ও ঠিকই বলেছে কল্পনা। সত্যিই তো বোরখা ব্যবহার করে কারা–যারা কুৎসিৎ কদাকার তারাই। সুন্দরী আর রূপসী হলে তারা নিজেদের অমন করে ঢেকে রাখবে কেন? মানুষ তো আর রাক্ষস না যে দেখলেই খেয়ে ফেলবে?
অভিমান-ভরা কণ্ঠে বলে কল্পনা–আলেয়াদি নিজেকে বোরখার আবরণে ঢেকে রাখে লোকদের চোখ ঝলসে যাবে বলে। তারপর রাগ করে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
স্বপন ঠোঁট উল্টে বলে গেলো তো বয়েই গেলো। যাকে আজ পর্যন্ত একবার দেখতে পেলাম না, তার আবার রূপের প্রসংসা। লোকেই যদি ওর রূপ না দেখলো তবে কি হবে ও রূপ দিয়ে। আরে ছোঃ …
স্বপনের কথায় হাসলো বনহুর, বললো–দ্রাক্ষাফল খেতে না পেলে টই হয়। তেমনি সুন্দর জিনিস দেখতে না পেলে কুৎসিতই মনে হয় স্বপন।
তুমিও দেখছি কল্পনার দিকে ঝুঁকে পড়লে রঞ্জনদা, যাই বলো মেয়েদের বোরখা পরা আমার একেবারে সহ্য হয় না।
তুমি জানো না স্বপন, মুসলমান হাদিসে আছে–মেয়েরা অপর পুরুষের দৃষ্টি থেকে নিজেদের আড়াল করে রাখবে।
আর যদি আড়াল না করে?
পাপ হবে।
বাঃ বাঃ চমঙ্কার কথা! ওরা বোরখা পরে নিজেদের শরীর ঢাকা দিয়ে রাখবে আর বোরখার ছিদ্র দিয়ে পুরুষদের ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে দেখবে, তাতে বুঝি পাপ হয় না? তার চেয়ে বোরখা পরে অন্দর মহলে বসে থাকবে, তবেই না মুসলিম নারী। হাঁ, অমন কত বোরখা-পরা যেয়ে দেখেছি–সব কিছু শয়তানি ঐ বোরখার নিচে…
বনহুর সিগারেট ধরালো, মুখে তার মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। মিথ্যা বলেনি স্বপন। বোরখা পরা মেয়েদের মধ্যে যত নষ্টামি রয়েছে, তত নেই সাধারণ মেয়েদের। কারণ সাধারণ মেয়েরা চলাফেরা করবে স্বাভাবিকভাবে। তাদের চাল-চলন হবে স্বাভাবিক। বোরখা পরতে গেলেই তাদের ভিতরে থাকবে অপ্রকাশিক এক গোপনতা। পুরুষদের দৃষ্টি বার বার অন্বেষণ করে ফিরে ঐ বোরখার নীচে। একমুখ ধোয়া ছুঁড়ে দিয়ে বলে বনহুর–স্বপন, তোমার সঙ্গে আমার একমত।
স্বপন খুশিতে লাফিয়ে উঠে, করমর্দন করে সে বনহুরের, তারপর কথাটা ছোট বোন কল্পনাকে জানানোর জন্য দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়।
বনহুর হস্তস্থিত অৰ্দ্ধদগ্ধ সিগারেটটা এ্যাসট্রেতে নিক্ষেপ করে পকেট থেকে বের করে ভাঁজ করা কাগজের টুকরাখানা। মেলে ধরে আলোর সামনে। আঁকাবাঁকা কয়েক লাইন লেখা। লেখাটা কোনো নারীর বাম হস্তের তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বনহুর পড়লো–
–হে বনের সৌন্দর্য, বন ছেড়ে কেন তুমি। এই ইট-পাথরে গড়া নগরের বুকে আশ্রয় গ্রহণ করেছো? তোমার বিরহে বনের পশু-পাখি যে। হাহাকার করে ফিরছে। ফিরে যাও তোমার আবাসে, যেখানে তোমার প্রতী ক্ষায় প্রহর গুণছে সবাই। – বান্ধবী।
একবার নয়, বার বার পড়লো বনহুর চিঠির টুকরাখানা। আশ্চর্য এ নারী, কে এই বান্ধবী যে তার সব কিছুই জানে? দেখতে হবে বনহুরের চোখে ধূলো দেয় এমন জন আছে নাকি কেউ!
*
কক্ষমধ্যে পায়চারী করে ফিরছে বনহুর।
গভীর রাত।
যে যার কামরায় ঘুমিয়ে পড়েছে।
সিগারেটের পর সিগারেট নিঃশেষ করে চলেছে বনহুর। রাত বেড়ে আসছে। বনহুর এবার তার ড্রেসিংরুমে প্রবেশ করলো। পরে নিলো তার জমকালো ড্রেস। মাথায় কালো পাগড়ি। পাগড়ীর খানিকটা অংশ ঝুলছে বাম পাশে। ঐ অংশটা বনহুর মুখের নিচে গালপাট্টার মত জড়িয়ে নেয়। রিভলভারটা তুলে নিলো পকেটে।
আয়নার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো বনহুর। অপূর্ব লাগছে নিজেকে। জমকালো ড্রেসটা তাকে অদ্ভুত সুন্দর করে তোলো। বনহুর বাম পাশে ঝুলানো কালো কাপড়ের অংশটা মুখে জড়িয়ে নিলো। বেরিয়ে এলো সন্তর্পণে।
*
মনিরা জানে, বনহুর নিশ্চয়ই আসবে। তার চিঠিখানা অবশ্যই সে পেয়েছে। আরও থোকা লেগেছে তার মনে। মনিরা নিজের মনেই হাসে, সে তার স্বামীকে নিয়ে এবার একটা মজার খেলা খেলবে। অনেক কাঁদিয়েছে বনহুর ওকে, এবার বনহুরকে মনিরা কিছুটা নাকানি-চুবানি খাওয়াবে।
মনিরা গোপনে হাশেম চৌধুরীর রিভলভারখানা এনে রেখেছে নিজের কাছে। রিভলভার আনলেও। তাতে সত্যি কোনো গুলী ছিলো না।
এবার মনিরা কান পেতে শুনলো…পাশের কক্ষে হাশেম চৌধরী নাক ডাকছে। ঘুমিয়ে পড়েছে হাশেম চৌধুরী আর মাসুমা। দেয়ালঘড়ির দিকে তাকালো সে, রাত দুটো বেজে ত্রিশ মিনিট হয়েছে।
মনিরা পরে নিলো তার বোরখাটা, তারপর রিভলভার হাতের মুঠোয় চেপে ধরে জানালার পাশে এসে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে রইলো নিশ্চুপ হয়ে।
এক মিনিট, দু’মিনিট করে কেটে গেলো কয়েক মিনিট। মনিরা তবু নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। এ কক্ষে কয়েকটা জানালা রয়েছে। কিন্তু প্রত্যেক জানালায় লোহার মজবুত শিক্ দেওয়া আছে। শুধু এ জানালাটায় কাঁচের শার্সী। মনিরা জানে, বনহুর এলে এ জানালা দিয়েই তার কক্ষে প্রবেশ করবে।
রিভলভার উঁচু করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মনিরা।
দেয়ালঘড়িটা টিক্ টিক্ শব্দে বেজে চলেছে।
ঘড়ির কাঁটার শব্দের সঙ্গে মনিরার বুকের মধ্যেও ঢি ঢিপ করছিলো। স্বামীর দর্শনে সে যেন আত্মহারা না হয়, বিচলিত যেন না হয়ে পড়ে, সেজন্য নিজকে শক্ত করে নিচ্ছিলো।
হঠাৎ একটি শব্দ হলো খুট করে।
শব্দটা অত্যন্ত মৃদু।
সজাগ হয়ে দাঁড়ালো মনিরা, নিশ্চয়ই সে এসেছে। মনিরা নিজের বুকের মধ্যে একটা আলোড়ন অনুভব করলো। স্তব্ধ নিশ্বাসে দাঁড়িয়ে রইলো মনিরা, দক্ষিণ হস্তে রিভলভারখানা।
