।
