কেশব আর বনহুর ফিরে আসার পূর্বেই কুঠিরের সব কাজ সমাধা করে আড়ালে লুকিয়ে পড়ে ফুল। সন্ন্যাসী বাবাজী মানা করে দিয়েছেন বনহুরকে কোনো সময় ভুল করেও যেন সে দক্ষিণ দিকের কুঠিরে প্রবেশ না করে।
বনহুর জীবনরক্ষাকারীর আদেশ অমান্য করতে চায় না। মনে নানা প্রশ্নের উদয় হলেও সে নিজেকে কঠিনভাবে সংযত করে রাখে।
বনহুর ফুলের অস্তিত্ব টের না পেলেও ফুল কুঠিরের বেড়ার ফাঁকে চোখ রেখে দেখে বনহুরকে। দেখে প্রাণ ভরে–কত দিন ওকে দেখেনি সে।
বনহুরের সেই হাসি, সেই কথার সুন্দর ভঙ্গী, সেই অপূর্ব মনোমুগ্ধকর আঁখি দুটি ফুল অপলক চোখে দেখে। ছুটে এসে ওর প্রশস্ত বুকে মাথা রাখতে ইচ্ছা করে–কিন্তু উপায় নেই। কার যেন কঠিন আদেশে মনকে স্থির করে নেয় ফুল। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে।
কেশব বনহুরের সঙ্গী-সাথী-বন্ধু–গহন বনে নিসঙ্গ অবস্থায় কেশব ছাড়া তার কোনো উপায় নেই। কেশব অবশ্য বনহুরের চেয়ে বয়সে কিছু ছোটই হবে। তবু বনহুর আর কেশবের মধ্যে অত্যন্ত মিল।
বনহুর শুয়ে থাকে, কেশব বসে থাকে তার পাশে।
বনহুর বলে –কেশব!
বলো বন্ধু! কেশব বনহুরকে বন্ধু বলে ডাকে।
বনহুর বলে–কেশব, কেমন করে আমাকে পেয়েছিলে ভাই?
নদীতীরে জল আনতে গিয়ে।
কই, তুমি তো কোনোদিন নদী থেকে জল আনো না?
তখন আনতাম।
তুমিই তাহলে আমাকে দেখেছিলে?
না–হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি –আমিই তোমাকে দেখেছিলাম। কিন্তু বাবাজী না হলে তোমাকে আমরা কেউ বাঁচাতে পারতাম না।
আচ্ছা কেশব?
বলো?
এ বনে কি শুধু তোমরা দু’জনাই বাস করো?
এ প্রশ্ন কেন বলো তো?
না এমনি করলাম।
আর একদিন।
নদীতীরে এসে দাঁড়ায় বনহুর আর কেশব। শুকনো কাঠ সংগ্রহ করছিলো ওরা দু’জনা। হঠাৎ কেশব বলে উঠে–বন্ধু, দেখ ঐ খানে তোমাকে ফুল প্রথম দেখেছিলো– না না, ফুল নয় আমি– আমি তোমায় প্রথম দেখেছিলাম।
ফুল!
কেশব কথাটার মোড় ঘোরালেও বনহুর ধরে ফেলেছিলো। বললো ফুল কে কেশব?
বললাম তো আমার আর এক নাম ফুল।
ওঃ তাই বলো।
চলো বন্ধু কাঠ সংগ্রহ হয়ে গেছে চলো।
বনহুর ছোট্ট কাঠের বোঝাটা কেশবের মাথায় তুলে দিয়ে নিজের মাথায় মস্ত বড় বোঝাটা উঠিয়ে নেয়। দস্যু সর্দার বনহুর আজ বনে বনে কাঠ সংগ্রহ করে ফেরে। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে ফুল আর হাসে।
বনহুর যখন খেতে বসে অবাক হয়ে ভাবে, তাদের খাবারগুলো রোজ এত সুন্দর করে কে পাক করে! সন্ন্যাসী বাবাজীতে সর্বক্ষণ তার জপ তপ আর সাধনা নিয়ে থাকেন। কেশব তো তারই সঙ্গে কিন্তু এতো সব রান্না করে কে?
বনহুর বলে খেতে খেতে কেশব, কে এমন সুন্দর করে আমাদের জন্য রোজ রান্না করে, খাবারগুলো পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখে ভাই?
কেন ফুল–না না, সন্ন্যাসী বাবাজী নিজেই তো রোজ রান্না করেন। তুমি জানো না বন্ধু, বাবাজী কত সুন্দর পাকান!
কেশব বললেও বনহুরের যেন বিশ্বাস হয় না তার কথা। ফুল–কে সেই ফুল! কার নাম ফুল, তবে কি কেশবের আর এক নাম ফুল। হয়তো হবে সন্ন্যাসীদের বাবার নাম!
বনহুর খেয়ে-দেয়ে শোয়।
বনহুরের জন্য পূর্বদিকের কুঠিরখানা ছেড়ে দিয়েছে কেশব। ওটা আগে কেশবের কুঠির ছিলো। এখন সন্ন্যাসী বাবাজী আর কেশব শোয় পশ্চিমের কুঠিরে! পাশাপাশি তিনখানা কুঠির ছিলো সন্ন্যাস বাবাজীর। তালপাতার আর খেজুর পাতার ছাউনি করা এসব কুঠির সন্ন্যাসী বাবাজী আর কেশব নিজের হাতে তৈরি করেছে।
ফুলের জন্য আলাদা কুঠির।
সন্ন্যাসী বাবাজী রাতের বেলা ঘুমান না, তিনি গহন বনের মধ্যে অশ্বথ বৃক্ষতলে অগ্নিকুরে সম্মুখে বসে যোগ সাধনা করেন। কাজেই তার কুঠিরের এমন কোনো প্রয়োজন হয় না।
বনহুর নিজের কুঠিরে শয়ন করে।
খেজুর পাতার চাটাই এর উপর বালিশবিহীন তাকে শুতে হয়। শুধু তাকেই নয় সন্ন্যাসী বাবাজীর এখানে সকলের জন্য একই ব্যবস্থা।
ফুল নিজের জন্য ভাবে না, ভাবে না সন্ন্যাসী বাবাজী বা কেশবের জন্য, কারণ এদের অভ্যাস আছে এ সবে। ফুল ভাবে বনহুরের কথা। না জানি বালিশবিহীন শয়ন করতে ওর কত কষ্ট হচ্ছে।
বনহুর দস্যু ছোটবেলা হতেই সে মানুষ হয়েছে কঠিনভাবে। নানারকম কষ্ট সহ্য করাই হলো তার রীতি। বালিশবিহীন কেন, কতদিন সে শুধু পাথরের উপরে শুয়ে নিদ্রা গেছে। কত বন-জঙ্গলে কেটেছে তার রাত। তবু ফুল ওর জন্য ভাবে কত কথা।
*
একদিন বনহুর নিদ্রা গেছে তার কুঠিরের মেঝেতে।
হাতের উপর মাথা রেখে শয়ন করেছে সে। এখানে আসার পর বনহুর অনেকটা নিশ্চিন্ত ঘুমাতে পারে। তাকে রাত জেগে গোয়েন্দাগিরি করতে হয় না। দুষ্ট দমনে সজাগ হয়ে থাকতে হয় না। লুসীকে উদ্ধারের জন্য নেই আর তার দুশ্চিন্তা। লুসী তার বিদগ্ধ জীবন নিয়ে সলিল সমাধির বুকে চিরনিদ্রায় ঢলে পড়েছে। বনহুর এখন নিশ্চিন্ত। প্রাণভরে ঘুমায় সে আজকাল।
প্রতিদিনের মত আজও বনহুর ঘুমিয়ে আছে তার খেজুর পাতার চাটাই-এর উপর। হাতের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে সে।
সন্তর্পণে কুঠিরের দরজা খুলে প্রবেশ করলো ফুল।
ওদিকে মাটির প্রদীপটা নিভু নিভু ভাবে জ্বলছে।
প্রদীপের ক্ষীণালোকে ফুল তাকালো কক্ষমধ্যে। অদূরে মেঝেতে খেজুর পাতার চাটাই-এর উপর নিদ্রিত বনহুর।
ফুল লঘু পদক্ষেপে বনহুরের শিয়রে এসে বসলো। নির্নিমেষ নয়নে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো সে ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে। ফুল অতি কষ্টে নিজেকে সংযত রাখলো। মনে পড়লো সন্ন্যাসী বাবাজীর সাবধান বাণীর কথা। যেমন এসেছিলো ফুল তেমনি ধীর পদক্ষেপে বেরিয়ে গেলো সে।
