হাতে তার চিমটা আর রুদ্রাক্ষের মালা। মাথায় একরাশ কোঁকড়ানো চুল। বনহুরের মুখে আলগা দাড়ি-গোঁফ। এক গাদা দাড়ি-গোঁফের মধ্যে সুন্দর দীপ্তময় দুটি আঁখি। তীক্ষ্ণ অন্তর্ভেদী দৃষ্টি সে আঁখি দুটিতে।
বনহুর মাহমুদ রিজভীকে চিনতে পারলো কিন্তু মাহমুদ রিজভীর সাধ্য নেই সে বনহুরকে চিনতে পারে। তাছাড়া মাহমুদ রিজভী জানে, মিঃ আলমবেশী দস্যু বনহুর আর লুসীর গভীর নদীবক্ষে মৃত্যু ঘটেছে। ভাবতেও পারবে না সেমিঃ আলমের মৃত্যু হয়নি–সে আজ তার সম্মুখে।
সন্ন্যাসী বাবাকে দেখে উঠে দাঁড়ায় রাজনারায়ণবেশী মাহমুদ রিজভী। দু’হাত জুড়ে অভিবাদন করে, তারপর বলে–বসুন সন্ন্যাসী বাবাজী।
বনহুর আসন গ্রহণ করে।
মাহমুদ রিজভী বলে এবার–বাবাজী, হঠাৎ কি মনে করে এসেছেন জানতে পারি কি?
হ বৎস, সব জানতে পারবে এবার।
বলুন বাবাজী?
বৎস, আমি যোগ সাধনায় বসে জানতে পারলাম, এ শহরে রাজনারায়ণ নামক ব্যক্তি অচিরেই রাজ ঐশ্বর্য লাভে লাভবান হবেন। কিন্তু পথে দুটি কাটা আছে। ঐ কাঁটা দুটি যতক্ষণ উপড়ে ফেলা না যাবে, ততক্ষণ ঐ রাজ ঐশ্বর্য লাভ হলেও স্থায়ী হবে না। আমি তাই অনেক সন্ধান নিয়ে তবে তোমার নিকটে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছি। আমার এই প্রচেষ্টায় তোমার যদি রাজ ঐশ্বর্য লাভ হয় তবে আমি ধন্য হবো।
খুসিতে মাহমুদ রিজভীর চোখ দুটো জ্বলে উঠে, বলে সে–বাবাজী, আপনার সেবা করতে পারলে ধন্য হবো। বহুদূর থেকে এসেছেন, নিশ্চয়ই আপনি ক্লান্ত এবং ক্ষুধার্ত।
হাঁ বৎস, আমি অত্যন্ত ক্লান্ত।
মাহমুদ রিজভী কলিং বেলে চাপ দিলো।
সঙ্গে সঙ্গে কক্ষে প্রবেশ করলো একটি বয়। ছালাম করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
রিজভী বললো–সন্ন্যাসী বাবাজীর খাবার জন্য দুধ, আর কিছু ফলমূল নিয়ে এসো।
চলে গেলো বয়।
রিজভী আগ্রহভরে এগিয়ে এসে বসলো বনহুরের পাশের আসনে। বললো–বাবাজী, আপনি যোগ সাধনায় যা দেখেছেন তা সত্য। রাজ ঐশ্বর্য আমার হাতের মুঠায়, কিন্তু আমি নিশ্চিন্ত নই। আমার পথে দুটো কাঁটা আছে।
হাঁ, আমি জানি।
বাবাজী, আমি আজ রাতে ঐ কাঁটা দুটোকে শেষ করে ফেলবো মনস্থ করেছি। চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে দেখে নেয়–ঐ কাঁটা দুটো হলো…থামলো রিজভী।
বনহুর বলে উঠলো–আমি জানি তারা কে? তোমার মৃত ভাই-এর পুত্র এবং কন্যা।
হাঁ, আপনি ঠিক বলেছেন বাবাজী। রিজভীর বিশ্বাস আরও গাঢ় হয়।
বলে আমার বনহুর–কিন্তু বৎস, তুমি যে ভাবে ওদের হত্যা করতে মনস্থ করেছে তাতে অসুবিধা আছে।
তাহলে উপায় বলে দিন বাবাজী? আমি সেভাবেই ওদের খতম করবো।
ধীরে ধীরে কাজ করতে হবে বৎস। বেশি উতালায় সব পণ্ড হতে পারে।
এমন সময় বয় ট্রের উপরে নানারকম ফল এবং এক গেলাস খাঁটি দুধ নিয়ে আসে।
রিজভী নিজের হাতে বনহুরের সম্মুখে ফলমূল আর দুধের গেলাস সাজিয়ে রাখে, তারপর বলে– ভক্ষণ করুন বাবাজী।
বনহুর ক্ষুধার্ত ছিলো, কোনোরকম আপত্তি না করে পেট পূর্ণ করে খেয়ে নেয়।
ক্ষুধা নিবৃত্ত হবার পর সে বলে– বৎস, এবার আমার বিশ্রামের প্রয়োজন।
মাহমুদ রিজভী কিছু চিন্তা করলো, তারপর বললো–বাবাজী, একটি কথা আমাকে বলে আপনি বিশ্রাম করুন।
বলো বৎস?
আজ আমি আমার ভ্রাতুস্পুত্র রাজা মহেন ও ভ্রাতুস্পুত্রী মোহিনীকে শেষ করবো মনস্থ করেছিলাম। কিন্তু…
বলো বৎস, আমার কাছে সঙ্কোচের কোনো প্রয়োজন নেই।
আমার প্রধান অনুচর জব্রু এদের দু’জনাকে গলা টিপে হত্যা করবে, তারপর জব্রু মৃতদেহ দুটিকে যমুনাবক্ষে ফেলে দিয়ে আসবে। কেউ জানবে না ওরা কোথায় গেছে।
শুভাংশু…শুভাংশু…জয় জয় হর হর শিবও শঙ্করও…সব ঠিক আছে।
তাহলে এভাবেই কাজ করবো?
হাঁ, কিন্তু এতো ব্যস্ত হলে কার্য সফল নাও হতে পারে।
তাহলে বলে দিন বাবাজী?
সব বলছি, সেভাবে কাজ করবে।
শয়তান মাহমুদ রিজভী সন্ন্যাসীবেশী দস্যু বনহুরকে চূড়ান্তভাবে বিশ্বাস করে নিলো। বললো রিজভী–বলুন আমি কিভাবে কাজ করতে পারি?
বলছি বৎস, বলছি। তোমার ভ্রাতুস্পুত্র এবং ভ্রাতুস্পুত্রী কি শিশু? বনহুর নিজেকে এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞ বিবেচিত করার জন্য প্রশ্ন করলো।
রিজভী বললো–না, তারা পূর্ণবয়স্ক।
হোক, তাতে ক্ষতি নেই।
বলুন কিভাবে কার্য করা যাবে বা যেতে পারে–বলুন সন্ন্যাসী বাবাজী?
বললো বনহুর–এক কাজ করলে সবচেয়ে মঙ্গল হয়। গভীর রাতে কোনো এক জায়গায় যাওয়ার নাম করে সোজা তাদের নিয়ে যেতে হবে গহন জঙ্গলে, ঠিক যমুনার তীরে–তারপর…দু’জনাকে নিঃশেষ করে ফেলে দিবে যমুনাবক্ষে। কেউ জানবে না, কেউ বুঝবে না কোথায় গেলো ওরা। শুধু আমি চাই তাদের রক্ত…হাঃ হাঃ হাঃ অট্টহাসি হেসে উঠে বনহুর।
রিজভী সন্ন্যাসীর পায়ের ধূলো মাথায় নেয়। করজোড়ে বলে–বাবাজী আপনি যদি সহায় হন, কার্য যদি সিদ্ধি হয় তবে আমি আপনাকে শুধু রক্তই দেবো না, দেবো অজস্র অর্থ–প্রচুর ঐশ্বর্য।
হর হর শিবও শঙ্করও অর্থের কোনো প্রয়োজন নেই আমার, শুধু চাই ওদের রক্ত, রক্ত পেলেই আমার চলবে।
বলুন কি ভাবে কাজ করবো?
আজ রাতেই তোমার ভ্রাতুস্পুত্র এবং ভ্রাতুস্পুত্রীকে শহরের বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে নাও।
বাবাজী, আপনি সঙ্গে থাকবেন আমার?
হাঁ, আমি সঙ্গে থাকবো। হর হর শিব ও শঙ্কর ও শিবও শঙ্করও…
জব্রুকে নেবো?
