বনহুর কন্ঠে সহানুভূতি ভাব এনে বললো–বড় আফসোস্ দস্যু আপনাদের মত পুলিশ বাহিনীর চোখ ধুলো দিয়ে তার কাজ সমাধা করে যাচ্ছে।
শুধু আফসোস নয় মিঃ রঞ্জন, পরিতাপের বিষয় একটা দস্যু এতোগুলো পুলিশ বাহিনীর চোখে ধুলো দিয়ে কার্য সিদ্ধি করে যাবে অথচ তাকে আমরা গ্রেফতার করতে সক্ষম হবো না।
পুলিশ সুপার আর মিঃ রঞ্জনবেশী বনহুর যখন বসে আলাপ-আলোচনা করছিলো ঠিক তখন বয় এসে একটা এনভেলাপ হাতে দেয় হাশেম চৌধুরীর।
হাশেম চৌধুরী খুলে ফেলে খামখানা, মাত্র কয়েক ছত্র লিখা একখানা চিঠি। হাশেম চৌধুরী চিঠিখানা পড়ে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠেন–দস্যুর সাহস দেখুন। চিঠিখানা হাতে দেয় বনহুরের। বনহুর পড়ে–
প্রিয় বন্ধু
সাবধান, আজ রাতে আপনার বাংলোয় আমি আসবো। বিশ হাজার টাকা আমার জন্য মওজুদ রাখবেন।
—রাত্রির ভয়ঙ্কর
চিঠিখানা পড়ে দু’চোখে বিস্ময় নিয়ে বললো বনহুর-রাত্রির ভয়ঙ্কর। অদ্ভুত নাম–
শুধু অদ্ভুতই নয় মিঃ রঞ্জন, একটা বিরাট আঁতঙ্ক সৃষ্টি করেছে এ দস্যু।
যতই বলুন,পুলিশ সুপারের বাড়ি হানা দেয়া রাত্রির ভয়ঙ্করের কাজ নয়। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন মিঃ চৌধুরী।
কিন্তু–
কোনো কিন্তু নেই। আপনার বাড়ি পুলিশ ফোর্স দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকবে, সাধ্য কি রাত্রির ভয়ঙ্কর বাংলোয় প্রবেশ করে।
তবু আমার সন্দেহ জাগছে মিঃ রঞ্জন। আপনি জানেন না, আমার স্ত্রী এবং আমার বোন কত ভীতু। তারা যদি জানতে পারে একথা, তাহলে অস্থির হয়ে পড়বে।
হেসে উঠে বনহুর–পুলিশ সুপারের মুখে একথা শোভা পায় না মিঃ চৌধুরী।
দেখুন মিঃ রঞ্জন, আপনার কথাবার্তায় আপনাকে আমি চিনতে পেরেছি–আপনি অত্যন্ত সাহসী।
যদি মনে করেন তবে তাই।
দেখুন আমার একটা কথা রাখবেন বলে আশা করি।
নিশ্চয়ই, বন্ধুজনের কথা শিরোধার্য। বলে হাসে বনহুর।
আজ রাতে আমাদের বাংলোয় থাকবেন আপনি।
পুলিশ সুপার হয়ে আমাকে একি অনুরোধ–আপনি আমার বন্ধু এবং পরম আত্মীয়ের চেয়েও বেশি। বেশ, যদি ভাল মনে করেন তাহলে আসবো।
পুলিশ সুপার মিঃ হাশেম চৌধুরীর কাছে বিদায় নিয়ে তখনকার মত চলে গেলো দস্যু বনহুর।
বনহুর দিল্লী শহরে সন্ন্যাসী বাবাজীর সন্ধানে গেলেই, ফিরে এসেছিলেন সন্ন্যাসী বাবাজী। এসে যখন জানতে পারলেন কেশব আর ফুলের জেদে বাবুজী গেছে দিল্লী নগরে, তখন চিন্তিত হয়েছিলেন। কিন্তু তার শরীর ভাল না থাকায় পুনরায় বাবুজীর খোঁজে যেতে পারেননি তিনি।
তাঁর এক কঠিন অসুখ দেখা দিয়েছিলো, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে যেন হৃৎপিণ্ডের ব্যাধি এটা।
গহন বনে ডাক্তার-কবিরাজ নেই। সন্ন্যাসী বাবাজী নিজেই যা পারলেন গাছ-গাছড়ার রস খেলেন, কিন্তু আয়ু যখন ফুরিয়ে যায় তখন আর কোনো চেষ্টাই সফল হয় না। সন্ন্যাসী বাবাজী অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন, কাজেই তিনি আর কিছুতেই নিজেকে রক্ষা করতে পারলেন না। কেশব আর নূরীর। প্রচেষ্টা, সেবা-যত্ন সব ব্যর্থ করে দু’দিন পর চলে গেলেন তিনি পরপারে। নশ্বর দেহ পড়ে রইলো। পৃথিবীর বুকে, প্রাণপাখি গেলো উড়ে।
অনেক কাদলো কেশব আর নূরী। কেঁদে আর কি হবে!
তারপর সন্ন্যাসী বাবাজীর মৃতদেহটা ভাসিয়ে দিলো ওরা নদী বক্ষে।
দুটোদিন আরও প্রতীক্ষা করলো কেশব আর নূরী। গহন বনে একা একা দুটি তরুণ আর তরুণী। এভাবে কাটানো সম্ভব নয়। নূরী সাহসী নারী হলেও ভীত হলো, সন্ন্যাসী বাবাজীর মৃত্যুতে ভড়কে গেছে ওরা। এমন দিনে যদি বনহুর পাশে থাকতো তাহলে নূরী একটুও বিচলিত হতো না।
বনহুরের প্রতীক্ষায় কটা দিন কোনো রকমে কাটিয়ে দিলো বটে কিন্তু দিন যেন আর যায় না।
নূরী কেশবের কাছে জেদ ধরে বসলো তারা শহরে চলে যাবে–যেখানে তার বনহুর গেছে। যেমন। করে হোক খুঁজে বের করবেই তাকে।
একদিন জঙ্গলের আশ্রম ত্যাগ করে কেশব আর নূরী রওয়ানা দিলো দিল্লী নগরের দিকে।
সেই থেকে কেশব আর নূরী অহরহ খুঁজে ফিরছে বনহুরকে। কিন্তু কোথাও তার সন্ধান পায় না। ওরা।
কেশব আর নূরী আশ্রয় নিয়েছে এক সাপুড়ে দলে।
ওদের সঙ্গে সাপের ঝাঁকা নিয়ে সারাদিন ঘুরে বেড়ায় ফুল আর কেশব। বাবুদের বাড়ি বাড়ি সাপ খেলা দেখিয়ে পয়সা উপার্জন করে।
সারাদিন সাপ খেলা দেখিয়ে যা পায় তাই দিয়ে চাল-ডাল কিনে রাতের বেলা রান্না করে খায় ওরা। দিল্লী শহরের অনতিদূরে ঘেরুয়া পাড়ায় তাদের আস্তানা। ছোট্ট একটা কুঁড়েঘরে থাকে নূরী আর বারেন্দায় শোয় কেশব।
সেদিন বনহুর চলে গেলো যখন পুলিশ সুপারের বাংলো থেকে, পরক্ষণেই দূরে শোনা গেলো– বাবু, সাপ খেলা দেখিয়ে বাবু। সাপ খেলা–
অন্দরবাড়ি থেকে মাসুমা আর মনিরা বেরিয়ে এলো দ্রুত। আর্দলী দিয়ে সাপুড়েদের ডেকে পাঠালো।
মিঃ হাশেম চৌধুরীর মনের অবস্থা ভাল নয়, একটু পূর্বে যে চিঠি তিনি পেয়েছেন তার জন্য যদিও তিনি ভীত নন তবু একটা অহেতুক আতঙ্ক জাগছে তাঁর মনে।
মাসুমা আর মনিরার অনুরোধে কেশব সাপের ঝকা নামিয়ে রাখলো।
কেশবের দেহে সাপুড়ের ড্রেস, আর নূরীর পরণে ঘাগড়া, গায়ে ব্লাউজ আর ওড়না। উভয়ের কানেই বড় বড় বালা রয়েছে।
সাপ খেলা শুরু হলো।
কেশব বাঁশি বাজায় আর নূরী সাপ খেলার তালে তালে করুণ মিষ্টিসুরে গান গায়। অদ্ভুত পাহাড়ী গান বড় সুন্দর মধুর সে সুর।
