কে বললো তুমি সাধনা করোনি। যেদিন তুমি জ্ঞান লাভ করেছে বাবু সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে। তোমার যোগ সাধনা। আজ তুমি সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছে।
কেশব!
হা বাবু।
সন্ধ্যা হয়ে আসে।
আজ ফুলের মনে সেকি চঞ্চলতা, কিসের যেন এক উন্মাদনায় ফুল আত্মহারা! যেমন তার আনন্দ, তেমনি দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আর সংকোচ তাকে কুঁকড়ে ফেলেছে। লজ্জায় সে আজ সন্ন্যাসী বাবাজীর সম্মুখে আসতে পারেনি।
কেশবকে দেখে কুঠিরে প্রবেশ করেছে, তার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারেনি ফুল।
রাত বেড়ে আসছে।
সন্ন্যাসী বাবাজী চলে যান তাঁর যোগ সাধনা স্থানে। যাবার সময় বলে যান–মা ফুল, তুমি তোমার স্বামী-সেবায় আত্মনিয়োগ করবে।
সন্ন্যাসী বাবাজী চলে যান।
ফুল আরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। সমস্ত শরীরে, শিরায় শিরায় তার এক অভূতপূর্ব শিহরণ জাগে। কিসের যেন এক অনুভূতি তার বুকের মধ্যে টিপ টিপ করতে থাকে।
বনহুর কুঠিরে প্রবেশ করে।
পিছনে কেশব।
ধূপ আর চন্দনের গন্ধে কুঠিরখানা মোহিত হয়ে আছে। ওপাশে মাটির প্রদীপে ঘি-এর বাতি জ্বলছে। ফুলে ফুলে সমস্ত কুঠির ছেয়ে আছে যেন। মেঝের এক পাশে খেজুর পাতার চাটাইখানায় ফুলের শয্যা পাতা।
কুঠিরে প্রবেশ করে বলে বনহুর–এ সব কি হয়েছে?
হাসে কেশব।
বনহুর শয্যায় এসে বসে বলে কেশব, আজ কি আমার ফুলশয্যা?
বলে কেশব মনে করো তাই
কিন্তু কনে কই?
সন্ন্যাসী বাবাজীর তপস্যায় কনেও আসবে। কথাটা বলে বেরিয়ে যায় কেশব।
বনহুর শয্যায় শুয়ে পড়ে।
কেশব এসে দাঁড়ায় ফুলের কাছে–ফুল, যাও ও তোমার প্রতীক্ষা করছে।
ফুল নত করে মাথা।
কেশব চলে যায় নিজের শয়ন স্থানে।
ফুল তেমনি দাঁড়িয়ে থাকে তার নিজের কুঠিরের মেঝেতে। একটি পা সে আজ নড়াতে পারছে না। কে যেন শিকল দিয়ে তার পা দু’খানা বেঁধে ফেলেছে। কই, ফুলের তো এমন লজ্জা ছিলো না। কোনোদিন আজ এমন হচ্ছে! বুকের মধ্যে কেন এমন আলোড়ন জাগছে।
রাত ক্রমেই গম্ভীর হয়ে আসছে।
ফুল নিশ্চল পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে।
বনহুর তার কুঠিরে শুয়ে ভাবছে কত কথা। আজ ফুল ছড়ানো বিছানায় শুয়ে, ধূপ আর চন্দনের গন্ধে বার বার কেন যেন মনে পড়ছে একজনের কথা–সে হলো নূরী। এমনি এক রাতে গহন জঙ্গলে, হিংস্র জীবজন্তুর গহ্বরে শয়ন করে পাশে পেয়েছিলো সে নূরীকে। তার ছোটবেলার সাথী, সঙ্গিনী, সহচরী নূরী।
আজ কেন বার বার ওর মুখখানাই ভাসছে বনহুরের চোখের সম্মুখে। সেই চঞ্চল বনবালা। পাহাড়ে পাহাড়ে বনে বাদাড়ে ঝরণার ধারে ধারে সেই চঞ্চল চরণের নুপুর ধ্বনি। বনহুর আনমনা হয়ে যায়, বেদনায় ভরে উঠে তার মন–আর কোনোদিন সে ফিরে আসবে না। একটা দীর্ঘশ্বাস তার বুক চিরে বেরিয়ে আসে। পাশ ফিরে শুয়ে চোখ বন্ধ করে।
ওদিকে প্রদীপটা প্রায় নিভু নিভু হয়ে এসেছে।
ঘুমিয়ে পড়েছে বনহুর।
আজ পূর্ণিমা।
জ্যোছনা প্লাবিত আকাশ।
সমস্ত বনভুমি ঝলমল করছে জ্যোছনার আলোতে।
রাতজাগা পাখি গাছে গাছে পাখা ঝাপটায়।
বনহুরের দরজা খুলে যায়।
কক্ষে প্রবেশ করে ফুল।
মন্থর গতিতে এগিয়ে যায় বনহুরের বিছানার পাশে।
চিত্রার্পিতের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকে, নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে থাকে বনহুরের ঘুমন্ত সুন্দর মুখমণ্ডলের দিকে। চোখের পাতা যেন পড়তে চায় না। ফুল হারিয়ে ফেলে আপন সত্তা। বসে পড়ে সে বনহুরের শয্যার পাশে। হাত রাখে ফুল বনহুরের ললাটে।
বনহুর হয়তো তখন কোনো এক সুন্দর মধুময় স্বপ্ন দেখছিলো। ফুলের স্পর্শে নিদ্রা টুটে যায়, আচমকা জেগে উঠে বসে বনহুর।
খপ করে ধরে ফেলে ওর হাতখানা। বলে উঠে–কে তুমি? কেশব! কনে সাজার এতো সখ তোমার?
ফুল মাথাটা নত করেছিলো।
বনহুর মুখের নিচে হাত দিয়ে এক ঝটকায় সোজা করে দেয়।
প্রদীপের আলো ফুলের মুখে পড়তেই অস্কুট ধ্বনি করে উঠে বনহুর–নূরী!
ফুল স্থির হয়ে বসে থাকে।
বনহুরের দু’চোখে রাজ্যের বিস্ময়, অবাক হয়ে বলে সে–একি স্বপ্ন দেখছি!
নূরী এবার কথা বলে–হুর, স্বপ্ন নয়।
তুমি বেঁচে আছো নূরী, এ যে আমার কল্পনার অতীত!
বনহুর প্রবল আবেগে নূরীকে নিবিড়ভাবে চেপে ধরে বুকে। ব্যাকুল কণ্ঠে বলে আবার–নূরী, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না সত্যি তুমি আমার সেই নূরী কিনা, না তুমি কোনো মায়াবিনী?
নূরীর দু’চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে ফোঁটা ফোঁটা আনন্দ অশ্রু, কোনো কথা সে বলতে পারে না। সমস্ত ভাষা যেন তার হারিয়ে গেছে আনন্দের আতিশয্যে।
বনহুরের বুকে মুখ লুকিয়ে শান্ত স্থির কণ্ঠে ডাকে –হুর! আমার বনহুর!
নূরী, বলো–তুমি সত্য না মিথ্যা?
আমি সত্যই তোমার সেই নূরী–
বনহুর নূরীর দেহটা বলিষ্ঠ বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলে। ললাটে গণ্ডে চিবুকে অসংখ্য চুম্বন করে চলে। বনহুর যেন উন্মাদ হয়ে উঠেছে। তার হারানো রত্ন যেন ফিরে পেয়েছে সে।
নূরী ওকে বাধা দেয় না কোনো।
মাটির প্রদীপটা নিভে যায়।
বেড়ার ফাঁকে জ্যোছনার আলো লুটিয়ে পড়ে কুঠিরের মেঝেতে।
বনহুরের বাহু বন্ধনে নূরী।
খেজুর পাতার চাটাই-এর উপরে ছড়িয়ে আছে ফুলগুলো, জ্যোছনার আলোতে হাসছে যেন ওরা।
বনহুর ডাকে–নূরী!
বনহুরের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে নূরী। বনহুরের হাতখানা তার হাতের মুঠায়, বলে–উ।
আমার সঙ্গে এতো ছলনা করলে কেন?
ছলনা নয় হুর, তোমাকে পাওয়ার সাধনা। সন্ন্যাসী বাবাজী যখন বললেন ওকে বাঁচানোর একমাত্র ঔষধ আছে আমার কাছে, সেই ঔষধ খেলে ও বাঁচবে কিন্তু ছ’মাস কোনো নারীমুখ দর্শন করা চলবে না। পারবে তুমি ওর কাছ থেকে দূরে সরে থাকতে?
