এমন দিনে দিল্লীর পুলিশ সুপার হয়ে এলো মনিরার বান্ধবী মাসুমার স্বামী হাশেম চৌধুরী। মাসুমা শেষ পর্যন্ত মনিরাকে নিয়ে এলো সঙ্গে। মনিরার অমত টিকলো না, মামীমাও জেদ করে পাঠিয়ে দিলেন তাকে। কারণ, মনিরা সবসময়ে গভীরভাবে চিন্তা করে। দিন দিন সে ক্ষীণ দুর্বল হয়ে পড়ছে, কিছুদিন বিদেশে ঘুরে এলে তবু একটু মনোভাব পাল্টাতে পারে তার।
নূর রয়ে গেলো তার দাদীমার কাছে। সরকার সাহেব আর দাদীমা মিলে নূরের সেবায় রইলেন। পড়াশোনা করছে, তাই সে মায়ের সঙ্গে আসতেও চাইলো না। বিশেষ করে মরিয়ম বেগমকেই নূর বেশি ভালবাসতো।
মরিয়ম বেগম নূরকে বুকে নিয়ে পুত্রশোক ভুলতে চেষ্টা করতেন, তাই তিনি সব সময় ওকে নিজের কাছে কাছে সস্নেহে আঁকড়ে ধরে রাখতেন। নূরও তাকে মায়ের চেয়ে বেশি সমীহ করতো।
মনিরা দিল্লী এলো বটে কিন্তু মনের অবস্থা তার মোটেই প্রসন্ন হলো না।
হাশেম চৌধুরী আর মাসুমা বান্ধবী মনিরাকে নিয়ে এখানে-ওখানে দিল্লীর প্রসিদ্ধ স্থানগুলো দর্শন করে বেড়াতে লাগলো। পুলিশ সুপার-পত্নী মাসুমা ও তার বান্ধবী যখন যেখানে যায়–সঙ্গে থাকে পুলিশ, আদালী আর থাকে বন্দুকধারী দেহরক্ষী।
স্বপন আর কল্পনাদের বাড়ির অদূরেই পুলিশ সুপার হাশেম চৌধুরীর বাংলো।
কল্পনা অত্যন্ত মিশুক মেয়ে। সে ছোটবেলা হতেই যে পুলিশ সুপার আসেন তার কন্যার সঙ্গে ভাব জমিয়ে নিতো। হাশেম চৌধুরী এখানে আসার পূর্বে এক বয়স্ক ভদ্রলোক ছিলেন। তাঁর মেয়ে মিস জেসমিন্ ছিলো কল্পনার বান্ধবী। তারা চলে যাবার পর এসেছেন হাশেম চৌধুরী তার স্ত্রী এবং মনিরাকে নিয়ে এ বাংলোয়।
একদিন কল্পনা গিয়ে ভাব জমিয়ে নিলো মাসুমা আর মনিরার সঙ্গে। কল্পনাকে পেয়ে মুগ্ধ হলো মাসুমা আর মনিরা। ওকে বড় ভালো লাগলো এই বিদেশ বিভূঁয়ে। নানা গল্পসল্পের মধ্যে অল্প সময়ে কল্পনা ওদের আপন করে নিলো।
তারপর প্রায়ই আসতো কল্পনা হাশেম চৌধুরীর বাংলোয়। একদিন মাসুমা বললো–কল্পনা, তোমার মাকে বেড়াতে আসতে বলো, কেমন?
কল্পনার মুখ বিষণ্ণ মলিন হলো, বললো সে–আমার বাবা-মা কেউ নেই। গলা ধরে আসে কল্পনার, চোখ দুটো অশ্রু ছলছল হয়ে উঠে।
মাসুমা আর মনিরা ব্যথা অনুভব করে তার কথায়।
মনিরার হৃদয়েই বেশি আঘাত করে তার কথাটা। কারণ সেও পিতৃ-মাতৃহারা অসহায়। কল্পনার বেদনা সে অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করে। বলে মনিরা বোন, তোমার কে আছে তবে?
আমার শুধু একটি ভাই, আর একটি দাদা আছেন। আমার ভাই বড় দুষ্ট কিন্তু আমার দাদা বড় ভাল, আমাদের অত্যন্ত স্নেহ করেন। আপনারা যাবেন দিদি আমাদের বাড়ি বেড়াতে?
কল্পনা মাসুমাকে বৌদি আর মনিরাকে দিদি বলে ডাকে।
কল্পনার কথায় বলে মনিরা–যাবো বোন, একদিন আমরা যাবো তোমাদের বাড়িতে।
এখানে কল্পনার সঙ্গে মনিরা যখন নানা গল্পে মেতে উঠেছে তখন তার দাদা দস্যু বনহুর এক। বাঈজীর বাড়ি গিয়ে হাজির হয়েছে, ধনকুবের রামচরণকে অনুসরণ করেই সে এসেছে এখানে। রামচরণ দিল্লীর সেরা ধনবান, তার অর্থ সৎ উপায়ে উপার্জিত নয়। নানারকম কুকর্ম দ্বারা সে প্রচুর। অর্থ সংগ্রহ করে থাকে। দিনে সে অর্থ লুটে নেয়, রাতে তা উজাড় করে দেয় বাঈজীর চরণে।
বনহুর আজ কদিন হলো রামচরণকে অনুসরণ করে তার কার্যকলাপ লক্ষ্য করে চলেছে। সত্যিই। সে শয়তান কিনা, এ সন্ধানটাই সে সংগ্রহ করে যাচ্ছে।
কয়েক দিন বনহুর পর পর এসেছে এখানে।
বাঈজী বনহুরের সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে তাকে বাগিয়ে নেবার চেষ্টা করেছে। বনহুর অভিনয় করেছে, অর্থ ঢেলে দিয়েছে উজাড় করে। কিন্তু ধরা দেয়নি সে সম্পূর্ণরূপে।
বাঈজী নাচ দেখাচ্ছিলো। অপরূপ সজ্জায় সজ্জিত বাঈজী। চরণে নুপূর, সমস্ত দেহ মূল্যবান অলঙ্কারে আচ্ছাদিত তাকিয়ায় ঠেশ দিয়ে বসে আছে ধনকুবের রামচরণ। বয়স তার পঞ্চাশের উপর, তবু তার সখ কমেনি। বাঈজী বাড়ি আসা তার নিত্য অভ্যাস।
বনহুর রামচরণের পাশে বসেছে।
আরও কয়েক জন লোক বসে নেশায় ঢুলু ঢুলু করছে আর মাঝে মাঝে জড়িত কণ্ঠে আবোল তাবোল বকছে।
রামচরণ তেওয়ারী তখন মশগুল, বাঈজীর নাচ তাকে বিমুগ্ধ করে ফেলেছে। অভিভূতের মত তাকিয়ে আছে সে বাঈজীর দিকে।
বাঈজী আনন্দে আত্মহারা। বিশেষ করে বনহুরকে দেখে তার মনে খুসির উৎস বয়ে চলেছে। চরণে ঝঙ্কার তুলে নেচে চলেছে বাঈজী।
বনহুর আলগোছে তুলে নেয় রামচরণ তেওয়ারীর পকেট থেকে মানিব্যাগটা। তারপর উঠে দাঁড়ায় আলগোছে।
বাঈজীর নাচ তখন শেষ হয়ে এসেছিলো, বনহুরকে উঠতে দেখে এগিয়ে গেলো তার দিকে উঠলে কেন বাবুজী?
আজ ঐ বাবুজীদের খুসি করো সুন্দরী, আমি আর একদিন আসবো। কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বেরিয়ে যায় বনহুর।
ফিরে আসে বাসায় বনহুর এবার।
পথের মধ্যে মানিব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নোটগুলো পকেটে রেখেছিলো বনহুর। আসার পথে স্বপন আর কল্পনার জন্য দুটো হীরক আংটি এনেছিলো বনহুর।
বনহুর আসতেই স্বপন আর কল্পনা ছুটে এলো গাড়ির পাশে। নেমে এলো বনহুর, স্বপন একটি হাত ধরলো আর কল্পনা ধরলো আর একটি হাত।
বনহুর এসে দাঁড়ালো হলঘরে।
কল্পনা বললো–দাদা, আজ আমি পুলিশ সুপারের বাংলোয় বেড়াতে গিয়েছিলাম। জানো দাদা, ও বাড়িতে দুটো বৌ আছে। বড় ভাল মেয়ে।
