মুগ্ধ হয়ে যায় মনিরা আর মাসুমা।
সাপ খেলা দেখানো শেষ করে বিদায় চায় কেশব আর নূরী।
মনিরা খুশি হয়ে নিজের হাতের দু’গাছা চুড়ি খুলে দেয় নূরীর হাতে।
হাশেম চৌধুরী টাকা দেন।
চলে যায় ওরা।
মনিরা আর মাসুমা বলে দেয়–তারা আবার যেন আসে।
কেশব আর নূরী কথা দেয়, আসবো।
ওরা চলে যেতেই বলে মাসুমা স্বামীকে লক্ষ্য করে–আজ তোমাকে বড্ড চিন্তিত লাগছে, ব্যাপার। কি বলো তো?
কিছু না। হাশেম চৌধুরী স্ত্রীর নিকটে কিছু না বললেও তাঁর অন্তরে একটা দুর্ভাবনা তালগোল পাকাচ্ছিলো।
হাশেম চৌধুরী গম্ভীর হয়ে রইলেন, সন্ধ্যার পর পরই তাকে তৈরি হয়ে নিতে হবে।
মাসুমা হেসে বললো–শুনলাম তোমার বন্ধু মিঃ রঞ্জন সেন এসেছিলেন। কি হলো, তিনি কি কোনো দুঃসংবাদ শুনিয়ে গেলেন?
না, তিনি নন। তবে আজ একটা দুঃসংবাদ শুনেছি যার জন্য আমার মনে স্বস্তি নেই।
মনিরা শিউরে উঠলো বললো সেকান্দাই থেকে কোনো সংবাদ আসেনি তো? আমার নূর ভাল আছে কিনা কে জানে–
আপা, আপনি অযথা চিন্তা করছেন, কান্দাই এর-কোনো সংবাদ নয়। এখানেই এবং আজ রাতের একটি ব্যাপার নিয়ে আমি অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত আছি।
কতকটা আশ্বস্ত হলো মনিরা।
মাসুমা তেমনভাবে আর জেদ করলো না স্বামীর কাছে। পুলিশের লোক তাদের কখন কোন্ চিন্তা কে জানে। সব কথাই তো আর তাকে বলেনও না হাশেম চৌধুরী।
বললেন হাশেম চৌধুরী এবার মাসুমা, আজ আমার বন্ধু রঞ্জন এখানে খাবেন এবং থাকবেন।
বেশ তো দু’বন্ধু মিলে গোটারাত গল্পেসল্পে কাটিয়ে দিও।
আর তোমরা দু’বান্ধবী খুব করে বুঝি ঘুমাবে?
মোটেই না।
তবে কি তোমরাও–
হা, আমাদের কত কথা আছে, কত গল্প আছে, যা গোটারাত ধরে শুনলে আর শোনালে ফুরোবেনা। কি বলিস ভাই মনিরা, তাই না?
মনিরা মাথা দোলালো।
বললো মাসুমা–তোমার বন্ধুকে আজও চোখে দেখলাম না। আজ কিন্তু পরিচয় করিয়ে দিতে হবে তার সঙ্গে। শুনেছি তোমার বন্ধু নাকি সুন্দর পিয়ানো বাজাতে পারে।
তাই নাকি? কে বললো একথা? অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন হাশেম চৌধুরী।
বললো মাসুমা–স্বপন আর কল্পনার মুখে শুনেছি।
বেশ, তাহলে আজ সমস্ত রাত পিয়ানো শুনে কাটানো যাবে।
*
সন্ধ্যার পর।
বনহুর এলো।
হাশেম চৌধুরীর অনুরোধে পিয়ানোটা আনতে হয়েছে তাকে।
মাসুমা এসে পরিচয় করে নিলো এবার আগ্রহান্বিত হয়ে। কিন্তু মনিরা কিছুতেই এলো না তার সামনে। এ ছাড়া মনিরা কারো সম্মুখেই বড় আসতে চাইতো না। আজও মনিরা এলো না, এলে সে দেখতো তার আকাঙ্খিত জনই হলো মিঃ রঞ্জন সেন।
পাশের ঘর থেকে সে শুনবে পিয়ানো বাজানো–বললো মনিরা। অনেক বলেও যখন মাসুমা তাকে ড্রইংরুমে আনতে সক্ষম হলো না তখন সে একাই এসে গল্পেসল্পে মেতে উঠলো। স্বামীর বন্ধু হিসেবে মাসুমা তাকে যথেষ্ট আদর-আপ্যায়ন করলো।
হাশেম চৌধুরী সজাগ পুলিশফোর্স পাহারা রত রেখেও স্বস্তি পাচ্ছিলেন না নিজেও পকেটে রিভলভার রেখে বসে ছিলেন। কোন মুহূর্তে রাত্রির ভয়ঙ্কর হামলা করে বসবে কে জানে!
বনহুরের সঙ্গে স্বপনও এসেছে, সেও আনন্দে অধীর হয়ে প্রতীক্ষা করছে –তার রঞ্জন দাদার পিয়ানো বাজানো শুনবে।
নানা গল্প-গুজবের পর বনহুর পিয়ানোর পাশে এসে বসলো।
পাশাপাশি সোফায় বসে আছে হাশেম চৌধুরী আর স্বপন। একপাশে বসেছে মাসুমা।
পাশের ঘরে মনিরা বসে বই পড়ছিলো।
মাঝে মাঝে ড্রইংরুম থেকে ভেসে আসছিলো ওদের হাসি গল্পের আওয়াজ আর হাসির শব্দ।
এবার শুরু হলো পিয়ানোর ধ্বনি।
পিয়ানোর সুর ভেসে আসছে।
অপূর্ব অদ্ভুত সে সুর।
মনিরা বই পড়ছিলো, বই রেখে ঠিক হয়ে বসলো। এমন পিয়ানো সে কোনোদিন শোনেনি। তন্ময় হয়ে শুনছে মনিরা। তার সমস্ত অন্তর যেন আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো সে সুরে।
রাত বেড়ে আসছে।
এতো সুরেও হাশেম চৌধুরীর মনে স্বস্তি নেই, বার বার তিনি ড্রইংরুমের মেঝেতে পায়চারী করছেন। পকেটে তার গুলীভরা রিভলভার। বাংলোর চারপাশে পাহারা দিচ্ছে সর্তক রাইফেলধারী পাহারাদার।
বনহুর পিয়ানো বাজাচ্ছে।
মাসুমাও তন্ময় হয়ে গেছেন যেন।
স্বপন সোফার হাতলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে।
আজ কৃষ্ণ একাদশী।
চাঁদ এখন উঠেনি।
আকাশ অন্ধকার। শুধু তারার মালা জোনাকীর মত পিট পিট করে জ্বলছে।
বাংলোর আশেপাশের বাড়িগুলো একসময় নিদ্রার কোলে ঢলে পড়ে।
বনহুরের হাতে পিয়ানো যেন থামতে চায় না। একি, এমন মন মাতানো সুর এর আগে তো কোনোদিন কেউ শোনেনি।
পুলিশ সুপার হাশেম চৌধুরী বার বার হাই তুলছেন।
মাসুমার চোখেও নিদ্রা দেবী আসন গেড়ে নিয়েছেন।
পাশের ঘরে মনিরা অভিভূতের মত স্তব্ধ হয়ে বসে আছে।
বাংলোর চারপাশে পুলিশ ফোর্স রাইফেল হস্তে ঝিমুচ্ছে–এমন সুর তারাও যে শোনেনি কোনোদিন।
হাশেম চৌধুরী বললেন–মিঃ রঞ্জন আর যে পারছি না ভাই। বড় ঘুম পাচ্ছে আমার।
বললো বনহুর–আমারও দু’চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছে।
না না, তা হয় না বন্ধু, আরও একটু বাজান। আমি জেগে থাকতে চাই।
বেশ, বাজাচ্ছি, আপনি শুনুন মিঃ চৌধুরী।
বনহুর আবার পিয়ানো বাজাতে শুরু করলো।
এবার মনিরা স্থির থাকতে পারলো না, সে নিজের অজ্ঞাতে ড্রইংরুমের দরজার আড়ালে এসে দাঁড়ালো। কে এই পিয়ানো বাদক, যার সুর সৃষ্টি করে এক অভিনব পরিবেশ। মনিরা পর্দার ফাঁকে দৃষ্টি ফেললো ড্রইংরুমের মধ্যে। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ে থ’মেরে গেলো মনিরা–একি দেখলো সে–তবে কি তার চোখের মোহ। দু’হাতে চোখ রগড়ে তাকালো আবার না তো, কোনো ভুল নেই–
