দৈনন্দিনের মত আজও রাখছিলো।
বনহুর এখনও ফিরে আসেনি, সন্ন্যাসী বাবাজীর সঙ্গে সে গেছে নদীতীরে।
ফুল এই অবসরে খাবার গুছিয়ে রেখে সরে পড়বে।
কেশব দেখলো, ফুল খাবার সাজিয়ে একটা ছোট্ট মাটির বাটি থেকে কিছু তরল সবুজ পদার্থ ঢেলে দিলো বাবুর খাবারের থালায়।
সঙ্গে সঙ্গে কেশব চেপে ধরলো ফুলের হাত।
চমকে উঠলো ফুল।
কেশব বললো–একি করছো ফুল? বাবুর খাবারে তুমি একি মেশাচ্ছো?
ফুল নিশ্চুপ হয়ে পড়ে।
কেশব ফুলের হাত থেকে মাটির বাটিটা হাতে নেয়। লক্ষ্য করেই বলে উঠে ফুল, তোমার উদ্দেশ্য আমি জানতে পেরেছি। তুমি চুরি করে সন্ন্যাসী বাবাজীর নেশার ঔষধ বাবুর খাবারে মেশাচ্ছো?
অস্ফুট শব্দ করে ফুল–কেশব ভাই!
এ তুমি কি করছো ফুল?
আমাকে তুমি তিরস্কার করো!
ফুল, আমি সব শুনেছি বাবুর মুখে। তুমি তার খাবারে নেশার ঔষধ মিশিয়ে তাকে সংজ্ঞাহীন করে ফেলো। তারপর তার পাশে যাও। জানো এর পরিণতি কি হবে?
কেশব ভাই, আমি যে ওর পাশে না গিয়ে পারি না। আমার মন যে অস্থির হয়ে পড়ে।
তাই তুমি ওর খাবারে—
হাঁ, সত্যি আমি তার খাবারে রোজ বাবাজীর—
বুঝেছি। কিন্তু যদি জানতে পারেন সন্ন্যাসী বাবাজী তখন কি হবে!
ওর কাছে না গেলে আমি বাঁচবো না কেশব ভাই। এতো কাছে থেকেও ওর পাশে যেতে পারবো না?
তা হবে না। যা করেছে এতোদিন তাই গোপন রাখতে চেষ্টা করো। নইলে আমি সন্ন্যাসী বাবাজীকে বলে দেবো।
তোমার পায়ে পড়ি কেশব ভাই। আমার দুঃখ তুমি বোঝ, জানো আমি কত বড় হতভাগী! আমাকে তুমি বাঁচাও–
এমন সময় দূরে শোনা যায় সন্ন্যাসী বাবাজী আর বনহুরের গলার আওয়াজ।
ফুল চলে যায় নিজের ঘরে।
কেশব বেরিয়ে আসে বাইরে।
*
একদিন কাঠ সংগ্রহে গিয়েছিলো বনহুর একা।
কেশব সেদিন আশ্রমের কোনো কাজে আটকা পড়ে গিয়েছিলো। সন্ন্যাসী বাবাজীও গিয়েছিলেন আশ্রমের বাইরে।
বনহুর শরীর অসুস্থ বোধ করায় আজ সকাল সকাল ফিরে এলো কুঠিরে।
ফুল তখন উঠানে ওদিক মুখ করে মালা গাঁথছিলো।
বনহুর উঠানে পা দিতেই ফুল চমকে উঠে ফিরে না তাকিয়েই ছুটে পালিয়ে যায় কুঠিরের মধ্যে।
বনহুর কাঠের বোঝাটা কাঁধ থেকে ফেলে দিয়ে অবাক হয়ে তাকালো।
ফুল কুঠিরে প্রবেশ করে দরজা খিল বন্ধ করে দিলো।
বনহুর ছুটে গিয়ে দাঁড়ালো দরজার সামনে, মৃদু ধাক্কা দিলো।
কিন্তু ফুল দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
পর পর আঘাত করতে লাগলো বনহুর দরজায়। ওদিকে ফুল বিপদে পড়লো। সে দ্রুত খিড়কি জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেলো, যেখানে কেশব কাজ করছিলো। বললো ফুল–কেশব ভাই, সব ফাঁস হয়ে গেছে, আমাকে সে দেখে ফেলেছে–হঠাৎ অসময়ে এসে গেছে হুর।
তা আমি এখন কি করবো?
শোন,আমি যা বলি তাই করো, আমাকে এ বিপদ থেকে বাঁচাও কেশব ভাই। এই নাও আমার কাপড় এনেছি, এটা পরে মেয়েমানুষ সেজে নাও।
তারপর?
তারপর আমার কুঠিরের খিড়কি জানালা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে দরজা খুলে দেবে।
কেশব বিস্ময়ে হতবাক হয়, বলে সে–এসব কি বলছো ফুল, আমি সাজবো মেয়েমানুষ?
কেশব ভাই, এ ছাড়া উপায় নেই। আমার বনহুর দাঁড়িয়ে আছে, ব্যাকুল আগ্রহে সে বারবার দরজায় আঘাত করছে। যাও, যাও কেশব ভাই, তুমি তার মনের সন্দেহ দূর করো, সে যেন বুঝতে না পারে–এ আশ্রমে কোনো নারী আছে।
বেশ যাচ্ছি।
যাও কেশব ভাই।
কেশব চলে যায়।
দরজায় দাঁড়িয়ে বনহুর ডাকে–দরজা খোল, কে তুমি–আমি দেখতে চাই। দরজা খোল।
দরজা খুলে গেলো।
কক্ষে প্রবেশ করলো বনহুর। দেখলো সে, একপাশে জড়ো সড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি নারীমূর্তি।
বনহুর বললো কে তুমি?
তবু নিরুত্তর।
বনহুরের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলো, সে খপ করে ধরে ফেললো, তারপর মাথার কাপড় সরিয়ে ফেলতেই বিষ্ময়ে অস্কুট ধ্বনি করে উঠলো–কেশব!
হেসে উঠলো কেশব, বললো–মা করো বাবু।
একি তামাসা?
বাবু।
তুমিই তা হলে এতোদিন আমাকে ধোকা দিয়ে এসেছো কেশব?
হ।
তোমার উদ্দেশ্য কি?
আমার সখ।
বনহুর বেরিয়ে গেলো কুঠিরের মধ্য হতে।
*
অত্যন্ত সাবধানে নিজেকে বনহুরের অগোচরে লুকিয়ে রাখলো ফুল। যতক্ষণ বনহুর উঠানে থাকতো ততক্ষণ ফুল তার কুঠিরের মধ্যে লুকিয়ে থাকতো। বনহুর বেরিয়ে গেলে তবে বের হতো সে।
চঞ্চলা ফুল কত কষ্ট করে যে নিজেকে শক্ত করে রেখেছিলো, সেই জানে। বনহুর চলে যেতো, ফুল তার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে অঝোরে অশ্রু বিসর্জন করতো।
হয়তো কোনোদিন পিছন থেকে সন্ন্যাসী বাবাজী এসে কাঁধে হাত রাখতেন।
চমকে উঠতো ফুল। তাড়াতাড়ি আঁচলে অশ্রু মুছে ফেলতো।
সন্ন্যাসী বাবাজী বলতেন–পাগলী মেয়ে, ছিঃ কাঁদতে আছে! এই তো তোর সাধনা শেষ হয়ে এলো বলে।
ফুল নিশ্চুপ হয়ে শুনতো।
এমনি করে একদিন শেষ হলো ফুলের সংযম সাধনা।
ছ’মাস পূর্ণ হলো।
কেশব একরাশ বন্য ফুল নিয়ে হাজির।
বনহুর বললো –এসব কি হবে?
বলল কেশব–আজ যে নবরাত্রি।
নবরাত্রি মানে? প্রশ্ন করলো বনহুর।
মানে নতুন রাত, বলে হাসে কেশব।
কেশব বনহুরের কুঠিরখানা আজ ফুলে ফুলে সাজিয়ে দিলো। বাঁশের খুঁটিগুলোতে জড়িয়ে দিলো ফুলের মালা। ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে দিলো রাশিকৃত ফুল। নতুন খেজুর পাতার চাটাইখানায় ফুল দিয়ে শয্যা তৈরি করলো।
হাসে বনহুর, বলে সে–এসব কি পাগলামি হচ্ছে তোমার কেশব?
আজ তোমার সাধনা শেষ হয়েছে বাবু।
কই, আমি তো কোনো সাধনা করিনি?
