বলতো স্বপন দাদা, আপনি মাঝে মাঝে কোথায় চলে যান বলুন তো?
হেসে জবাব দিতে বনহুর–আমার যে অনেক কাজ ভাই, তাই আমাকে যেতে হয়!
সত্যিই বনহুর শুধু এক কাজ নিয়ে মেতে থাকে না। সন্ন্যাসীদের আখড়ায় আড্ডা দিয়ে সন্ন্যাসী বাবাজীর সন্ধান করে, আরও খোঁজ নেয়–সত্যিই এরা আসল সন্ন্যাসী কিনা বা এরা কোনো শয়তান দলের লোক কিনা।
*
বেশিদিন বিলম্ব করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। একদিন স্বপন আর কল্পনার কাছে বিদায় নিয়ে ফিরে যায় বনহুর কেশব আর নূরীর কাছে।
কিন্তু আশ্রমে গিয়ে অবাক হয়ে যায়, কুঠির শূন্য–কেউ নেই। বনহুর ব্যাকুল কণ্ঠে ডাকে–নূরী– নূরী–নূরী কোথায় তুমি…
প্রতিধ্বনি ফিরে আসে, নেই নেই নেই–সে নেই…
দুর্দান্ত দস্যু সর্দার বনহুর মুষড়ে পড়ে, ধপ করে বসে পড়ে সে কুঠিরের বারান্দায়। বেদনা কাতর চোখে চারদিকে তাকিয়ে অন্বেষণ করে সে, কোথায় নূরী আর কেশব। সন্ন্যাসী বাবাজীও হয়তো আর ফিরে আসেননি। কেশব আর নূরী গেলো কোথায়? তবে কি কেশবের সঙ্গে নূরী চলে গেছে? কিন্তু কেন সে যাবে তার সঙ্গে। বনহুরের শরীরের রক্ত উষ্ণ হয়ে উঠে। তাহলে কি কেশবের সঙ্গে নূরীর কোনো সম্বন্ধ ছিলো? বহুদিন একত্রে বসো-বাস করার দরুণ হয়তো…না না, তা হয় না, নূরী সে ধরনের মেয়ে নয়। পরক্ষণেই আবার মনটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়, বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে নূরী আর কেশবের উপর।
উঠে দাঁড়ায় বনহুর, অবশ শিথিল পা দু’খানা টেনে নিয়ে চলে নদীতীরে। যেখানে নূরী আর সে বসে বসে দু’জনার জীবনের ঘটনা বর্ণনা করতো। একটা গাছের সঙ্গে ঠেশ দিয়ে দাঁড়ায় বনহুর। তাকিয়ে থাকে সে নদীবক্ষে। একটা মুখ ভেসে উঠে নদীর জলে–অসহায় করুণ মৃত্যুমলিন সে মুখ– লুসী। বনহুরের গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ে দু’ফোঁটা অশ্রু!
গোটাদিন ধরে সমস্ত বনটা চষে ফিরলো বনহুর। নূরী বা কেশবের কোনো সন্ধান পেলো না।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো একসময়।
বনহুর নীরবে প্রবেশ করলো সেই কক্ষে, যে কক্ষে সে পেয়েছিলো নূরীর সাক্ষাৎ। এক পাশে গুটানো রয়েছে খেজুর পাতার চাটাইখানা।
বনহুর চাটাইখানা বিছিয়ে নিয়ে শুয়ে পড়লো চীৎ হয়ে। অন্ধকার কক্ষ, আলো জ্বালার কোনো উপায় নেই। পিপাসায় কণ্ঠ শুকিয়ে এসেছে। গোটা দিন তার মুখে কিছু পড়েনি।
শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালো, পকেট থেকে ম্যাচ বের করে জ্বাললো। কক্ষটা ক্ষণিকের জন্য আলোকিত হলো, দেখলো ওপাশে মাটির প্রদীপটা তৈলবিহীন অবস্থায় দীপগছায় রয়েছে। শুষ্ক সলতেটায় ম্যাচের কাঠিটা বাড়িয়ে ধরলো বনহুর, কিন্তু তেলহীন সলতে জ্বললো না।
অত্যন্ত পিপাসা বোধ হওয়ায় এগিয়ে গেলো বনহুর কলসীটার দিকে। কিন্তু কলসী শুন্য, বনহুর হাত দিতেই কলসীটা গড়িয়ে পড়লো একদিকে।
বনহুর ফিরে এলো শয্যায়।
শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলো কত কথা। ভাবলো, আগের মত আজও যদি তার শিয়রে এসে বসতো নূরী, হাত রাখতো তার মাথায়। বনহুর ওকে খপ করে ধরে ফেলতো, বলতো কোথায় গিয়েছিলে তুমি? হেসে জবাব দিতো নূরী, সে অনেক দূর গিয়েছিলাম–সাত সমুদ্র তের নদী পার…না না এসব আবোল-তাবোল কি চিন্তা করছে সে। নূরী তার সঙ্গে ছলনা করেছে, তাকে ধোকা দিয়েছে সে। নূরী সম্বন্ধ গড়ে তুলেছে কেশবের সঙ্গে। নিশ্চয়ই কেশব আর নূরীর মধ্যে অস্পৃশ্য একটা…বনহুর নিজের মাথার চুল টেনে ছিঁড়তে লাগলো। অধর দংশন করতে লাগলো সে।
সমস্ত রাত্রি অসহ্য যন্ত্রণায় কাটলো বনহুরের। এতোটুকু ঘুম এলো না তার চোখে। কেনই বা নূরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটেছিলো, কেনই বা আবার বিচ্ছেদ ঘটলো। তার জীবন থেকে মুছে গিয়েছিলো নূরী সেই ভালো ছিলো!
বনহুর আবার ফিরে এলো দিল্লী নগরীতে। আনন্দে আপ্লুত হলো স্বপন আর কল্পনা। বনহুরকে পেয়ে খুসিতে উচ্ছল হলো তারা।
বনহুর নিজেকে স্বাভাবিক করে নেয়ার চেষ্টা করতে লাগলো। মনের জমাট ব্যথা-বেদনা আর দুশ্চিন্তাকে ভুলে থাকার জন্য স্বপন আর কল্পনাকে নিয়ে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতে লাগলো। তাজমহল, দিল্লীর দুর্গ, আকবরের সমাধি–বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায় বনহুর ওদের নিয়ে। সন্ন্যাসী। বাবাজী, কেশব আর নূরীর কথা সম্পূর্ণ মন থেকে মুছে ফেলতে চেষ্টা করে।
কিন্তু কিছুতেই মনকে বোঝাতে পারে না, ভুলতে পারে না কদিন আগের স্মৃতিগুলো। হাতড়ে চলে সে কেশব আর নূরীর আচরণের প্রতিটি ধাপ। সত্যিই কি নূরী আর কেশব…না না, ভাবতেও তার মন ঘৃণায় বিষিয়ে উঠে!
বনহুর সারাদিন স্বপন আর কল্পনাকে নিয়ে মেতে থাকলেও রাত্রির অন্ধকারে বেরিয়ে পড়ে তার সেই চিরপরিচিত জমকালো ড্রেসে। দিল্লী শহরের অলিগলি ঘুরে বেড়ায় আত্মগোপন করে। সন্ধান করে ফেরে কোথায় কাঁদছে অসহায় জনগণ এক মুষ্টি অন্নের তরে। কোথায় ধুকে ধুকে মরছে বিনা ঔষধে মুমূর্ষ রোগিগণ। কোথায় অসহায় নারীর অমূল্য ইজ্জৎ বিনষ্ট হতে চলেছে কোন শয়তান লম্পটের পাপময় নিষ্পেষণে। বনহুর বিনা দ্বিধায় হত্যা করে চললো এই সব পাপ-জর্জরিত কুৎসিৎ লোকদের। তাদের অর্থ লুটে নিয়ে বিলিয়ে দিতে লাগলো নিঃসহায় সম্বলহীন রিক্ত ব্যক্তিগণের মধ্যে।
শহরে জাগলো আতঙ্ক। এক মহা ভীতিকর ভাব। কে এসব হত্যা সংঘটিত করে চলেছে। কে এসব অর্থ লুটে নিচ্ছে। পুলিশ মহলে সাড়া পড়ে গেলো। সি আই ডি পুলিশ সমস্ত শহরে আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়লো কিন্তু কেউ হত্যাকারীকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হলো না।
