এ যে তার স্বামী। মনিরা দুই হাতে দেয়াল ধরে নিজেকে সামলে নিলো।
একটু স্থির হয়ে আবার তাকালো সে ড্রইংরুমের মধ্যে। কিছুতেই সে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারছে না। নিশ্বাস দ্রুত বইছে; বুকের মধ্যে টিপ টিপ করছে। ছুটে গিয়ে স্বামীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছা হলো তার কিন্তু পারলো না সত্যিই যদি সে না হয়।
ঠিক সে মুহূর্তে বনহুর পিয়ানো রেখে ফিরে বসলো।
এবার মনিরা বনহুরকে স্পষ্ট দেখতে পেলো, আনন্দে নিজেকে কিছুতেই যেন ধরে রাখতে পারছে না সে। তবু শক্ত হলো মনিরা কঠিন করে নিলো নিজেকে। এতোদিন যদি সহ্য করে থাকে আর সামান্য সময় অপেক্ষা করতে পারবে না! শত শত বার মাসুমাকে অন্তর দিয়ে ধন্যবাদ জানালো। ভাগ্যিস সে ওর সঙ্গে এসেছিলো, না হলে এই সুদূর ভারতবর্ষে তার আসাও হতো না, পেতো না স্বামীকে।
মনিরা এবার বুঝতে পারলো কেন মনির আর যায় না তার পাশে। রহমান তার বিশ্বস্ত অনুচর হলেও সন্ধান জানে না–কোথায় রয়েছে তাদের সর্দার।
মনিরা খুশিতে উচ্ছল।
দরজার পাশ থেকে খাটে এসে বসলো মনিরা।
মাসুমাও এলো এবার।
মনিরা ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো বান্ধবী মাসুমাকে–মাসু অপূর্ব!
নিদ্রায় মাসুমার চোখ দুটো ঢুলু ঢুলু করছিলো–মনিরাকে আনন্দে অধীর হতে দেখে নিদ্রা ছুটে গেলো, অবাক হয়ে বললো–খুব যে খুশি দেখছি! মিঃ রঞ্জনবাবুর পিয়ানো দেখছি তোকে একেবারে উজ্জ্বল করে তুলেছে?
হাঁ মাসুমা, আমি যেন ওর সুরে আত্মহারা হয়ে পড়েছি।
ওকে দেখিসনি, দেখলে বুঝতিস্ যেমন তার রূপ তেমনি তার পিয়ানোর সুর। চলনা দেখা করবি?
না আজ নয় আর একদিন।
নিদ্রার কোলে ঢলে পড়েছে সমস্ত বাংলোটা।
শুধু জেগে আছে বাংলোর বাইরে পুলিশ ফোর্স। তারা রাইফেল কাঁধে সজাগ পাহারা দিচ্ছে।
হাশেম চৌধুরীও তাঁর কক্ষে জেগে বসেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারলেন না। তিনি টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন এক সময়। মাসুমা তো অনেকক্ষণ শুয়েছে, তার ঘুম গম্ভীর হয়ে এসেছে।
শুধু পাশের ঘরে জেগে মনিরা। আজ কি তার চোখে ঘুম আসে! ড্রইংরুমের পাশের কামরা গেষ্টরুম। ও ঘরে আছে স্বপন আর রঞ্জন সেন।
মনিরা জানে, নিশ্চয়ই তার স্বামী এ বাড়িতে কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে রাত্রি যাপন করতে এসেছে। তাই মনিরা সজাগ প্রহরীর মত জেগে। মনিরা এবার উঠে এসে গেষ্টরুমের পাশে অন্ধকারে দাঁড়ালো, পাশের জানালার ফাঁক দিয়ে নজর ফেললো কক্ষমধ্যে। দেখলো সেবনহুর পিয়ানো খুলে বের করে নিলো জমকালো পোশাক। পরে নিলো দ্রুত হস্তে। তারপর পিয়ানোর মধ্য হতে বের করলো একটি রিভলভার। চেপে ধরে পা বাড়ালো দরজার দিকে।
অমনি পর্দার আড়াল থেকে নারীকণ্ঠে প্রতিধ্বনি হলো –খবরদার, এক পা এগুলে বা পিছলে মরবে।
বনহুর তাকালো ওদিকের জানালায়। অস্পষ্টভাবে নজর পড়ল–জানালার পর্দার ফাঁকে একটা আগ্নেয়াস্ত্রের মুখ দেখা যাচ্ছে। রিভলভার সেটা বুঝে নিতে বাকী রইলো না তার।
২.১২ প্রতিধ্বনি
থমকে ফিরে তাকায় বনহুর।
মুখে তার কালো গালপাট্টা জড়ানো ছিলো। মাথায় পাগড়ি। ডিম্ লাইটের আধো অন্ধকারে চোখ দুটো জ্বলে উঠলো বনহুরের। দেখলো, পর্দার ফাঁকে বেরিয়ে আছে একটা পিস্তলের মুখ।
জীবনে বনহুর বহু দস্যুতা করেছে কিন্তু এমন অদ্ভুত ব্যাপারে কোনোদিন সে পড়েনি। বনহুর বেশ হকচকিয়ে গেলো, বললো সে কে তুমি?।
নারীকণ্ঠের হাস্যধ্বনি হলো–আমি কে জানতে চাও? আবার হেসে উঠলো নারীকণ্ঠ।
বনহুর কান পেতে মনোযোগ সহকারে স্মরণ করতে চেষ্টা করলো, এ স্বর কোথাও সে শুনেছে কিনা। এটা নূরীর কণ্ঠ নয় তা বেশ বুঝতে পেরেছে বনহুর। বললো এবার–হাঁ, আমি জানতে চাই– কে তুমি।
এবার মেয়েলী কণ্ঠ পুনরায় উচ্চারণ করলো–আমার পরিচয় আজ পাবে না দস্যু বনহুর!
ওঃ, আমার পরিচয় তুমি জানো দেখছি?
আরও জানি–তোমার জীবনের সব ঘটনা আমি অবগত আছি।
তুমি কে বলো?
আমার পরিচয় তুমি পাবে না। আর শোন, তুমি যে উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে এসেছে তা সফল হবে না। পারবে না তুমি এখানে কোনো ক্ষতি করতে।
তাহলে তুমি…
হাঁ, তোমাকে মুক্তি দেবো। শীঘ্ৰ তোমার হস্তের রিভলভার ত্যাগ করো। খুলে ফেলো তোমার দস্যু-ড্রেস। লুকিয়ে রাখো পিয়ানোর মধ্যে।
নইলে কি করবে?
এক পা এগুলে বা পিছুলে তোমাকে গুলী করে হত্যা করবো। পুনরায় বলছি, ত্যাগ করো তোমার রিভলভার।
বনহুর এবার বাধ্য হলো তার হস্তস্থিত রিভলভারখানা নামিয়ে রাখতে।
খোলো তোমার দস্যু-ড্রেস।
বনহুর এবার তার শরীর থেকে জমকালো দস্যু-ড্রেস খুলে ফেললো। লুকিয়ে রাখলো পিয়ানোর মধ্যে।
এবার বললো নারীকণ্ঠ–যাও, তোমার শয্যায় গিয়ে চুপ করে শুয়ে পড়ো। কথা দিলাম, কেউ জানবে না তোমার এ অদ্ভুত কাজের কথা। জানবে না তোমার আসল পরিচয়… …
বনহুর সুবোধ বালকের মত শয্যা গ্রহণ করলো।
কোনো যাদুমন্ত্রে সে যেন আজ পুতুল বনে গেছে। বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করলো বনহুর। একটা নারীর কাছে আজ তার চরম পরাজয়।
কখন যে বনহুর ঘুমিয়ে পড়েছে।
*
রাত ভোর হতেই মিঃ হাশেম চৌধুরী এসে জড়িয়ে ধরলেন বনহুরকে–সুপ্রভাত বন্ধু! আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমি। আপনার পিয়ানোর সুর আজ আমাকে রাত্রির ভয়ঙ্করের কবল থেকে রক্ষা করেছে।
স্বপনও ততক্ষণে জেগে উঠেছে।
