নূরী অবাক হয়ে তাকালো, বনহুরের কথাগুলো ঠিক যেন বুঝে উঠতে পারছে না সে।
বললো আবার বনহুর–নিজকে কতখানি পাষাণ করে নিয়েছিলাম, তাইতো আমি পেরেছি তাকে প্রবঞ্চনা করতে। সরল-সহজ একটি মেয়েকে প্রবঞ্চনা করার মত পাপ বুঝি আর কিছু নেই। নূরী, আমি তার সঙ্গে ভালবাসার অভিনয় করে তুলে দিয়েছিলাম তাকে আর একজনের হাতে। তার সঙ্গে আমি করেছি চরম ছলনা।
কে সে মেয়ে? কি তার নাম?
অজানা অচেনা এক মেয়ে, হিন্দু বা মুসলমান সে নয়। খিষ্টান জাতি-নাম তার শ্যালন। অদ্ভুত মেয়ে ছিলো শ্যালন। নূরী, ওর মধ্যে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম তোমাকে।
হুঁ, এতোই যদি ভাল লেগেছিলো তাহলে তাকে সঙ্গী করে নিলে না কেন?
অহেতুক রাগ করছে নূরী। আমি তার ভালবাসায় অভিভূত হয়েছিলাম সত্য কিন্তু পারিনি তাকে গ্রহণ করতে। তার ভালবাসার বিনিময়ে সে পায়নি আমার কাছে কিছু। হয়তো এতোটুকু দিতে পারলে আজ আমি এতোখানি অনুতপ্ত হতে পারতাম না। নূরী, জীবনে বহু নারীই আমার সংস্পর্শে এসেছে বা আমিই গিয়ে পড়েছি তাদের সান্নিধ্যে। আমি দেখেছি তাদের আসল রূপ, কারো আচরণে বিস্মিত হয়েছি, কারো আচরণে ব্যথায় মুষড়ে পড়েছি, কারো আচরণে হয়েছি মুগ্ধ। সবাই যেন আমার কাছে কিছু চেয়েছে, কিসের আশায় যেন উন্মুখ রয়েছে ওরা। নূরী, আমি পাষাণ নই–মানুষ। নিজেকে কিভাবে যে আমি সংযত রেখেছি তুমি তা জানোনা।
হুর!
নূরী, তোমাকে ফিরে পেয়েছি–এই আমার জীবনের চরম পাওয়া। আমি ভাবতেও পারিনি তোমাকে আবার পাবো।
হুর, চলো তবে আবার আমরা আস্তানায় ফিরে যাই। কান্দাই জঙ্গলের আকাশ বাতাস আমায় ডাকছে। নাসরিন, দাইমা–ওরা সবাই যে আমার জন্য প্রতীক্ষা করছে হুর।
হাঁ, আমার মনও মাঝে মাঝে চঞ্চল হয়ে উঠে আস্তানায় ফিরে যাবার জন্য। অনেক দিন হলো আস্তানা ত্যাগ করে চলে এসেছি। না জানি সেখানের অবস্থা এখন কেমন।
হুর, সত্যিকার একটা কথা আমায় বলবে আজ?
নূরী, তোমার কাছে আমার না বলার তো কিছুই নেই।
আমার মনি কোথায় তুমি জানো?
মনি! সে এখন তার মায়ের কাছে।
মায়ের কাছে? অবাক কণ্ঠে বলে নূরী।
হ নূরী তোমার মনি তার মায়ের কাছে ভালই আছে।
তার মা! কে–কে আমার মনির মা? বললা–বলো হুর?
তুমি রাগ করবে না তো?
না। আমার মনি যার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছে তার কথা শুনে আমি রাগ করবো, কি যে বলো!
সত্যি বলছো?
হাঁ এই তোমাকে স্পর্শ করে শপথ করছি, আমি আমার মনির মায়ের পরিচয় জানতে পারলে খুশি হবো। আমি কান্দাই ফিরে গিয়ে তাকে অভিনন্দন জানাবো।
পারবে! পারবে তাকে অভিনন্দন জানাতে?
আমার মনি যার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছে সে যে আমার পরম শ্রদ্ধেয়–
নূরী–অস্কুট ধ্বনি করে বনহুর। একটু থেমে বলে সে–নূরী, মনে করো মনি তোমারই সন্তান কারণ আমি তার জন্মদাতা।
সঙ্গে সঙ্গে নূরী ছটকে সরে যায় বনহুরের কাছ থেকে। মুখমণ্ডল অমাবস্যার অন্ধকারের মত নিষ্প্রভ হয়ে যায়।
বনহুর হতভম্ভ হয়ে পড়ে।
নূরী ক্রুদ্ধ সিংহের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে থাকে। এ মুহূর্তে সে মনিকে সম্মুখে পেলে ছিঁড়ে ফেলতো যেন টুকরা টুকরা করে। পরক্ষণেই বনহুরের বুকের কাছে জামাটা এঁটে ধরে ভীষণভাবে। তারপর উন্মাদিনীর মত কিল-চড় দিতে থাকে বনহুরের বুকে –না না, এ হতে পারে না। এ হতে পারে না।
বনহুর মৃদু হাসে–কি হলো নুরী? কি অন্যায় আমি করেছি?
আমি সব সহ্য করতে পারি কিন্তু তোমার পাশে আমি অন্য নারীকে ভাবতে পারি না। অসহ্য অসহ্য– কেন, কেন তুমি বললে এ কথা? নূরী কেঁদে উঠে উচ্ছ্বসিতভাবে।
বনহুর নূরীকে টেনে নেয় কাছে, মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলে–নূরী, তুমি জানো মনিরাকে আমি বিয়ে করেছি আমাদের মুসলমান ধর্ম অনুসারে। আমার স্ত্রী সে।
মনি তা হলে—
হাঁ, সে মনিরার সন্তান, আমারও।
দাঁতে দাঁত পিষে বলে নূরী– চৌধুরী কন্যা মনিরার সন্তান মনি। না না, আমি সহ্য করতে পারবো না। আমাকে এ কথা কেন শোনালে হুর? আমাকে এ কথা কেন শোনালে–
বনহুর গম্ভীর হয়ে পড়ে, নূরীকে সজোরে সরিয়ে দিলে বলে–নূরী, অন্যায় আমি করিনি। মনিরাকে আমি বিয়ে করেছি, তার গর্ভে আমার সন্তান জন্মেছে।
উঃ আমি কেন বেঁচে রইলাম। কেন আমার মরণ হলো না। আমি জানি এক জিনিস কোনোদিন দু’জনার হয় না। বনহুরের জামাটা আবার মুঠায় চেপে ধরে নূরী–তুমি যে শুধু আমার, এটাই আমি জানি।
নূরী, আমি তো তোমারই রয়েছি।
তা হয় না। তোমার স্ত্রী-পুত্র রয়েছে। তোমাকে আমি আর ধরে রাখতে পারবো না।
নূরী, বিশ্বাস করো আমি যেমন তোমার তেমনি মনিরার।
এক হৃদয় কোনোদিন দু’জনাকে দেওয়া যায় না হুর। কেউ তা পারে না।
তুমি তো জানো নূরী, বনহুর কারো সমকক্ষ নয়। কেউ যা করে না, তাই সে করে। কেউ যা ভাবে তাই সে ভাবে। অসম্ভবকে সম্ভব করাই হলো তার নীতি। মনিরাকে ইসলাম ধর্মমতে বিয়ে করেছি, আর তোমাকে খোদা সাক্ষী রেখে। লোক সমাজের কেউ জানে না তুমি আমার কে–শুধু রহমান ছাড়া। তবু তোমরা দু’জন আমার কাছে সমান অধিকারী–নূরী, আমার উপর রাগ করোনা লক্ষীটি!
নূরী নীরবে অশ্রু মোছে।
বনহুর ওর মুখখানা তুলে ধরে হাসো। হাসো নূরী। নিজের হাত দিয়ে নূরীর চোখের পানি মুছিয়ে দেয়, ললাটে একে দেয় চুম্বন রেখা।
