এবার বুঝেছি, তাই তুমি পালিয়ে ছিলে আমার দৃষ্টির আড়ালে। কি কঠিন তুমি নূরী! পারলে ছ’মাস ধরে এমনিভাবে আত্মগোপন করে থাকতে?
হুর, জানো না কি দুর্বিসহ বেদনা নিয়ে আমি রাতের পর রাত ছটফট করেছি। সন্ন্যাসী বাবাজীর আদেশ তবু অমান্য করার সাহস পাইনি, আবার যদি তোমাকে হারাতে হয়!
হেসে উঠে বনহুর হাঃ হাঃ করে, হাসি থামিয়ে বলে–এ যুগের মানুষ তুমি ওসবে বিশ্বাস করো?
না না, ও কথা মুখে এনো না হুর। আমি যে অনেক কষ্ট করে, অনেক সাধনা করে তবেই তোমায়। ফিরে পেয়েছি। বনহুরের কণ্ঠ বেষ্টন করে ধরে নূরী–এবার তোমাকে ছাড়ছি না হুর।
আমিও তোমাকে হারাতে চাই না নূরী।
*
বনহুরের স্পর্শে নূরী ফিরে পায় তার আগের জীবন। চঞ্চলা হরিণীর মত ক্ষিপ্র হয়ে উঠে; বনে বনে ছুটোছুটি করে বেড়ায়। কেশব-আর বনহুর যখন বনে কাঠ কাটে, নূরী তখন কাঠগুলো বোঝা বাঁধে। বনহুর যখন গাছের উপর চেপে ফল পাড়ে, নূরী তখন ফলগুলো কোঁচড়ে কুড়িয়ে নিতে থাকে।
বনহুর আর কেশব নূরীকে নিয়ে আনন্দে আত্মহারা।
পাহাড়ী ঝরণার মত নূরী নাচে।
বনহুর আর কেশব মাদল বাজায়।
সন্ন্যাসী বাবাজীও দেখেন তাকিয়ে তাকিয়ে। তিনিও মুগ্ধ হয়ে যান। গোটা বনভূমি যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠে। গাছে গাছে নতুন স্পন্দন জাগে। ডালে ডালে পাখি গান গায়। ঝরণার সচ্ছ জলে রাজহংসী ডানা মেলে সাঁতার কাটে। আকাশে উড়ে বেড়ায় শুভ্র বলাকার ঝাক।
বনহুর যখন শুয়ে থাকে ঘাসের বিছানায় তখন নূরী বসে থাকে তার পাশে। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
বনহুর যখন যেখানে যায়, নূরী সর্বক্ষণ তার পাশে পাশে থাকে ছায়ার মত।
সন্ন্যাসী বাবাজীর আনন্দ আর ধরে না, তিনি এই যুবক আর যুবতীর মিলনে হৃদয়ে তৃপ্তি অনুভব করেন।
কেশবও তাই, সে সব সময় ওদের খুশি রাখার চেষ্টা করে। কেমন করে ওরা দু’জনা নিশ্চিন্ত মনে আনন্দে থাকবে, এই করতো সে।
নূরী নদীতীরে যেতো পানি আনতে; সঙ্গে যেত বনহুর। নদীবক্ষ থেকে কলসী ভরিয়ে দিতো সে। নদী তীরে দাঁড়িয়ে কলসী কাখে তুলে নিতো নূরী।
এমনি এক বৈকালে নূরী আর বনহুর নদীতীরে গেলে পানি আনতে।
এখন নদী শান্ত। বর্ষাকালের মত আজ আর তার ভয়ঙ্করী রূপ নেই। নেই সেই প্রচণ্ড দাপট আর ভয়ঙ্কর ঢেউ-এর উচ্ছলতা।
বনহুর আর নূরী নদীতীরে এসে দাঁড়ালো।
নূরী বললো–এমনি এক বৈকালে আমি তোমায় নদীতীরে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। জানিনা হুর, সেদিন কার মুখ দেখেছিলাম।
নূরী, সত্য আমি বড্ড অপেয়।
নূরী বনহরের মুখে হাতচাপা দেয়–একি কথা বলছো হুর। তুমি যে অমূল্য সম্পদ। লক্ষ লক্ষ রত্নের চেয়ে তুমি মূল্যবান–
বনহুর হেসে উঠলো–হাঃ হাঃ হাঃ।
নূরী স্থির নয়নে তাকিয়ে রইলো বনহুরের মুখের দিকে, এমন করে বনহুরকে কতদিন সে হাসতে দেখেনি।
নূরীকে অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললো বনহুর–কি দেখছো নূরী?
হুর! আরও হাসো, হাসো তুমি, তোমার হাসি আমি যে কতো দিন দেখিনি।
নূরী!
বলো হুর?
আমি যদি অপেয় না হবে, তাহলে এতোবার পানিতে ডুবে তবু বেঁচে যাই! নদীবক্ষ আমাকে তার শান্ত কোলে আশ্রয় দিতে রাজি নয়, তাই ডুবেও বেঁচে আছি নূরী।
কি যে বলো? খোদা তোমাকে রক্ষা করেছেন। তোমার মত একটা নিষ্পাপ জীবন বিনষ্ট করবেন না তিনি কখনও।
আবার বনহুর হেসে উঠলো, অট্টহাসির শব্দে নদীতীরে প্রতিধ্বনি জাগলো, তারপর হাসি থামিয়ে বললো–নিষ্পাপ! নিষ্পাপ জীবন আমার? হাঃ হাঃ হাঃ নূরী তুমি কি পাগল হয়েছো?
বনহুর!
নূরী তুমি জানোনা আমি জীবনে কত পাপ করেছি। কত ধনবানের ধন-ভাণ্ডার লুটে নিয়ে সাগরবক্ষে নিক্ষেপ করেছি। কত জীবন আমি বিনষ্ট করেছি আমার এ হাত দুখানা দিয়ে। আর তুমি। বলছো আমি নিষ্পাপ।
এ সব কি আমি জানিনা বনহুর? আমি কি আজ তোমায় নতুন দেখছি। তোমার কিছুই আমার অজানা নেই।
তবে কেন আমাকে এত উঁচুতে তুলে ধরো তোমরা। তোমাদের মুখে আমার এ সুনাম সহ্য হয় না নূরী।
হুর! অস্ফুট কণ্ঠে উচ্চারণ করলো নূরী।
বনহুর বললো–নূরী, তুমি জানো না আমি কত বড় অন্যায় কাজ করেছি। কত বড় জঘন্য কাজ আমি করেছি। মিথ্যা প্রেমের অভিনয় করে, মিথ্যা ভালোবাসা দেখিয়ে একটি নিষ্পাপ সরল মেয়েকে প্রবঞ্চনা করেছি।
এ সব কি বলছো হুর?
হাঁ, বাংলাদেশে একটি মেয়ে আমাকে ভালোবেসেছিলো। নূরী, ওর জন্যই আমি নিজেকে ফিরে পেয়েছিলাম আমার মধ্যে। ওর মধ্যে আমি পেয়েছিলাম আমার হারানো সুর। মেয়েটি আমাকে সরল বিশ্বাসে উজাড় করে দিয়েছিলো তার সব কিছু।
কথাটা শোনামাত্র নূরী ক্রুদ্ধ নাগিনীর মত ফোঁস করে উঠে–কি বললে? তুমি অস্পৃশ্য—
হাসে বনহুর।
নূরী বনহুরের জামার আস্তিন চেপে ধরে–তুমি, তুমি তার সব কিছু গ্রহণ করেছিলে? পারলে তুমি এতো নিচে নামতে? ছিঃ ছিঃ ছিঃ ন্যায়-নীতি কিছুই কি নেই তোমার?
দস্যুর আবার ন্যায়-নীতি। তাই তো বললাম, আমি নিষ্পাপ নই নূরী। শুধু তাই নয়–আমি প্রবঞ্চক।
বনহুর দেখলো, নূরীর মুখ কালো হয়ে উঠেছে। রাগতঃভাবে চলে যাচ্ছিলো সে বনহুরের কাছ থেকে। চট করে বনহুর ধরে ফেললো নূরীর হাতখানা। ওর চিবুক তুলে ধরে বললো–তুমি ভুল। বুঝছো নূরী। সবকিছুর মানে কি তুমি ব্যভিচার মনে করেছো?
নূরী অধর দংশন করছিলো।
বললো বনহুর নিষ্পাপ ছিলো ওর ভালবাসা। নুরী, আমার ভালবাসা ছিলো ছলনামাত্র। তাইতো সে দিলেও আমি গ্রহণ করতে পারিনি। আর পারিনি বলেই আজ আমি অনুতপ্ত।
