হাঁ, তাকে নিতেই হবে, কারণ তার হস্তেই কাঁটা দুটোকে উপড়ে ফেলতে হবে।
হাতঘড়ি দেখে রিজভী–সন্ন্যাসী বাবাজী, রাত এখন দশটা বেজে গেছে।
রাত দুটোয় আমাদের রওয়ানা দিতে হবে। বললো সন্ন্যাসীবেশী বনহুর। তারপর আবার বললো সে–আমি যাই, ঠিক সময় পৌঁছে যাবো।
কিন্তু অতোরাতে আপনি যদি ঠিভাবে এসে না পৌঁছান, তাহলে?
আমার জন্য কোনোরকম ভাবনা ভাবতে হবে না। দুই-দুটো লোকের রক্তের নেশা কম নয়। উঠে দাঁড়ায় বনহুর।
রিজভী পদধূলি গ্রহণ করে।
সন্ন্যাসীবেশী বনহুর হাত তুলে আশীর্বাদ জানায়।
বেরিয়ে যায় সন্ন্যাসীবেশী বনহুর।
*
বনহুর সন্ন্যাসীর বেশে, সন্ন্যাসী বাবাজীকে খুঁজতে শহরে চলে গেলো। কেশব আর নূরী রইলো জঙ্গলের কুঠিরে।
এদিকে বনহুর চলে যেতেই সন্ন্যাসী বাবাজী এসে হাজির হলেন। শহরে রাত্রি হয়ে যাওয়ায় তিনি ফিরতে পারেননি–গত রাত্রি তাই তিনি শহরে কাটিয়েছিলেন। আশ্রমে পৌঁছে তিনি যখন শুনলেন, বাবুজী তার খোঁজে চলে গেছে শহরে, তখন সন্ন্যাসী বাবার মুখ গম্ভীর হলো। কারণ শহর এ জঙ্গল ছেড়ে বহু দূরের পথ। এতো দূর সে যাবে কি করে, তারপর কোথায় তাকে খুঁজে ফিরবে!
কেশব আর নূরী সন্ন্যাসী বাবাজীর সঙ্গে চিন্তিত হয়ে পড়লো। এখন বনহুরকে ফিরিয়ে আনার উপায় কি!
বিশেষ করে এসব জায়গা তার কাছে সম্পূর্ণ নতুন।
এখানে যখন সন্ন্যাসী বাবাজী, কেশব আর নূরী বনহুরকে নিয়ে চিন্তায় অস্থির তখন বনহুর রাজা নারায়ণবেশী মাহমুদ রিজভীকে শায়েস্তা করার জন্য তৈরি হয়ে নিচ্ছিলো। বনহুর জানে, সন্ন্যাসী বাবাজী ছোট্ট বাচ্চা শিশু নন যে, হারিয়ে যাবেন, তিনি শহরের কোথাও আছেন তাকে খুঁজে এখন কোনো ফল হবে না; ভাগ্যক্রমে শয়তান রিজভীর সাক্ষাৎলাভ যখন ঘটেছে তখন তাকে তার কর্মফলের উপযুক্ত শাস্তি না দিয়ে স্বস্তি নেই বনহুরের।
রিজভীকে আজ এভাবে না পেলেও বনহুর যে তাকে ছেড়ে দেবার লোক নয় দিতো না এটা সুনিশ্চয়। রিজভী শুধু তাকেই শাস্তি দান করেনি–লুসীকে হত্যা করেছে। তার অমূল্য সতীত্ব বিনষ্ট করেছে সে। বনহুরের শিরায় শিরায় যে বহ্নিশিখার মত সে আগুন জ্বলছে। এতো সহজে বনহুর রিজভীকে যে হাতের মুঠায় পাবে ভাবতে পারেনি। বনহুর খোদার কাছে শুকরিয়া আদায় করে নেয়।
বনহুর এসে দাঁড়ায় রাজ নারায়ণের কক্ষের পিছনে। সমস্ত বাড়িখানা সুপ্তির কোলে ঢলে পড়েছে। হয়তো রাজনারায়ণ তার কার্য সিদ্ধির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বনহুর পিছনের পাইপ বেয়ে তর তর করে উঠে গেলো উপরে। রেলিং টপকে বেলকুনিতে এসে নামলো। ওদিকের দরজা খুলে উঁকি দিলো ভিতরে, কক্ষ খালি–কেউ নেই। বনহুর দ্রুত প্রবেশ করলো কক্ষমধ্যে। এ কক্ষটিই যে রাজনারায়ণের শয়নকক্ষ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রাজনারায়ণবেশী রিজভী কোথায়। এমন সময় কানে ভেসে এলো ওদিকের কোনো এক কামরা থেকে রিজভীর কণ্ঠ স্বর–স্বপন, কল্পনা, তোমরা তৈরি হয়ে নাও, এক জায়গায় তোমাদের যেতে হবে। রাত দুটোয় রওয়ানা দেবেন।
সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর, তরুণের গলা শোনা গেলো–কাকা, এতো রাতে আমাদের আপনি কোথায় নিয়ে যাবেন?
বনহুর বুঝতে পারলো, শয়তান রিজভী ভ্রাতুস্পুত্র এবং ভ্রাতুস্পুত্রীকে তৈরি করে নিচ্ছে। ওদের নাম স্বপন আর কল্পনা এ কথাও বনহুরের জানা হয়ে গেলো।
ওদিকে যখন রিজভী নিঃসন্দেহে স্বপন আর কল্পনাকে বুঝিয়ে বাগে এনে নিচ্ছিলো, তখন বনহুর দ্রুত হস্তে তার কাজ সমাধা করে নিলো। বালিশ তুলে দেখলো, তারপর আলনায় ঝোলানো কোটের পকেট হাতড়ে পেলো চাবীর গোছা। চাবী দিয়ে খুলে ফেললো লৌহ্ আলমারী,ক্ষিপ্রতার সঙ্গে রিভলভারখানা পকেটে রাখলো। পকেটে রাখবার পূর্বে দেখে নিলো তাতে গুলী মজুত আছে কিনা। বনহুর জানে, শয়তানের রিভলভার কোনো দিন শূন্য থাকার নয়। গুলীভরা রিভলভার পকেটে রেখে টাকার কয়েকটা বাণ্ডিল উঠিয়ে নিলো। তারপর বেরিয়ে গেলো কক্ষ হতে।
একটু পরে ফিরে এলো রিজভী তার কক্ষে। বেশ নিশ্চিন্ত সে, কারণ স্বপন আর কল্পনা তার কথায়। রাজি হয়েছে।
কক্ষে প্রবেশ করে অবাক হলো–লৌহ আলমারী খোলা পড়ে রয়েছে। তবে কি কেউ তার কক্ষে প্রবেশ করেছিলো? কিন্তু কি করে তা সম্ভব! সমস্ত বাড়ি মজবুত প্রাচীরে ঘেরাও রয়েছে। সিঁড়ির মুখে দরজায় তালা বন্ধ, তাছাড়াও গেটের পাশে সজাগ পাহারা দিচ্ছে পাহারাদার। সিঁড়ির মুখে খুপড়ীতে ঘুমাচ্ছে জব্রু। কারো সাধ্য নেই তার কক্ষে প্রবেশ করে।
আজ দশ বছর হলো এ বাড়িতে আছে রিজভী। এ বাড়ি আসলে তার নয়, তার বড় ভাই শ্যামনারায়ণের বাড়ি এটা। রাজনারায়ণ হলো তার নাম। বহুদিন বিদেশে কাটিয়ে রাজনারায়ণ যখন দিল্লী তার বড় ভাই-এর বাড়ি এসে হাজির হলো তখন সে দীনহীন ভিখারীর চেয়েও কাঙাল। এক পয়সা তার সম্বল ছিলো না, ছিন্নভিন্ন তার জামা-কাপড়।
ছোটবেলা থেকেই রাজনারায়ণ ছিলো ভয়ানক দুষ্ট প্রকৃতির। নানারকম উচ্ছলতা তার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছিলো পূর্ব হতেই। শ্যামনারায়ণ ছিলেন তেমনি মহৎপ্রাণ লোক। ছোট ভাই-এর এতো দোষ থাকা সত্ত্বেও তাকে অত্যধিক স্নেহ করতেন তিনি।
কিন্তু রাজনারায়ণ বড় ভাইকে মোটেই ভক্তি করতো না বরং কিসে বড় ভাই-এর অমঙ্গল করতে পারবে সেই চেষ্টা করতো সে। একদিন ভীষণ এক মন্দ কাজ করে বসে রাজনারায়ণ। তখন শ্যামনারায়ণ তাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেন।
