তাই নাকি? বেশ তো, তোমার তাহলে খুব মজা হলো। এবার দেখ আমি তোমাদের জন্য কি এনেছি। বনহুর পকেট থেকে বের করে মূল্যবান আংটি দুটো। বলো–কে কোন্টা নেবে?
কল্পনা আর স্বপন যার-যেটা পছন্দ তুলে নেয়।
স্বপন বলে–কি দরকার ছিলো দাদা এসব আনার?
কল্পনা বললো এবার –বারে, দাদা দেবেন না তো কে দেবেন?
হেসে বলে বনহুর–কল্পনা, ঠিক বলেছো বোন।
হঠাৎ কল্পনা উজ্জ্বল হয়ে উঠে–ঠিক্ কিন্তু ও বাড়ির দিদি এমনি করে আমাদের আদর করে। সত্যি দাদা, তোমার মত–
কল্পনা আর স্বপন বনহুরকে অত্যধিক আপন জনের মত তুমি বলে সম্বোধন করতো।
*
বনহুর এমনি করে স্বপন আর কল্পনার মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে নেয়। এক টেবিলে বসে খায় ওরা তিন জনা, এক সঙ্গে গল্প করে, এক সঙ্গে বেড়ায়। শুধু রাতের বেলা বনহুরের জন্য আলাদা কক্ষ। সে নিজে ইচ্ছা করে বেছে নিয়েছে তার থাকার জন্য ঘরখানা।
রাতের খাওয়া শেষ করে চলে আসে নিজের ঘরে। এ ঘরখানা সম্পূর্ণ বাড়ির পিছন ভাগে। স্বপন অনেক বলেও তাকে সম্মুখে ভাল সুন্দর কক্ষ নেওয়াতে পারেনি। বনহুর যে কক্ষে থাকে সে কক্ষ বেশ নিরিবিলি এবং এক পাশে। ওদিকেই বাগান। নানা রকম ফলমূল আর ফুলের বৃক্ষ রয়েছে এ বাগানে।
এ কক্ষটা বেছে নেবার কারণ আছে বনহুরের।
পিছন জানালা দিয়ে পাইপ বেয়ে নেমে যায় সে গভীর রাতে। কাজ শেষ করে ফিরে সে ঐ পথেই। কাজেই কেউ জানে না তার গোপন অভিসন্ধির কথা।
বনহুরের দেওয়া হীরক অংগুরী পরে স্বপন আর কল্পনার আনন্দ আর ধরে না। সবচেয়ে বেশি আনন্দ হলো কল্পনার। সত্যি তার খুব পছন্দ হয়েছে এ আংটিটা।
রাতের খাওয়া শেষ করে শুতে যায় বনহুর।
স্বপন আর কল্পনা চলে যায় নিজ নিজ কক্ষে।
*
পুলিশ সুপার হাশেম চৌধুরী এবং তার পুলিশ মহল হিমসিম খেয়ে গেলো। কোনো রকমে এই গোপন লুটতরাজ আর দস্যুতা বন্ধ করতে পারলেন না। প্রতি রাতেই কোথাও না কোথাও চলেছে এই অদ্ভুত ডাকাতি। পুলিশ রিপোর্টে জানা যায়–জমকালো পোশাক-পরা এক ব্যক্তির হঠাৎ আবির্ভাব ঘটে; রিভলভার ধরে সব লুটে নিয়ে পালিয়ে যায়। এ পর্যন্ত কয়েকটা খুনও সংঘটিত হয়েছে।
ব্যাপারটা সমস্ত শহরে আতঙ্ক সৃষ্টি করলেও হাশেম চৌধুরী তার আদালী এবং অন্যান্যকে সাবধানে কথাটা গোপন রাখতে বললেন। কারণ মাসুমা আর মনিরা ছেলেমানুষ ভয় পেয়ে যেতে পারে। তাই হাশেম চৌধুরী নিজেও কোনোদিন এসব কথা বাসায় বলতেন না।
পুলিশ সুপারের বাংলোর কারো সাহস হলো না এসব জানাতে। বিশেষ করে পুলিশ সুপার বারণ করে দিয়েছেন সবাইকে।
কথাটা হয়তো মনিরার কানে গেলে তার বুক আনন্দে দুলে উঠতো, হয়তো বা তার মনে উঁকি দিতো আশার একটি আলো। শহরময় এতো হইহুল্লোড় চললেও বাংলোর মনিরা আর মাসুমা জানল না কিছু। তাদের কানে পৌঁছলো না এসব।
দিল্লীর পত্রিকায় নিয়মিত সংবাদ প্রকাশিত হলেও পত্রিকা বাংলোয় দেওয়া মানা। দুবৃত্ত দস্যুর। হামলায় শহরবাসী কম্পমান। পুলিশ মহলে ভীষণ একটা চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। সব সময় দিল্লীর পুলিশ বিভাগ এই অজ্ঞাত দস্যুর জন্য উৎকণ্ঠিত রয়েছে।
হাশেম চৌধুরীকে সব সময় এ ব্যাপারে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। কাজেই হাশেম চৌধুরী। পাশের শ্যামনারায়ণ মহাশয়ের বাড়ির সঙ্গে তার স্ত্রী এবং মনিরার পরিচয় হবার জন্য খুশিই হলেন তিনি। একদিন নিজে হাশেম চৌধুরী ঐ বাড়ি বেড়াতে গেলেন স্বাভাবিক বন্ধুত্বের খাতিরে। ইতিমধ্যে স্বপন গিয়ে ভাব জমিয়ে নিয়েছিলো তাঁর সঙ্গে।
হাশেম চৌধুরী স্বপনের সঙ্গেই বেড়াতে এলেন।
তখন বাসাতেই ছিলো বনহুর। হলঘরে বসে সেদিনের পত্রিকা পড়ছিলো সে।
হাশেম চৌধুরীসহ কক্ষে প্রবেশ করে স্বপন।
স্বপনই পরিচয় করিয়ে দেয়–দাদা, ইনিই পুলিশ সুপার মিঃ হাশেম চৌধুরী। আর ইনি আমার দাদা রঞ্জন।
বনহুর পুলিশ সুপার মিঃ হাশেম চৌধুরীর করমর্দন করলো।
উভয়ে আসন গ্রহণ করলো।
স্বপন কলিং বেল টিপে বয়কে ডেকে জলখাবারের আয়োজন করতে বললো।
হাশেম চৌধুরী অত্যন্ত মিশুক লোক, অল্পক্ষণেই বনহুরের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করে ফেললেন। তরুণ যুবক হাশেম একথা-সে কথার মাধ্যমে এই রহস্যজনক দস্যুতার কথা তুললেন। বললেন–মিঃ রঞ্জন, আমি ভেবে পাচ্ছিনা কে এই দস্যু যে রাতের অন্ধকারে অশরীরী আত্মার মত দিল্লীর বুকে বিচরণ করে ফেরে। পুলিশ বাহিনী সতর্ক দৃষ্টি রাখা সত্ত্বেও প্রতিদিন চলেছে দস্যুতা।
বনহুর শুধু হাসলো।
হাশেম চৌধুরী বললেন–আপনারা আমাদের নিকটবর্তী পড়শী, কাজেই এখন আপনজন বলতে আপনারাই। সব সময় আপনাদের সহায়তা আমার কামনা।
বললো বনহুর–নিশ্চয়ই মিঃ চৌধুরী, সব সময় আমাদের পাশে পাবেন।
এরপর থেকে পুলিশ সুপার মিঃ হাশেম চৌধুরী মিঃ রঞ্জনবেশী বনহুরের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্বে আবদ্ধ হলেন।
উভয়ের বয়স প্রায় সমান, তাছাড়া দু’জনাই বেশ মিশুক ধরনের লোক। হাশেম চৌধুরী বিশ্বাস করলেন বনহুরকে।
অবসর সময় হলেই হাশেম চৌধুরী আসতেন শ্যামনারায়ণ মহাশয়ের বাড়ি। বনহুরের সঙ্গে গল্প। করতে বড় ভাল লাগতো তার। বনহুরও যেতো মাঝে মাঝে স্বপনের সঙ্গে বাংলোয়।
ড্রইংরুমে বসে আলাপ করতো।
তারপর গল্পসল্প করে ফিরে আসতো অনেক রাতে।
*
সেদিন বাংলোর সম্মুখে বাগানে বসে আছে বনহুর আর হাশেম চৌধুরী। ক’দিন আগে একটা ব্যাংক লুট হয়ে গেছে–সে ব্যাপার নিয়েই আলোচনা চলছিলো। সন্ধ্যারাতেই একটা জমকালো পোশাক পরা দস্যু রিভলভার ধরে ব্যাংক থেকে বিশ হাজার টাকা নিয়ে উধাও হয়েছে। পাহারাদার এবং ব্যাংকে কার্যরত লোকজন কেউ কিছু করতে পারেনি। পুলিশের এতো সতর্ক পাহারা থাকা। সত্ত্বেও প্রায়ই চলেছে এরকম অদ্ভুত ডাকাতি।
