কল্পনা তখন ছুটে এসে স্বপনকে জাপটে ধরলো–দাদা, দাদা…
স্বপন তখন শুদ্ধ হয়ে দেখছে, এ যেন তার কল্পনার বাইরে।
সন্ন্যাসী বাবার প্রতি তার যে একটা ভুল ধারণা জন্মেছিলো এক্ষণে তার দূরীভূত হয়ে যায়।
ভাই এবং বোন দু’জন দু’জকে আঁকড়ে ধরে কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মত তাকিয়ে থাকে। থরথর করে কাঁপছে দু’জনা।
দস্যু বনহুর রুদ্র মূর্তি ধারণ করেছে, অন্ধকারে চোখ দুটো জ্বলছে তার। এগিয়ে আসছে বনহুর রাজনারায়ণের দিকে। দক্ষিণ হস্তে উদ্যত রিভলভার।
রাজনারায়ণ ভড়কে গেলেও সূতীক্ষ্ণ-ধার ছোরা বাগিয়ে ধরে রুখে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু এগুবার সাহস পাচ্ছে না সে।
বনহুর দাঁতে দাঁত পিষে বলে উঠে–রক্ত চেয়েছিলাম, এক জনের নিয়েছি। এবার তোমার রক্ত চাই। …হাঃ হাঃ হাঃ বনহুরের হাস্যধ্বনিতে বনভূমি প্রকম্পিত হয়ে উঠে।
শয়তান দুবৃত্ত, রাজনারায়ণ সে হাসির শব্দে ভড়কে যায়। তবু সে ছোরাখানা ঠিকভাবে বাগিয়ে রাখে।
বনহুর বলে উঠে আবার–জব্রুর দ্বারা অনেক করেছো, এবার তোমার শক্তি পরীক্ষার পালা রাজনারায়ণ।
স্বপন আর কল্পনার চোখেমুখে বিস্ময়। সন্ন্যাসী বাবাজী যে অদ্ভুত শক্তিশালী ব্যক্তি এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে তারা। শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসছে ওদের, কৃতজ্ঞতায় হৃদয় পূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু কোনো কথা বলতে পারছে না বা বলার মত অবস্থাও এখন নয়। ওরা তাকিয়ে আছে শুধু।
গাড়ির সার্চলাইটের আলোতে সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
জমকালো জব্রুর পাহাড়ের মত দেহটা কিছুক্ষণ ছট ফট করে নীরব হয়ে গেছে। আজ বনহুর তার পিছন দিক থেকে পিঠে গুলী করেছিলো। বনহুর জানতো, জব্রুর বুকে লৌহবর্ম আঁটা থাকে, তার বুকে কিছুতেই গুলী বিদ্ধ হবে না। এবার তাই সে পিছন থেকে গুলী করেছিলো।
রাজনারায়ণের মুখ বিবর্ণ হয়ে উঠেছে, সে ভীত নজরে তাকাচ্ছে বনহুরের দিকে।
বনহুর বললো–জীবনে অনেক পাপ করেছো রাজনারায়ণ। শুধু পাপই করোনি, তুমি বহু নিষ্পাপ প্রাণ বিনষ্ট করেছো। মিস লুসীর ফুলের মত একটা জীবনকে তুমি সমূলে ধ্বংস করেছে। আবার এই দু’টি অসহায় কচি জীবন-প্রদীপ আজ নিভিয়ে ফেলতে চেয়েছিলে, ক্ষমা তোমাকে করা যায় না…
ঠিক সে মুহূর্তে রাজনারায়ণ ছোরা হস্তে ঝাঁপিয়ে পড়তে যায় বনহুরের উপর।
কিন্তু সে সুযোগ আর দেয় না বনহুর তাকে, তার হস্তের রিভলভার গর্জে উঠে।
অমনি তীব্র আর্তনাদ করে ঘুরপাক খেয়ে জব্রুর বুকের উপর আছাড় খেয়ে পড়ে রাজনারায়ণ। রাজনারায়ণের বুকের রক্ত আর জুরুর রক্ত মিশে এক হয়ে যায়।
যমুনার তীরে পাশাপাশি পড়ে থাকে দু’টি মৃতদেহ।
রাজনারায়ণের দেহ নীরব হয়ে যায়।
বনহুর এগিয়ে আসে স্বপন আর কল্পনার দিকে।
স্বপন আর কল্পনা বনহুরের পায়ে প্রণাম করতে যায়।
ধরে ফেলে বনহুর, বলে–আমি সন্ন্যাসী নই, তোমাদের মতই একজন মানুষ।
স্বপন আর কল্পনার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেছে, কোনো কথা তাদের মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না। তারা যে জীবনে বেঁচে আছে একথা যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। কে এ মহান ব্যক্তি যে এতো শক্তিমান। যে এতো সহজে দুটি হিংস্র প্রাণ ধ্বংস করতে সক্ষম হলেন।
বললো বনহুর–তোমরা এবার নিশ্চিন্ত। তোমাদের মৃত্যুদূতকে আমি সরিয়ে দিয়েছি। চলো, তোমাদের বাসায় পৌঁছে দি।
স্বপন বললো এতোক্ষণে–আপনাকে কি বলে ধন্যবাদ দেবো বাবাজী…
হেসে বললো বনহুর–বাবাজী নয়, বলো দাদা। আর ধন্যবাদ দিতে হবে না, আমি তোমাদেরই একজন।
বনহুর দু’ভাই-বোনকে গাড়িতে তুলে নিলো।
বললো স্বপন–এ জঙ্গলে আমি তো গাড়ি চালাতে পারবো না দাদা।
বনহুর বললো–তোমাকে চালাতে হবে না ভাই, তোমরা চুপ করে বসো, আমি তোমাদের নিয়ে যাচ্ছি।
অবাক হয়ে কল্পনা বললো–আপনি গাড়ি চালাতে জানেন?
তোমাদের দাদা সব জানে, বসো বোন। বনহুর ড্রাইভিং আসনে বসে গাড়িতে ষ্টার্ট দিলো।
গহন বনে বনহুরের হাতে গাড়িখানা ছুটতে শুরু করলো। পিছনে পড়ে রইলো জুক্ত আর রাজনারায়ণের প্রাণহীন দেহ দুটো।
নিয়তির কি পরিহাস!
মারতে গেলে কাদের আর মরলো কারা।
রাজনারায়ণ কি জানতো আজ তাদের আয়ু শেষ হয়ে গেছে।
ভেবেছিলো সে–স্বপন আর কল্পনাকে পথ থেকে সরিয়ে নিশ্চিন্ত মনে পৃথিবীর বুকে বিচরণ করে ফিরবে।
*
সেদিন স্বপন আর কল্পনা কিছুতেই বনহুরকে ছেড়ে দিলো না। বনহুরও ফেলতে পারলো না ভাই বোনের অনুরোধ। তারা যেন বহুদিন পর আপন দাদাকে ফিরে পেয়েছে। সেকি আনন্দ তাদের!
এ শহরে দস্যু বনহুরকে কেউ চেনে না।
কাজেই স্বপন আর কল্পনার দাদা হতে তার কোনো অসুবিধা হলো না। বনহুর সাবধান করে দিয়েছে স্বপর আর কল্পনাকে–তারা যেন কারো কাছে ভুলেও কোনোদিন না বলে তার কাকা রাজনারায়ণ আর জব্রু কোথায় গেছে।
স্বপন আর কল্পনা বনহুরকে পেয়ে আনন্দে অধীর! বনহুর যেন তাদের কত পুরোনো বন্ধু বা দাদা। ওরা দু’জনা দাদা বলতে পাগল।
বনহুরের সঙ্গেই সারাদিন দিল্লী শহরটা ওরা চষে ফেরে। অবশ্য বনহুরের উদ্দেশ্য তার সন্ন্যাসী বাবাজীকে অন্বেষণ করা। কাজেই সেও রয়েই গেলো কয়েকদিনের জন্য।
এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ায় তিন জনা।
কিন্তু বনহুর সন্ন্যাসীর সন্ধান পেলো না। মনটা তার ছট-ফট করে উঠলো, তবে কি সন্ন্যাসীর বাবা শহরে কোথাও আটকা পড়েছে? হয়তো তাই হবে। বনহুর নিজে সন্ন্যাসী সেজে শহরে সন্ন্যাসীদের আখড়ায় আখড়ায় ঘুরে বেড়াতে লাগলো। অবশ্য স্বপন আর কল্পনার অগোচরে সে একাজ করতো।
