নূরী বলে–আমাকে ছেড়ে পালিয়ে যাবে না তো কোনোদিন?
না। তোমার পাশেই তো থাকবো আমি। নূরী, তুমি যোগাবে আমার মনে দুর্দমনীয় সাহস আর উৎসাহ। মনিরা যোগাবে সান্ত্বনা আর শক্তি। তুমি দেবে প্রেম-ভালবাসা উজাড় করে আর মনিরা দেবে স্নেহ-প্রীতি আর প্রেরণা। তোমাদের দু’জনার কাছেই আমি চাই আমার অতৃপ্ত হৃদয়ের অফুরন্ত খোরাক। বলো পারবে দিতে?
নূরী বনহুরের বুকে মুখ লুকিয়ে বলে উঠে–পারবো।
বনহুর ওকে প্রবল আবেগে নিবিড়ভাবে আবেষ্টন করে।
ঠিক সে মুহূর্তে পিছনে কেশে উঠে কেশব।
বনহুর নূরীকে মুক্ত করে দিয়ে ফিরে দাঁড়ায়, হেসে বলে–তুমি কখন এলে কেশব?
বললো কেশব–এই তো এখনই এলাম। সন্ধ্যা হয়ে এলো তবু তোমাদের ফিরবার নাম নেই।
বললো বনহুর–তাই বুঝি এসেছে বোনের সন্ধানে?
কেশব বললো–চলো এবার।
কেশব, তুমি যখন এসেছে তখন বসো, কথা আছে তোমার আর নূরীর সঙ্গে।
বাবাজী ব্যস্ত হবেন।
কেশব বললো–বাবাজী শহরে গেছেন, এখনও ফিরে আসেননি।
অবাক কণ্ঠে বললো বনহুর –সেই যে সকালে গেছেন এখনও ফিরে আসেননি তিনি?
না, তাছাড়া শহর তো আর নিকটে নয়। বহু দূরের পথ। এমনি বুঝি রাত হয়ে যায় তার ফিরতে! বললো বনহুর। কেশব বললো–রাত কোনোদিন হয় না, তবে সন্ধ্যা হয়।
নদীতীরে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ফিরে এলো তারা কুঠিরে।
কিন্তু কি আশ্চর্য, তখনও ফিরে আসেননি সন্ন্যাসী বাবাজী।
চিন্তিত হলো সবাই।
কেশবের চোখ অশ্রু ছলছল হলো।
নূরীর অবস্থাও তাই। সন্ন্যাসী বাবাজী তাদের পিতার মত।
রাত বেড়ে চললো।
বনহুর, কেশব আর নূরীর মুখ অন্ধকার হলো। সবাই উঠানে বসে প্রতীক্ষা করছে।
রাত যত বাড়ছে ততই সকলের মনে আশঙ্কার ছায়া ঘনীভূত হয়ে আসছে–এমন তো কোনোদিন হয় না।
কেশব আর নূরী প্রায় কেঁদেই ফেললো।
ছোট্টবেলা হতে কেশব সন্ন্যাসী বাবাজীর কাছেই মানুষ।
তাই সন্ন্যাসী বাবাজীর জন্য তার সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা।
দেখতে দেখতে রাত শেষ হয়ে এলো।
সন্ন্যাসী বাবাজী আর ফিরে এলেন না।
ভোর হতেই কেশব ধরে বসলো সে শহরে যাবে। সন্ন্যাসী বাবাজী কেন ফিরলেন না তাঁকে খুঁজে আনবে।
বনহুর বললো–এতো ব্যস্ত হলে চলবে না। তুমি বরং থাকো আমি গিয়ে তাঁর অন্বেষণ করে আসি।
আমিও যাবো তোমার সঙ্গে। বললো কেশব।
বনহুর বললো–তা হয় না। নরী একা থাকবে?
কেন, আমাকেও নিয়ে চলো না হুর! আমিও যাবো তোমার সঙ্গে।
পাগল হলে তোমরা দু’জনার কেউ নয়। দিল্লী শহর অনেক দূরে।
বনহুর সাধারণ সন্ন্যাসীর ড্রেসে সজ্জিত হয়ে নিলো। তার দেহে গেরুয়া কাপড়, ললাটে চন্দনের তিলক আর হাতে-গলায়-বাজুতে রুদ্রাক্ষের মালা, মাথায় কোকড়ানো চুল। সুন্দর সুপুরষ এক সন্ন্যাস যুবকের বেশে বনহুর কেশব আর নূরীর সম্মুখে এসে দাঁড়ালো।
নূরী দীপ্তভরা উজ্জ্বল চোখে তাকালো, বললো–শীগগির ফিরে এসো।
কেশব বললো–বাবু, তোমাকে ঠিক সন্ন্যাসী বলেই মনে হচ্ছে। যাও বাবাজীকে নিয়ে ফিরে এসো।
বনহুর চলে গেলো।
কেশব, আর নূরী রইলো এখানে। আজ ওরা নতুন নয়, এমনি কতদিন কেশব আর নূরীর কেটেছে।
শহরে পৌঁছতে বনহুরের সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো।
এতোটা পথ তাকে পায়ে হেঁটে আসতে হয়েছে। শহরে পৌঁছেও তাকে পায়ে হেঁটে পথে পথে ঘুরতে হচ্ছে।
শহরের বিজলী বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে পট পট করে। দোকান-পাট, রেষ্টুরেন্ট আলোয় আলোময় হয়ে উঠেছে সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে।
মোটরগুলোর সার্চলাইট তীব্র আলো ছড়িয়ে ছুটে যাচ্ছে এদিক থেকে সেদিকে। পিছনের লাল আলোগুলো যেন রাক্ষসের দুটো চোখের মত জ্বল জ্বল করে জ্বলছে।
বনহুর রাজপথের পাশে এসে দাঁড়ালো।
দিল্লীর ফাহারা রোড এটা। এখান থেকে কয়েক মাইল দূরে দিল্লী। রাজধানী বা আসল শহর। বনহুর এতোবড় শহরে কোথায় খুঁজবে সন্ন্যাসী বাবাজীকে। কেশব আর নূরীর জন্যই না সে বিলম্ব না করে বেরিয়ে পড়েছে। পকেট পয়সাশূন্য। ক্ষুধায় পেট চো চো করছে। অনেক পথ হাটার জন্য। দেহটাও শিথিল হয়ে এসেছে। বনহুর একটা লাইট পোষ্টে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। পকেট থেকে একটা কাপড়ের টুকরা বের করে মুখ মুছে নিলো, রুমাল নেই–এ কাপড়ের টুকরাটাই এখন রুমাল। এমন কোনো সম্বল নেই যা দিয়ে বনহুর ক্ষুধা নিবৃত্ত করে বা করতে পারে।
বিখ্যাত দস্যু সর্দার আজ সম্বলহীন।
ছ’মাস সে গহন জঙ্গলে সন্ন্যাসীর আশ্রমে বাস করে হয়ে উঠেছে ঠিক সন্ন্যাসীর মতই। সিগারেটের নেশা ছিলো যার চরম আকারে, আজ সব নেশা তার ছুটে গেছে।
বনহুর চারদিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে বিশ্রামের আশায় বসে পড়লো।
এমন সময় একটা গাড়ি এসে থামলো তার অদূরে। একটি তরুণ আর একটি তরুণী নেমে এলো। গাড়ি থেকে। বাঙালি বলেই মনে হলো বনহুরের প্রথম নজরে।
বনহুর দেখলো ওরা ঠিক তার দিকেই আসছে।
চোখ বন্ধ করে বনহুর বসে রইলো, মাঝে মাঝে মৃদু দৃষ্টি মেলে দেখছে।
হাঁ, ওরা তার দিকেই আসছে।
বনহুর বিড় বিড় করে মন্ত্রজপের মত কিছু উচ্চারণ করতে লাগলো।
যুবক আর যুবতী এসে দাঁড়ালো বনহুরের সম্মুখে। যুবক বললো–সন্ন্যাসী বাবা! সন্ন্যাসী বাবা!
চোখ মেলে তাকালো বনহুর, গম্ভীর কণ্ঠে বললো–কে ডাকে?
বললো এবার তরুণী-বাবাজী দয়া করুন। দয়া করুন আমাদের!
তরুণ বললো–আমরা বড় বিপদে পড়েছি বাবা।
বললো বনহুর–আমি জানি তোমরা কি বিপদে পড়েছ।
