রাজনারায়ণ চলে যায় বটে কিন্তু সে সবসময় বড় ভাইকে নিঃশেষ করার চেষ্টা করে।
ফিরে আসে অনেক দিন পরে দিল্লীতে বড় ভাই-এর বাড়িতে।
ক্ষমাশীল শ্যাম নারায়ণের রাগ তখন পড়ে এসেছিলো, তিনি ছোট ভাইকে বিশ্বাস করে আশ্রয় দিয়েছিলেন নিজ বাড়িতে।
তিনি সেদিন জানতেন না তার সহোদয় তাকে চরমভাবে শাস্তি দেবে। উপরে সাধু সেজে নিচে নিচে জঘন্য কাজে লিপ্ত হলো রাজনারায়ণ। জব্রুকে সে নিজের আয়ত্তে এনে নিলো কৌশলে।
তারপর একদিন শ্যামনারায়ণকে জ্বর দ্বারা হত্যা করলো রাজনারায়ণ, বৌদিও বাদ গেলো না।
একদিন রাতে স্বামীশোকে কাতর বৌদি কচি দুটি বাচ্চা নিয়ে শুয়ে আছেন নিজের শয়নকক্ষে। এমন সময় তার কক্ষে প্রবেশ করে রাজনারায়ণ, তার পিছনে জমকালো ভূতের মত নিগ্রো শয়তান জব্রু।
জব্রুকে দেখে শিউরে উঠেছিলো বৌদি এতো রাত্রে তার কক্ষে সে কেন। কিন্তু রাজনারায়ণকে দেখে বুকে সাহস হয়েছিলো, পরক্ষণেই তার মুখে দৃষ্টি পড়তেই বৌদির দেহের রক্ত হিম হয়ে গিয়েছিলো। রাজনারায়ণের দু’চোখে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে।
করুণ কণ্ঠে বলেছিলো বৌদি ঠাকুরপো, এতো রাত্রে তোমরা আমার ঘরে কেন?
রাজনারায়ণ দাতে-দাত পিষে বলেছিলো একটু পরেই টের পাবে কেন এসেছি আমরা। পরক্ষণেই রাজনারায়ণ জব্রুর দিকে তাকিয়ে কিছু ইংগিত করেছিলো।
সঙ্গে সঙ্গে জব্রু তার লৌহসবল হাত দু’খানা বাড়িয়ে চেপে ধরেছিলো বৌদির গলা। একটু-টু শব্দ বের হয়নি তার কণ্ঠ দিয়ে।
পরদিন স্বপন আর কল্পনা তাদের শয্যায় মাকে মৃত অবস্থায় দেখেছিলো।
কচি শিশু তখন স্বপন আর কল্পনা। ওরা জানে না, কি করে তাদের মায়ের মৃত্যু হয়েছে।
শয়তান রাজনারায়ণ বড় ভাই এবং বৌদিকে সরিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেও একেবারে নিশ্চিন্ত হলো না। কিন্তু চট করে কচি দুটি শিশুকে হত্যা করতেও সাহসী হলো না সে। ভাবলো ওদের হত্যা করতে আর কতক্ষণ। এখন তো আর তার কাজে বাধা দেয়ার নেউ নেই। যা খুসি সে করে যাবে। এ বাড়ি ঘর ঐশ্বর্য সব এখন তার। বাচ্চা দুটি তো চুনের ফোঁটা। জ্বর নখের টিপ দিলেই ওরা চলে যাবে পরপারে। কাজেই বাচ্চা দুটোর জন্য আর বেশি ভাবতে হবে না।
রাজনারায়ণ দাদা শ্যামনারায়ণের গদি দখল করে নিয়ে জেঁকে বসলো। এখন সে পূর্বের সেই দীনহীন রাজনারায়ণ নয়। এখন সে রাজ-রাজেশ্বর, কোটি টাকার মালিক রাজনারায়ণ। সে গোপনে দিল্লীর বুকে নানারকম কুকর্ম শুরু করলো। মুসলমান নাম ধারণ করে গুলশান হোটেলের ম্যানেজার সেজে চালালো তার নানারকম মন্দ ব্যবসা। জব্রু হলো তার দক্ষিণ হস্ত। জব্রুকে দিয়ে সে রাতে শহরে নানা রকম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে চললো। জব্রুকে কেউ যেন নিহত করতে না পারে সেজন্য তার দেহে লৌহ বর্ম পরিয়ে দিতো রাজনারায়ণ।
গভীর রাতে রাজনারায়ণ তার ভূগর্ভের আস্তানায় যেতো এবং জব্রু তখন বিচরণ করতো রাতের ভয়ঙ্করের মত পৃথিরাজের রাজপ্রসাদের আনাচে-কানাচে। কারণ পৃথিরাজের শিব মন্দিরেই ছিলো রাজনারায়ণবেশী রিজভীর আস্তানার সুড়ঙ্গ মুখের গোপন দ্বার।
রাজনারায়ণ পরম নিশ্চিন্তে তার কার্য সাধন করে চললেও মনে তার কাঁটার খোঁচা ছিলো, যতক্ষণ স্বপন আর কল্পনাকে তার পথ থেকে সরাতে না পেরেছে ততক্ষণ স্বস্তি নেই।
ক্রমেই বড় হয়ে উঠেছে ওরা, পিতামাতা সম্বন্ধে তাদের মনে নানা প্রশ্নের উদয় হচ্ছে। পিতার ঐশ্বর্যের প্রতি আসছে মোহ, কাজেই আর বিলম্ব নয়।
এবার পথের কাঁটা উপড়ে ফেলতেই হবে।
খুনের নেশায় উন্মুক্ত হয়ে উঠেছে রাজনারায়ণ। রিভলভার খুঁজে না পেয়ে বের করলো তার সূতীক্ষ্ণ ধার ছোরাখানা। আংগুল দিয়ে ধার পরীক্ষা করে দেখলো, তারপর বেরিয়ে এলো কক্ষ থেকে।
হাতঘড়িটার দিকে তাকাচ্ছে রাজনারায়ণ বার বার।
রাত দুটো প্রায় বাজতে চলেছে। সন্ন্যাসীর জন্য প্রতীক্ষা করছে সে।
জব্রুও জেগে উঠে সজাগ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার কোনো অস্ত্রের প্রয়োজন হয় না। জব্রুর হাত। দু’খানাই হলো লৌহ সাড়াশী। এ হাত দু’খানা দিয়ে সে যা খুসি তাই করতে পারে। শুধু রাজনারায়ণ রিজভীর সামান্য ইঙ্গিত মাত্র।
জব্রুর দেহে লৌহ বর্ম পরিয়ে দেয়া হয়েছে।
রাজনারায়ণের পাশে নিদ্রাজড়িত চোখে দাঁড়িয়ে আছে স্বপন আর কল্পনা। মুখ তাদের বিবর্ণ হয়ে উঠেছে। কই, সন্ন্যাসী বাবা তো তাদের বাঁচাতে এলেন না। তবে কি সব ফাঁকি? সন্ন্যাসী বাবাও কি। তাদের সঙ্গে ছলনা করেছে!
প্রথমে স্বপন আর কল্পনা কিছুতেই রাজি হয়নি তাদের কাকার সঙ্গে যেতে। কিন্তু রাজনারায়ণ যখন তাদের ভীষণভাবে শাসন করেছিলো তখন রাজি না হয়ে কোনো উপায় ছিলো না। ভেবেছিলো, একদিন যখন মরতে হবে তখন মরবে তারা। দু’ভাই বোন সানন্দে মৃত্যুকে বরণ করে নেবে।
হঠাৎ সন্ন্যাসী এসে হাজির হলো।
রাজনারায়ণের চোখ দুটো খুসিতে ভরে উঠলো।
তেমনি খুসি হলো স্বপন আর কল্পনা। মনে তাদের সাহস হলো সন্ন্যাসী বাবাজী এসেছে, আর হয়তো তাদের যেতে হবে না। হয়তো এবার তিনি রক্ষা করবেন তাদের দুজনকে।
কিন্তু একি, সন্ন্যাসী বাবাজী তাদের হয়ে দুটো কথাও বললেন না। বরং তাদের যেন দেখেননি কোনোদিন, এমনি ভাব দেখাচ্ছেন। কিন্তু তিনি যদি তাদের মঙ্গলের জন্যই না আসবেন তবে এতো রাতে কি করতে এসেছেন এখানে। তবে কি তাদের কাকার সঙ্গে তারও যোগ আছে। শিউরে উঠলো ওরা-হয়তো তাই হবে, নাহলে…
