একটা লোক এসে বললো–গাড়ি প্রস্তুত মালিক।
রাজনারায়ণ এবার সন্ন্যাসী বাবাজীসহ অগ্রসর হলো। তাদের পিছনে স্বপন আর কল্পনা এলো।
জব্রুও আছে সকলের পিছনে।
জব্রু স্বপন আর কল্পনার অপরিচিত নয়। আরও কত দিন ওর সঙ্গে বেড়াতে গেছে ওরা। তবু আজ এতো রাতে ব্রুকে তাদের সঙ্গে যেতে দেখে কেমন সন্দেহ জাগলো তাদের মনে।
স্বপন আর কল্পনার মুখে কোনো কথা নেই।
মনে মনে ঈশ্বরের নাম জপছে ওরা।
গাড়ি ছুটে চলেছে।
গভীর রাত্রির নিস্তব্ধতায় পথ থম থম করছে। ট্রাফিক পুলিশ নেই, কিন্তু ট্রাফিক আলোগুলো পথের বাকে নিয়মিত কাজ করে চলেছে।
ট্রাফিক আলো তার রক্তচক্ষু বিস্ফারিত করে গাড়িখানাকে ক্ষান্ত হবার জন্য নির্দেশ দিলো কিন্তু খুনের নেশায় উন্মুক্ত হয়ে উঠেছে রাজনারায়ণ, ট্রাফিক আলোর রক্তচক্ষুর ভয়ে সে ক্ষান্ত হলো না। তার গাড়িখানা তীব্রগতিতে চলে গেলো পার হয়ে।
ড্রাইভিং আসনে রাজনারায়ণ স্বয়ং উপবেশন করেছে। নিজে গাড়ি চালাচ্ছে সে।
তার পাশে বসে সন্ন্যাসী বাবাজী।
পিছন আসনে জব্রু আর স্বপন ও কল্পনা।
স্বপন আর কল্পনা বলির পশুর মত যেন কুকুঁড়ে গেছে, বিশেষ করে কল্পনা নীড়হারা পাখির মত ভাইকে আঁকড়ে ধরে কাঁপছে।
শহর ছেড়ে নির্জন পথে গাড়ি ছুটছে এখন।
দুই ধারে গহন বন।
ভয়ে শিউরে উঠে স্বপন আর কল্পনা।
কল্পনা বলে উঠে–কাকা, আমাদের আপনি কোথায় নিয়ে চলেছেন? ড্রাইভ আসন থেকে বলে রাজনারায়ণ–নিরাপদ স্থানে। ভয় নেই চুপচাপ বসে থাকো।
সন্ন্যাসী বাবাজী মাঝে মাঝে উচ্চারণ করছিলো হর হর শিবও শঙ্করও…হর হর শিবও শঙ্কর…
ক্রমেই এমন পথে গাড়ি এসে পড়েলো, যে পথে আলোর কোন সন্ধান নেই।
সন্ন্যাসীবেশী বনহুর তার চোরা পকেটে রিভলভারের অস্তিত্ব অনুভব করে নিলো।
এবার স্বপন আর কল্পনার সন্দেহ সত্য বলে মনে হলো। সন্ন্যাসীও যে তার কাকার লোক তাতে কোনো ভুল নেই। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে নিলো তারা।
রাজনারায়ণ জীপগাড়ি অসমান বনভূমির মধ্যে অগ্রসর হচ্ছে। দু ধারে গহন জঙ্গল, গাড়ির সার্চলাইটের আলোতে পথের পাশে বন্য জন্তুগুলো ছুটে ছুটে পালিয়ে যাচ্ছিলো।
বনহুর আপন মনে হাসছে।
রাজনারায়ণের মনে আজ খুনের নেশা। এদের দুজনকে হত্যা করতে পারলেই সে নিশ্চিন্ত। আর কেউ থাকবে না তার পথে বাধা হিসেবে। সন্ন্যাসী বাবাও তার পরম হিতৈষী। তার কথা-মতই স্বপন আর কল্পনাকে নিয়ে চলেছে সে গহন বনের মধ্যে, হত্যা করে ভাসিয়ে দেবে ওদের মৃতদেহ যমুনা নদীবক্ষে। তারপর আপদ চুকে যাবে। সন্ন্যাসী বাবার শুধু চাই কুমার এবং কুমারীর তাজা রক্ত।
এক সময় রাজনারায়ণের গন্তব্য স্থানে তারা পৌঁছে যায়।
গাড়ি রেখে নেমে পড়লো রাজনারায়ণ। দরজা খুলে ধরে অনুনয়ের সুরে বললো–আসুন গুরু বাবাজী!
সন্ন্যাসীবেশী দস্যু বনহুর নেমে দাঁড়ালো–হর হর শিবও শঙ্করও!
জব্রুও নামলো গাড়ি থেকে।
অসহায়ের মত কাঁপছিলো স্বপন আর কল্পনা।
রাজনারায়ণ বললো এবার–নেমে এসো তোমরা দু’জনা।
কল্পনা স্বপনের হাত দু’খানা জড়িয়ে ধরলো–না, আমরা নামবো না। আপনি আমাদের এ কোথায় নিয়ে এলেন বলুন?
কঠিন কণ্ঠে বললো রাজনারায়ণ–নেমে এসো তোমরা।
স্বপন এবার গম্ভীর কণ্ঠে বললো–আমাদের আপনি হত্যা করবেন জানি। তা বাড়িতেই করলে পারতেন?
নেমে এসো, কথা বাড়িও না বলছি। বললো রাজনারায়ণ।
কল্পনা তো হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলো–দাদা, এবার কি হবে আমাদের! দাদা গো, দাদা…
স্বপন নেমে পড়লো গাড়ি থেকে, ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো সন্ন্যাসীর পা দু’খানা। কেঁদে ফেললো। সে–সন্ন্যাসী বাবাজী, আমাদের বাঁচান… বাঁচান…
রাজনারায়ণ এক ঝটকায় টেনে তুলে নিলো স্বপনকে। তারপর জব্রুকে ইংগিত করলো!
জব্রু অমনি কোমরের বেল্ট থেকে খুলে নিলো সূতীক্ষ ধার ছোরাখানা। জীপ গাড়ির সার্চলাইট জ্বলছে, তারই আলোতে বনভূমি আলোকিত হয়ে উঠেছে। জব্রুর হাতে ছোরাখানা ঝক্-ম করে। উঠলো।
স্বপন আর কল্পনা শিউরে উঠলো।
রাজনারায়ণ এবার কল্পনাকে টেনে নামিয়ে আনলো গাড়ি থেকে।
সন্ন্যাসী বাবাজী শব্দ করে উঠলো–হর হর শিবও-শঙ্করও…হর হর শিবও শঙ্করও…
জব্রু স্বপন আর কল্পনাকে টেনে নিয়ে গেলো যমুনার তীরে। গাড়ির আলো এখানে স্পষ্ট হয়ে দেখা যাচ্ছে।
রাজনারায়ণ গেলো তাদের সঙ্গে।
রাজনারায়ণ প্রথম স্বপনকে হত্যা করার জন্য ইংগিত করলো।
জব্রু হুঙ্কার ছাড়লো–হুম হুম হুয়াম–সঙ্গে সঙ্গে সে ছোরাখানা উদ্যত করে রুখে দাঁড়ালো।
কল্পনা আর্তনাদ করে দু’হাতে চোখ ঢেকে ফেললো।
পরক্ষণেই বনভূমি প্রকম্পিত করে গর্জে উঠলো রিভলভারের শব্দ।
অমনি ভয়ঙ্কর একটা তীব্র শব্দ করে খুরপাক খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো জব্রু ভূতলে!
সঙ্গে সঙ্গে অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে ফিরে তাকালো রাজনারায়ণ। রাগে ক্ষোভে, বিস্ময়ে স্তম্ভিত হলো, দেখলো সন্ন্যাসী বাবাজীর দক্ষিণ হস্তে উদ্যত রিভলভার। তার মুখের দাড়ি খসে পড়েছে, অস্পষ্ট হলেও রাজনারায়ণের চিনতে বাকি রইলো না–এ যে মিঃ আলম–স্বয়ং দস্যু বনহুর।
রাজনারায়ণ প্রথমে হকচকিয়ে গেলো, পরক্ষণেই আঁচ করে নিলো ব্যাপারটা। মুহূর্তে বিলম্ব না। করে ভূতললুণ্ঠিত মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট্ত জর হাতের মুঠা থেকে ছোরাখানা তুলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সে।
