ফুল বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠে–কিন্তু আমি যে ওকে না দেখে থাকতে পারছি না বাবাজী?
নিজেকে পাষাণ করে নাও ফুল–তুমি সন্ন্যাসী কন্যা।
বাবাজী!
ফুল, ওর যাতে অমঙ্গল না হয় সেজন্য তোমাকে কঠিন সাধনা করতে হবে।
আমি তাই করবো বাবাজী। আপনি আমাকে আশীর্বাদ করুন, আমি যেন নিজেকে পাষাণ করে নিতে পারি।
যাও মা, আজ থেকে তুমি এ কুঠিরের আশে পাশে আসবে না। কারণ নিজেকে স্থির রাখতে পারবে না তুমি।
তাই হবে, আর আমি এখানে আসবো না বাবাজী।
ফুল চলে যায়। তখনও তার কানে ভেসে আসে অস্ফুট কণ্ঠ বনহুরের –মা, মাগো, উঃ–উঃ–
সন্ন্যাসী বাবাজী কক্ষে প্রবেশ করলেন, শান্ত-সৌম্য জ্যোতির্ময় দেবপুরুষ। শিয়রে এসে বসলেন বনহুরের, হাত রাখলেন তার মাথায়, ডাকলেন–বৎস?
বনহুর চোখ মেলে তাকালো, সন্ন্যাসী বাবাজীর মুখে নজর পড়তেই বললো–বাবা!
এখন কেমন বোধ করছো?
ভাল নয়।
খুব কি অসুস্থ বোধ করছো?
না, কিন্তু মন বড় অস্থির হয়ে পড়েছে। আমাকে উঠবার আদেশ দিন বাবা?
আর একটা দিন তোমাকে এভাবে শুয়ে থাকতে হবে।
বনহুর হতাশভাবে চোখ বন্ধ করলো।
সন্ন্যাসী বাবাজী উঠে গেলেন তখনকার মত।
তিন দিন পর বনহুর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলো। আবার তার দেহে পূর্বের সেই অসামান্য শক্তি ফিরে এলো। সন্ন্যাসী বাবাজীর স্নেহে আর কেশবের গভীর ভালবাসায় বনহুর মুগ্ধ হলো। ফলমূল আর নিরামিষ ভক্ষণ করতে লাগলো বনহুর সন্ন্যাসী বাবাজী আর কেশবের সঙ্গে।
*
বনহুর সুস্থ হয়ে উঠার পর একদিন সন্ন্যাসী বাবাজীর নিকটে এসে বললো–বাবাজী?
সন্ন্যাসী বাবাজী একটি হরিণ-শিশুকে আদর করছিলেন, বললেন তিনি–বলো বৎস?
এখন তো আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছি, এবার আমাকে বিদায় দিন।
আমি জানতাম তুমি এ কথাই আমাকে বলবে, কিন্তু তোমাকে যখন আমি কুড়িয়ে পেয়েছি তখন তুমি আমার সন্তানসম। তোমার ভাল-মন্দ এখন আমার। কাজেই তোমাকে এখানে ছ’মাস থাকতে হবে। তারপর যেখানে খুসি চলে যেও, আমি বাধা দেবো না।
সন্ন্যাসী বাবাজীর কথায় আঁতকে উঠে যেন বনহুর। তার মত উচ্ছল জনের একস্থানে স্থির হয়ে থাকা একেবারে অসম্ভব। এ কদিনেই বনহুর হাঁপিয়ে পড়েছে যেন। এরপরও ছ’মাস তাকে এ বনে নির্জীবের মত কাটাতে হবে–না না, পারবে না সে এক যায়গায় স্থির হয়ে থাকতে। বললো বনহুর আমাকে আপনি গভীর স্নেহ করেন জানি। কিন্তু আমার পক্ষে ছ’মাস এখানে থাকা সম্ভব নয় বাবাজী।
সবই সম্ভব বৎস, এ দুনিয়ায় কিছুই অসম্ভব নয়। অসম্ভবকে সম্ভব করাই হলো সাধকের সাধনা। আমার সঙ্গে তোমাকে তপস্যা করতে হবে ছ’মাস।
তপস্যা?
হ বৎস। কি তপস্যা, কেন করতে হবে–এ প্রশ্ন তুমি আমাকে করবে না কোনোদিন।
বাবা!
যদি মঙ্গল চাও আমার কথা মত কাজ করো।
কিন্তু–
জানি, যে রত্ন তুমি হারিয়েছে এই ছ’মাস কঠোর সাধনা করে তুমি তা লাভ করতে সক্ষম হবে।
আমার জীবন সম্বন্ধে আপনি কিছুই জানেন না বাবা, তাই আপনি আমাকে এসব কথা বলছেন। আমার জীবন অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
আমার জীবনের চেয়ে তোমার জীবন অস্বাভাবিক নয় বৎস। আমি একদিন তোমাকে আমার জীবন-কাহিনী বলবো, দেখবে আমার মত অদ্ভুত জীবন কারো নেই।
বাবা!
জানি তুমি কে, কোথায় তোমার বাড়ি, কি তোমার আসল পরিচয় সব আমি জানি বৎস। দস্যু হলেও তুমি মহান, তোমার আত্মা অতি পবিত্র–
বনহুরের চোখে রাজ্যের বিস্ময় জেগে উঠে–এ সন্ন্যাসী কি করে জানলো তার আসল পরিচয়! কি করে জানলো দস্যু হলেও মহান সে, তার আত্মা অতি পবিত্র!
সন্ন্যাসী বাবাজী সব শুনেছিলেন ফুলের কাছে। বনহুরের সব কথা সে নিঃসন্দেহে খুলে বলেছে। সন্ন্যাসী বাবাজীর নিকটে। কোনো কথাই সে লুকোয়নি–লুকোতে পারেনি।
বনহুরকে বিস্মিত হতে দেখে বললেন সন্ন্যাসী বাবাজী–শক্তিমান বীরপুরুষ তুমি। তোমার বীরত্বের কাহিনী আমি জানি, আরও জানি তুমি অসহায়ের বন্ধু। বৎস, তাইতো তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার আমার এতো প্রচেষ্টা!
বনহুর অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো–বাবা!
বস, আমি তোমাকে অনুরোধ করছি–তুমি ছ’মাসের মধ্যে কোথাও যাবে না।
বনহুর নিশ্চুপ; মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকে। বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর আদেশ যেন তার সমস্ত ধমনীকে শিথিল করে দেয়। একটি কথা সে প্রতিবাদ করতে সাহসী হয় না।
খুশি হন সন্ন্যাসী বাবাজী।
ববহুরকে সন্ন্যাসী বাবাজী তাদের গেরুয়া বসন পরতে দেন। খালি গা, একটা গেরুয়া কাপড় কাঁধের পাশ দিয়ে জড়ানো।
মাথায় একটি কাপড় পাগড়ির মত করে বাঁধে সে।
এ ড্রেসে বনহুরকে অদ্ভুত মানায়।
সন্ন্যাসী বাবাজী অস্ফুট কণ্ঠে বললেন–অপূর্ব! জয়শ্রী জয়শ্রী মা দয়াময়ী–যাও বস, কেশবের সঙ্গে যাও।
বনহুর চলে গেলো কেশবের সঙ্গে।
ফুল এতোক্ষণ আড়ালে দাঁড়িয়ে প্রাণভরে দেখছিলো।
বনহুর চলে যেতেই বেরিয়ে আসে আড়াল থেকে, চোখ তার অশ্রুসিক্ত।
সন্ন্যাসী বাবাজী বলেন–ফুল, মা তোমার চোখে জল! কেন মা এতো বেদনা তোমার?
ফুল বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে–বাবাজী!
জানি তোর খুব কষ্ট হচ্ছে–কিন্তু কি করব মা, যতদিন না সময় পূর্ণ হয়েছে ততদিন তোকে এভাবে সাধনা করতে হবে। জয়ী হলে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে মা।
*
দিন যায় রাত আসে, রাত যায় দিন হয়।
ফুল সব সময় বনহুরের দৃষ্টির আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখে। ফুল নিজের হাতে রান্না করে, সন্ন্যাসী বাবাজীকে খাওয়ায়, তারপর সাজিয়ে রাখে বনহুর আর কেশবের জন্য। সব শেষে নিজে খায়। পূর্বের সে চঞ্চলতা আর নেই ফুলের। ধীর-স্থির শান্ত বন-দুহিতার মত নিশ্চঞ্চল হয়ে পড়েছে সে।
