মনিরা বুঝতে পারে–বনহুর তাকে সন্দেহ করেছে। কারণ মাসুমার সঙ্গে তাকে বোরখা-পরা অবস্থায় বড় বেমানান লাগছিলো। তাছাড়া পরশু রাতে পুলিশ সুপারের বাংলোতে ওকে যেভাবে বেকু বানিয়ে দিয়েছে মনিরা, তাতে সন্দেহ না করে উপায় ছিলো না বনহুরের।
মনিরার মুখ বনহুর দেখতে না পেলেও মনিরা বনহুরের মুখোভাব স্পষ্ট লক্ষ্য করছিলো। হাসি পাচ্ছিলো মনিরার; জানে সে বনহুর বুঝতে পেরেছে–বাংলোর সেই অদৃশ্য নারীই এই বোরখাধারিনী।
মনিরা আরও সাবধান হয়ে যায়। কিছুতেই সে এতো সহজে ধরা দেবে না ওকে। তাকে ও কাঁদিয়েছে রাতের পর রাত, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। এবার খুঁজে পেয়েছে। হয়তো ভাগ্য তাই সে নিয়তির টানে চলে এসেছে সুদূর ভারতবর্ষে। মনিরা স্বামীর দর্শনে আনন্দে অধীর হয়েছে, কতবার ধৈর্যহারা হয়েছে তবু নিজেকে কঠিন করে রেখেছে। সে দেখতে চায় স্বামীর আসল রূপ।
নিজেকে কঠিন করে রাখে মনিরা, নিজের মধ্যে এতোটুকু দুর্বলতা যেন প্রকাশ না পায় সেদিকে তার সতর্ক দৃষ্টি। বনহুর বললো এবার–মিসেস চৌধুরী, আপনার পর্দানশীন বান্ধবী কষ্ট করে। এসেছেন আমার পিয়ানো শুনতে। এ জন্য আমি আনন্দিত।
তাহলে এবার শুরু করুন। বললো মাসুমা।
রঞ্জনবেশী বনহুর পিয়ানোর পাশে এসে বসলো।
স্বপন কলিং বেল টিপে বয়কে ডেকে জলযোগের আয়োজন করতে বললো।
কল্পনা তো একটা আসন দখল করে নিয়ে বসেছে। সে তার রঞ্জন দাদার হাতে পিয়ানো শুনতে পাগল হয়ে পড়ে।
বনহুর পিয়ানো বাজাতে শুরু করলো। সু
রের মূর্হনায় মুখর হয়ে উঠলো হলঘর।
তন্ময় হয়ে গেছে মাসুমা।
মনিরার দু’চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুবিন্দু। বোরখার আবরণে তার মুখমণ্ডল যদি ঢাকা না থাকতো তাহলে সবাই দেখতো, মনিরার মুখ আনন্দে দীপ্তময় হয়ে উঠেছে। অদ্ভুত এক দিপ্ততায় উজ্জ্বল হয়েছে তার নয়ন দুটি। মনিরা কিছুতেই নিজকে যেন ধরে রাখতে পারছিলো না। স্বামী-হস্তের পিয়ানোর সুর তাকে আবছন্ন করে ফেলেছিলো। সমস্ত শিরায় শিরায় ধমনীতে প্রবাহিত হচ্ছিলো একটা উষ্ণ রক্তের প্রবাহ। সোফায় ঠেশ দিয়ে চুপ করে বসে রইলো সে।
বনহুরের পিয়ানো থেমে যায়।
কিন্তু কক্ষমধ্যে পিয়ানোর সুরের প্রতিধ্বনি তখনও সৃষ্টি করে চলেছে এক অপূর্ব পরিবেশ।
চা-নাস্তা আসে।
বনহুর উঠে আসে পিয়ানোর পাশ থেকে।
চায়ের টেবিলে বসে ওরা সবাই মিলে।
মাসুমাও উঠে যায় টেবিলের পাশে।
মনিরা তখনও বসে আছে নিজের আসনে।
মাসুমা ওকে লক্ষ্য করে হেসে বলে–কিরে আলেয়া, অমনি চুপ হয়ে গেলি দেখছি। রঞ্জন বাবুর পিয়ানোর সুর শুধু আমাকেই বিমুগ্ধ করে ফেলেনি, তোকেও দেখছি একেবারে তন্দ্রাচ্ছন্ন করে ফেলেছে।
মাসুমার পরিহাস-বাক্যে মনিরা যেন সন্বিৎ ফিরে পায়। উঠে দাঁড়ায় মনিরা, তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে বলে–বড় বাড়াবাড়ি শুরু করছো মাসুমা। রঞ্জন বাবুর পিয়ানোর সুর আমাকে মুগ্ধ করেছে সত্যি কিন্তু তার সুরের মোহ আমাকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করতে পারবে না কোনোদিন।
মাসুমা একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায়, সত্যি কথাটা বলে সে হয়তো ভুলই করেছে। আরও ভাবে, মনিরা অবিবাহিত মেয়ে নয়। তার স্বামী আছে, সন্তান আছে, একটা অপর পুরুষ সম্বন্ধে এভাবে বলাটা অত্যন্ত বাড়াবাড়িই হয়ে গেছে।
চা-নাস্তা-পর্ব শেষ করে যখন বিদায় নিলো মাসুমা, তখন বেশ রাত হয়ে গেছে।
রঞ্জনবাবুবেশী বনহুর, স্বপন আর কল্পনা গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলো। যদিও বেশিদূর নয় বাংলোটা, তবু পুলিশ-সুপারের সহধর্মিনী হেঁটে যাবেন প্রকাশ্য রাজপথ দিয়ে–এ হতে পারে না, কাজেই গাড়ি নিয়ে এসেছিলো ওরা।
গাড়িতে বসে হাত নাড়ে মাসুমা–আবার আসবো কিন্তু রঞ্জন বাবু, পিয়ানো শোনাতে হবে।
আসবেন। বললো বনহুর।
কল্পনা আর স্বপন একসঙ্গে বললো–যত খুসি পিয়ানো শুনবেন মাসুমা বৌদি। আসবেন আবার।
গাড়ি চলে গেলো।
ফিরে এলো ওরা তিনজনা হলঘরে।
হলঘরে প্রবেশ করতেই বনহুরের নজর চলে গেলো যে আসনটায় বসেছিলো বোরখা পরা মহিলাটি। একটা ছোট্ট কাগজ ভাঁজ করা পড়ে আছে বলে মনে হলো তার।
বনহুর স্বপন আর কল্পনা কথা বলতে বলতে কক্ষমধ্যে এগুচ্ছিলো।
স্বপন বলছিলো–রঞ্জন দা, মাসুমা বৌদি খুব সুন্দর, তাই না? বেশ মিশুক মেয়ে কিন্তু। আমার বড্ড ভাল লাগে মাসুমা বৌদিকে।
কল্পনা বলে উঠে–আলেয়াদিকে তুমি তো দেখোনি রঞ্জন দা। সত্যি অদ্ভুত মেয়ে আলেয়াদি। যেমন রূপ তেমনি গুণ। মাসুমা বৌদির চেয়ে অনেক সুন্দরী…
রেখে দে, সুন্দরী হলে সে আবার ভূতের মত বোরখা পরে থাকে নাকি? তাহলে সব সময়
সব সময় রূপ দেখিয়ে বেড়াবে এই বলছো তো? কিন্তু জানো না স্বপনদা, আলেয়াদি তেমন মেয়ে নয়। একটুও রূপের গর্ব তার নেই।
ভাই-বোন মিলে যখন তব বিতর্ক চলছিলো তখন বনহুর ওদের অলক্ষ্যে চট করে সোফা থেকে ভাঁজ করা কাগজের টুকরাটা তুলে নেয় হাতে। তখনকার মত রেখে দেয় পকেটে, তারপর এসে বসে ওদের পাশে, হেসে বলে বনহুর–কি ব্যাপার বলো তো?
কল্পনা বলে–দেখো তো রঞ্জন দা, ও বিশ্বাসই করতে চায় না।
কি বিশ্বাস করতে চায় না স্বপন?
আমি বলছি, মাসুমা বৌদির চেয়ে আলেয়াদি অনেক বেশি সুন্দরী। জানো রঞ্জনদা, ও বলছে। তাহলে অমন ভূতের মত বোরখা পরে বেড়াতো না।
