এমনি আরও কতদিন ফুল এলো বনহুরের কুঠিরে।
বনহুর ঘুমাতো, ফুল অপলক নয়নে তাকিয়ে তাকিয়ে প্রাণভরে দেখতো।
একদিন ফুল বনহুরের মাথায় হাত রাখলো আস্তে করে। চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।
অমনি বনহুর জেগে উঠলো–কে?
সঙ্গে সঙ্গে ফুল ছুটে পালিয়ে গেলো কুঠিরের মধ্য হতে।
অবাক বিস্ময়ে বনহুর তাকিয়ে আছে দরজার দিকে–ছায়ার মত অস্পষ্ট একটা নারীমূর্তি যেন সে দেখতে পেলো। বনহুর ভাবে, আরও কতদিন অন্ধকারে সে যেন তার কুঠিরে কারো অস্তিত্ব অনুভব করেছে। তার শিয়রে কারো দীর্ঘশ্বাস উপলব্ধি করেছে কে কে তবে সে? কোনো অশরীরী আত্মা? লুসীর আত্মা কি তবে তার পিছু নিয়েছে? হয়তো তাই হবে, কিংবা তার মনের খেয়াল। নইলে সন্ন্যাসীর আশ্রমে নারীমূর্তি আসবে কোথা হতে। বনহুর চাদর গায়ে দিয়ে ভাল হয়ে শোয়। মন থেকে মুছে ফেলতে চেষ্টা করে সব চিন্তা। কিন্তু কি করে সে বিস্মৃত হবে, এ যে স্বপ্ন নয়–সত্য। এখনও তার মাথায় কারো যেন কোমল হস্তের স্পর্শ লেগে রয়েছে। এখনও তার কানে একটা নিশ্বাসের শব্দ যেন ভেসে আসছে।
তারপর এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে বনহুর।
এমনি করে কতদিন ফুল লুকিয়ে থাকবে, অসহ্য যন্ত্রণার ছট ফট করে সে। বনহুরকে দূর থেকে যত দেখে ততই যেন অস্থির বোধ হয় তার মনে। কেঁদে কেঁদে ফুলের চোখ দুটো ফুলে গেছে, লাল হয়ে উঠেছে–তবু সে সহ্য করে থাকে।
সন্ন্যাসী বাবাজী সব বোঝেন, নীরবে তিনি সান্ত্বনা দেন। বলেন–এই তো আর কটা মাস, তাহলেই তোমাদের মিলন শুভ হবে মা, শুভ হবে। আমাদের সন্ন্যাসী ধর্মের রীতি অনুযায়ী তোমাকে মানতেই হবে আমার আদেশ।
মাথা নত করে ফুল মেনে নেয় সন্ন্যাসী বাবাজীর কথা।
কিন্তু বনহুর বেশ চঞ্চল হয়ে উঠেছে, তার মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে আজকাল। কার যেন অস্তিত্ব তাকে আকর্ষণ করে। কার নিশ্বাসের শব্দ যেন তার চারপাশে শুনতে পায়। কার যেন পদধ্বনি বাজে তার কানে। কার এক অস্পশীয় ম্লান ছায়া যেন ভাসে তার চোখের সামনে।
বনহুর আর কেশব একদিন বসে ফল সংগ্রহ করছিলো! এক সময় তারা বিশ্রামের আশায় একটি বৃক্ষতলে এসে বসে ফুল ভক্ষণ করছিলো।
বনহুর বৃক্ষটায় ঠেশ দিয়ে একটা ফল হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলো দৃষ্টি তার উদাস–কি যেন গভীরভাবে চিন্তা করছে সে।
বললো কেশব–খেয়ে নাও।
কেশবের কথা কানে না নিয়ে বললো বনহুর-কেশব!
বলো?
একটা কথা সত্যি করে বলবে?
একটা কেন, যা জিজ্ঞাসা করবে সব বলবো।
আচ্ছা কেশব, তোমাদের আস্তানায় কি কোনো অশরীরী আত্মা আছে?
অশরীরী আত্মা? অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো কেশব।
হাঁ, আমি দেখেছি একটা শুভ্রবসনা নারীমূর্তি।
আমাদের আশ্রমে নারীমূর্তি, বলো কি বাবু?
কেশব বনহুরকে মাঝে মাঝে বাবু বলে ডাকতো।
বললো বনহুর–কেশব, আমি যখন ঘুমাই তখন আমার শিয়রে যেন কেউ বসে থাকে। অন্ধকারে কেউ যেন আমার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। আমি স্পষ্ট অনুভব করি কারো শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ।
কেশব বলো–কে সে? কে সে শুভ্র বসনা নারীমূর্তি।
কেশবের চোখেমুখে বিষ্ময় জাগে, ভাবে তবে কি ফুল সন্ন্যাসীর আদেশ অমান্য করে বাবুর কুঠিরে যায়! তবে কি ফুল অন্ধকারে ওর চুলে হাত বুলিয়ে দেয়! নিশ্চয়ই সে যায়।
কি ভাবছো কেশব?
কিছু না। হ্যাঁ, ভাবছি কে সে শুভ্র বসনা নারীমূর্তি। যে প্রতিদিন তোমার কুঠিরে প্রবেশ করে।
কেশব, আমি ভাবি আজ জেগে থাকবো, দেখবো সে কে। কিন্তু পারি না, কেন যেন নিজেকে কিছুতেই জাগিয়ে রাখতে পারি না। কেমন যেন সংজ্ঞাহারার মত হয়ে পড়ি আমি রাত্রিবেলায়।
কেশবের চোখদুটো ছানাবড়া হয়, কোনো কথা বের হয় না তার মুখ দিয়ে। হাতের অর্ধ-খাওয়া ফলটা তেমনি রয়ে যায় কেশবের হাতে।
বনহুর বলে–আমি সন্ন্যাসী বাবাজীকে জিজ্ঞাসা করবো একথা।
অমনি সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ায় কেশব না না, ওকথা সন্ন্যাসী বাবাজীকে বলবে না। তাকে বললে মন্দ হবে।
তবে কি আমি—
আমি নিজে সন্ধান নেবো আমাদের আশ্রমে কোনো অশরীরী আত্মার আবির্ভাব ঘটেছে কিনা।
বনহুর বলে উঠে কেশব, আমার মনে হয় শুভ্র বসনা নারীমূর্তি অশরীরী আত্মা।
কেমন করে জানলে বাবু?
আমি জানি, ও আত্মা কার।
কার বাবু?
জানো কেশব, একটা মেয়েকে বাঁচবার জন্যই আমি নদীগর্ভে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু তাকে বাঁচাতে পারিনি। নদী বক্ষের প্রচণ্ড তরঙ্গ তাকে আমার কাছ হতে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে গিয়েছিলো, কোথায় তলিয়ে গিয়েছিলো সে কে জানে। নিশ্চয়ই তার মৃত্যু ঘটেছে। আমার মনে হয়, সেই অসহায় নারীর আত্মাই রাত্রির অন্ধকারে আমার চারপাশে বিচরণ করে ফেরে!
কেশব ঢোক গিলে বললো হয়তো তাই হবে।
*
সন্ধ্যার অন্ধকারে পা টিপে টিপে কেশব প্রবেশ করলো রান্নার চালা ঘরটায়। এক পাশে মাটির প্রদীপ জ্বলছে। ফুল রান্না শেষ করে সকলের জন্য থালায় খাবার সাজিয়ে রাখছিলো।
পিছনে এসে দাঁড়ালো কেশব।
ফুলের চুলগুলো পিঠে এলিয়ে পড়েছে। সাদা ধপধপে শাড়ি তার দেহে। ললাটে চন্দনের ফোঁটা। হাতে-গলায় ফুলের মালা জড়ানো।
প্রত্যেকটা থালায় সুন্দর করে খাবার সাজাচ্ছিলো ফুল।
সন্ন্যাসী বাবাজীর থালাটা ভিন্ন।
বনহুরের থালা ভিন্ন।
কেশব আর ফুলেরও তেমনি ভিন্ন ভিন্ন থালায় খাবার সাজিয়ে রাখছিলো! প্রতিদিন এমনি করেই খাবার সাজিয়ে রাখে সে।
