ব্যাকুল কণ্ঠে বললো তরুণী–বাবাজী, আমাদের এ বিপদ থেকে উদ্ধার করেন।
বসো। বসো তোমরা।
বসে পড়লো তরুণ এবং তরুণী।
বনহুর বললো–দেখি হাত। তরুণের দিকে হাত বাড়ালো সে।
হাতখানা মেলে ধরলো তরুণ বনহুরের দিকে।
বনহুর ওর হাতখানা নিজের হাতে টেনে নিয়ে দৃষ্টি বুলিয়ে বললো–বৎস, তোমাদের বিপদ আরও ঘনীভূত আমি দেখতে পাচ্ছি।
তরুণী প্রায় কেঁদে ফেললো, বললো সে–কি করে আমরা এ বিপদ থেকে উদ্ধার পাবো বলুন বাবাজী? কি করে আমরা ভাইবোন দুষ্ট কুচক্রী কাকার কবল থেকে রক্ষা পাবো বলুন?
বনহুর আন্দাজে বলছিলো সব, আসলে সে জপ-তপ আর মন্ত্র কিছু জানে না। এবার সে অনেকটা বুঝতে পারলো–এরা তাদের কাকার কবল থেকে উদ্ধার পেতে চায়। ভাগ্যিস বলে বসেনি সে– তোমাদের বিয়ে হবে, কোনো চিন্তা নেই। যাক, এবার বনহুর আঁচ করে নিয়েছে–ওরা দু’জন ভাই আর বোন। বললো বনহুর–বৎস, তোমাদের কাকার কবল থেকে বাঁচতে পারো, যদি এক কাজ করো।
বলুন বাবাজী, আমরা বাঁচতে চাই। যা বলবেন তাই করবো।
পারবে! তোমার কাকাকে আমার নিকটে আনতে পারবে?
চমকে উঠে তরুণ-তরুণী। বলে তরুণ–আমার কাকা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর মানুষ। তিনি আমাদের হত্যা করার চেষ্টায় আছেন। আজ রাতে আমাদের হত্যা করবেন।
কি করে এ কথা তোমরা জানলে?
আমার কাকা একটা লোকের সঙ্গে গোপনে আলাপ-আলোচনা করছিলেন। আমার বাবার বিষয় আসয় যাতে আমার কাকার নিজস্ব হয়, এই তার চেষ্টা।
আমি সব অবগত হয়েছি।
আমাদের বাবা-মা জীবিত নেই, এবং সেই কারণেই আমার দুষ্ট কাকা আমাদের হত্যার চেষ্টা করছেন। আমরা যদি না থাকি তাহলে আমার কাকা নিশ্চিন্ত মনে বাবার এবং কাকার উভয়ের ঐশ্বর্য একাই ভোগ করবেন।
বুঝলাম বৎস। নিশ্চিন্ত থাকো, তোমাদের কাকা পারবে না তোমাদের হত্যা করতে।
তরুণ-তরুণী বনহুরের পায়ের উপর উবু হয়ে পড়লো। বাঁচার জন্য সে কি আকুতি!
বনহুরের মন মায়ায় আদ্র হয়ে উঠলো! বললো সে–বৎস, কোনো চিন্তা করো না। ঈশ্বরের কৃপায় আমি তোমাদের রক্ষা করতে সক্ষম হবো।
পারবেন আপনি আমাদের রক্ষা করতে?
হ বৎস।
তাহলে কি উপায়ে আপনি রক্ষা করবেন বাবাজী? বললো যুবক।
যুবতীও প্রশ্নভরা ব্যাকুল দৃষ্টি নিয়ে তাকালো সন্ন্যাসীবেশী বনহুরের মুখে।
যুবক-যুবতীর দেহের পোশাক-পরিচ্ছদে বুঝতে পারলো বনহুর–ওরা সম্ভ্রান্ত ঘরের সন্তান হবে। যুবকের বয়স কুড়ির বেশি নয়। যুবতী ষোল-সতেরো হবে। সুশ্রী চেহারা উভয়ের।
বনহুর বললো–আমার আদেশ তোমরা ফিরে যাও।
শিউরে উঠলো যেন উভয়ে।
বনহুর বললো–ভয় নেই, আমিও যাবো তোমাদের সঙ্গে।
তরুণ-তরুণীর মুখ যেন খুশিতে উজ্জ্বল হলো। বললো তরুণ–বাবাজী, আপনি দয়া করে চলুন। আমাদের সঙ্গে।
বললো বনহুর–যাবো, কিন্তু গোপনে। তোমাদের বাড়ির একটি প্রাণীও যেন জানতে না পারে সন্ন্যাসী বাবাজী এসেছেন।
না, পারবে না। আসুন, আমাদের সঙ্গে চলুন।
চলো বৎস। বনহুর গাড়ির পিছন আসনে চেপে বসলো।
তরুণটি ড্রাইভিং আসনে বসলো আর তরুণী বসলো তার পাশে!
বনহুর বললো–বাড়ির পিছন দিকে দিয়ে যাবে। তোমার কাকা যেন টের না পায় তোমরা বাইরে গিয়েছিলে। আর শোন, আমি শুধু তোমাদের বাড়ির নিকটে যাবো–বাড়িতে নয়!
তাহলে আমাদের রক্ষা করবেন না? বাঁচাবেন না আমাদের কাকার কবল থেকে।
হ বৎস, তোমরা নিশ্চিন্ত থাকো। প্রতিদিনের মত আজও তোমরা নিজ বিছানায় শোবে! যেন তোমরা কিছু জানোনা।
কিন্তু… কো
নো কিন্তু নেই। আমি যেভাবে বললাম ঐভাবে কাজ করবে।
তরুণটি মোটর ষ্টার্ট দিলো। গাড়ি ছুটতে শুরু করলো।
বেশ কিছুক্ষণ চলার পর গ্র্যাণ্ড রোডের অদূরে একটা বিরাট বাড়ির পিছনে এসে গাড়ি থেমে পড়লো।
তরুণ বললো–গুরুদেব, এটাই আমাদের বাড়ি। আমার বাবা-মা মারা যাবার পর আমরা এ বাড়িতেই থাকি। আর থাকেন আমার কাকা।
বনহুর নেমে গেলো অন্ধকারে।
তরুণ গাড়ি নিয়ে চলে গেলো।
বনহুর সন্ন্যাসী বাবাজীর বেশে বাড়ির গেটে এসে দাঁড়ালো। গেটের পাশে নেমপ্লেটে নামটা পড়ে নিলো বনহুর রাজনারায়ণ। আপন মনেই উচ্চারণ করলো বনহুর– অদ্ভুত নাম-রাজনারায়ণ।
সন্ন্যাসী দেখে এগিয়ে এলো দারওয়ান, প্রণাম করে জিজ্ঞাসা করলো গুরুবাবা, কোন্ চিজ মাঙ্গতা–
বনহুর বললো–হর হর শিবও শঙ্করও– একটু থেমে বললো– রাজনারায়ণের সাক্ষাৎ কামনায় এসেছি।
আপ থোরা রহিয়ে গুরু বাবা, হাম আভি মালিক সে বাত পুছকে আতা হ্যায়।
বনহুর জোরে জোরে উচ্চারণ করলো- হর হর শিবও শঙ্করও– হর হর শিবও শঙ্করও—
অল্পক্ষণ পরে ফিরে আসে দারওয়ান আইয়ে গুরুবাবা।
গেট খুলে দিলো।
বনহুর অনুসরণ করলো দারওয়ানকে।
মস্তবড় বাড়ি।
রাজা-মহারাজার বাড়ির মতই পর পর কয়েকটা ফটক পেরিয়ে মস্তবড় হলঘর। বনহুর হলঘরে প্রবেশ করতেই দারওয়ান কুর্ণিশ জানালো– সম্মুখের আসনে বসে আছ রাজনারায়ণ।
বনহুর তাকালো রাজনারায়ণের মুখে, সঙ্গে সঙ্গে ভীষণভাবে চমকে উঠলো। কোথায় রাজনারায়ণ–এ যে গুলেশান হোটেলের মালিক মাহমুদ রিজভী! এখন তার মুখে আগলা দাড়ি-গোঁফ নেই। পায়জামা-আচকানও নেই। সম্পূর্ণ হিন্দু ড্রেস তার শরীরে।
বনহুর হকচকিয়ে গেলেও ভড়কে যাবার বান্দা সে নয়। চট করে নিজকে সামলে নিলো। গম্ভীর। কণ্ঠে উচ্চারণ করলো হর হর শিবও শঙ্করও…হর হর শিবও শঙ্কর…
