বনহুর থতমত খেয়ে গেলো, কেমন যেন বিব্রত বোধ করতে লাগলো সে। এ বাড়িতে এমন কেউ আছে, যে তার আসল পরিচয় জানে। বনহুর আর বেশিক্ষণ বিলম্ব করতে পারলো না বা করবার মত তার মনোভাব ছিলো না। আজ সে এমনভাবে পরাজয় বরণ করবে কল্পনা করতে পারেনি।
বনহুর যতই সরে পড়ার চেষ্টা করুক মাসুমা কিন্তু তাকে ছাড়লো না, জোর করে চা-নাস্তা ভোজন কাজ সমাপ্ত করে তবেই ছুটি দিলো। আর বলে দিলো, পুনরায় আমাদের পিয়ানো শোনাতে হবে। যাবো একদিন আপনাদের ওখানে পিয়ানো শুনতে।
বনহুর আর স্বপন চলে এলো পুলিশ সুপারের বাংলো থেকে। কিন্তু মন তার সচ্ছ নয়। গভীর চিন্তায় মগ্ন সে–কে ঐ নারী যে জানে তার আসল পরিচয়। সুদূর দিল্লী নগরীতে কে সে?
ওদিকে মনিরার মনে আজ আনন্দের উৎস।
তার মহামূল্য রত্নের সন্ধান আজ পেয়েছে। পেয়েছে তার স্বামীর দর্শন। মনিরা কিছুতেই যেন এ আনন্দ বুকে চেপে রাখতে পারছিলো না। আবার প্রকাশ করবার মত দুঃসাহসও হচ্ছিলো না। যদিও মনিরা হৃদয়ের গোপন আনন্দ-উৎস হৃদয়েই চেপে রাখার চেষ্টা করছিলো, কিন্তু তার কিছুটা ফুটে উঠেছিলো ওর চোখে-মুখে।
মনিরা খুসিতে আত্মহারা!
মাসুমা চিরগম্ভীরা বান্ধবীকে উজ্জ্বল-দীপ্ত হতে দেখে সেও সুখী হলো অনেক। ভাবলো, তাদের প্রচেষ্টা তাহলে সার্থক হয়েছে। মনিরার মুখে হাসি ফোঁটানোই ছিলো তাদের উদ্দেশ্য।
মনিরাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে মাসুমা-মনিরা, রঞ্জন বাবুর পিয়ানো শোনার পর থেকে তোমাকে সত্যি বড় সচ্ছ মনে হচ্ছে। তার সঙ্গে যদি পরিচিত হতে তাহলে আরও মুগ্ধ হতে। অদ্ভুত মানুষ রঞ্জন বাবু। দেখতে যেমন সুন্দর-সুপুরুষ তিনি, তেমনি হাস্যোদীপ্ত স্বভাব। বড় ভাল লোক কিন্তু…
হোক, আমি কারো সঙ্গে পরিচয় করতে রাজি নই ভাই। উনার পিয়ানোর সুর সত্যি অপূর্ব তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
শুধু অপূর্বই নয়, সমস্ত অন্তরকে বিমুগ্ধ করে ফেলে–এ কথা অস্বীকার করা যায় না।
কদিন বেশ কেটে গেলো।
শহরে রাত্রির ভয়ঙ্করের ভয়াবহ উপদ্রব ক’দিন আর হয়নি। বেশ শান্তই মনে হচ্ছে দিল্লী নগরীটা আজকাল। দিল্লী পত্রিকা এ নিয়ে অনেক রকম মন্তব্য প্রকাশ করে চলেছে। বিভিন্ন পত্রিকায় বিভিন্ন মতামত প্রকাশ পাচ্ছে।
আজকাল পুলিশ সুপার মিঃ হাশেম চৌধুরী রঞ্জন বাবুর অত্যন্ত ভক্ত হয়ে পড়েছেন। প্রায়ই তিনি আসেন তার পিয়ানো শুনতে। সেদিন মাসুমা মনিরাকে ধরে বসলো–চল না ভাই, আজ কল্পনাদের বাড়ি।
শেষ পর্যন্ত দেখছি কল্পনার দাদার পিয়ানোর সুরে আকৃষ্ট হলি। বলি মিঃ চৌধুরীর উপায় কি হবে বলতো?
কেন, তুই না হয় আমার হয়ে এদিকটা চালিয়ে নিস্। বললো মাসুমা।
মনিরা রাগ করার ভান করে বলে–বড্ড দুষ্ট হয়েছিস মাসুমা।
আমার চেয়ে তুই বেশি দুষ্ট। কেবল, সত্যি ভাই ওর পিয়ানোর সুর আমাকে মুগ্ধ করেছে। শেষ পর্যন্ত দেখছি ভদ্রলোকের…প্রেমে পড়ে না যাস?
এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করেন হাশেম চৌধুরী–তাহলে এ বান্দার কি হবে?
মাসুমা আর মনিরা চমকে উঠে। বিব্রত বোধ করে মনিরা, বিশেষ করে হাশেম চৌধুরীর সম্মুখে সে লজ্জিত হয়। বেরিয়ে যায় মনিরা কক্ষ থেকে।
মাসুমা আর হাশেম চৌধুরী মিলে চলে নানা রসপূর্ণ আলাপ-আলোচনা।
*
সেদিন সন্ধ্যায় মাসুমা মনিরাকে সঙ্গে করে যায় কল্পনাদের বাড়ি বেড়াতে। মাসুমার উদ্দেশ্য রঞ্জন বাবুর পিয়ানো শুনবে।
মনিরা কিন্তু নতুন এক জেদ ধরে বসলো,–সে বোরখা পরে তবেই গেলো। আজকালকার মেয়ে হয়ে একি সেকেলে ফ্যাশান!
মনিরা নির্বাক, কোনো কথা সে বললো না।
হাশেম চৌধুরী আজ অফিসের কাজে আটকা পড়ে গিয়েছিলেন। কাজেই মাসুমা আর মনিরা এলো এ-বাড়ি।
কল্পনা, স্বপন আর রঞ্জন তাদের অভ্যর্থনা জানালো।
মাসুমা আর মনিরা গাড়ি থেকে নেমে হলঘরে প্রবেশ করলো। মাসুমার সঙ্গে বোরখা পরা একটি যুবতীকে দেখে অবাক হলো ওরা। কল্পনা বললো–মাসু বৌদি, এ কালের মেয়ে হয়ে দিদি বোরখা পড়েন কেন?
হেসে বললো মাসুমা–ওর সখ।
বোরখার মধ্য থেকে সুমিষ্ট একটি কণ্ঠস্বর বেরিয়ে এলো–মুসলমান হয়ে বেপর্দা করা মোটেই উচিৎ নয়। তাই আমি এভাবে চলাফেরা করি।
বললো রঞ্জনবেশী বনহুর–এ জন্য আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
মাসুমা হেসে উঠলোবেশতো, বোরখার মধ্য থেকে আমার বান্ধবী আপনার ধন্যবাদ আদায় করে নিলো। আগে জানলে আমিও বোরখা পরে আসতাম। ওঃ ভুলেই গেছি, আমার বান্ধবীর সঙ্গে আপনার পরিচয় হয় নি এখনও। ওর নাম….
মাসুমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললো মনিরা–আমার নাম আলেয়া।
মাসুমা অবাক হলো, তবু মনিরার কথায় যোগ দিয়ে বললো–হাঁ, ওর নাম আলেয়া।
বললো বনহুর–বেশ নাম; হাঁ, উনি আলেয়াই বটে।
স্বপন আর কল্পনা এতোক্ষণ দাঁড়িয়েছিলো হাবার মত।
বললো বনহুর–বসুন আপনারা।
মাসুমা একটা সোফায় বসে পড়ে বললো–আলেয়া, বোস্ ভাই।
বললো মনিরা।
এবার বনহুর, স্বপন ও কল্পনা আসন গ্রহণ করলো।
স্বপন বললো–বৌদি, আপনারা এসেছেন, সত্যি আমরা অনেক খুসি হয়েছি।
কল্পনাও যোগ দিলো দাদার কথার সঙ্গে।
মাসুমা বললো–রঞ্জন বাবু, আপনার পিয়ানোর সুর আমাদের টেনে এনেছে। এবার বুঝতেই পারছেন ব্যাপারখানা, আমার পর্দানশীন বান্ধবী আলেয়া পর্যন্ত থাকতে পারলো না, সেও ছুটে চলে এলো।
ভ্রূ কুঞ্চিত করে তাকালো বনহুর বোরখা–ঢাকা মুখখানার দিকে। কে ঐ বোরখার অন্তরালে, যে জানে তার আসল পরিচয়।
