হঠাৎ সন্ন্যাসী বাবাজী বলে উঠেন–মা ফুল, এক কাজ করতে চাই।
বলুন বাবাজী?
আমি শেষ চেষ্টা করে দেখতে চাই, ওকে বাঁচাতে পারি কিনা। রাত ভোর হয়ে এলো তার পূর্বেই আমাকে সে কাজ করতে হবে। ফুল, আমি ওকে একটা জীবন্ত বড়ি খাওয়াবো। ঐ বড়ি সেবন করলে ও বাঁচবে কিন্তু ছয় মাস কোনো নারী মুখ দর্শন করা চলবে না!
তাই করুন, চাই না আমি ওর সম্মুখে আসতে, তাই করুন দেব। তবু যদি ও বেঁচে থাকে, সেই হবে আমার জীবনের পরম সম্পদ।
বেশ তাই হোক। সন্ন্যাসী বাবাজী তার ঔষধের থলে হতে একটি স্বর্ণকৌটা বের করলেন, এবং তার ভিতর হতে একটি জমকালো বড়ি বের করে হাতের তালুতে রাখলেন। কেশবকে বললেন– তিনি সামান্য পানি দিতে।
কেশব পানি দিলো।
সন্ন্যাসী বাবাজী বড়িটা হাতের তালুতে আংগুল দিয়ে পানির সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন, তারপর বনহুরের ঠোঁটের ফাঁকে ঢেলে দিলেন।
এবার তিন জোড়া চোখ অপলক নয়নে তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখের দিকে।
সন্ন্যাসী বাবাজী মন্ত্রপাঠ করছেন বিড়বিড় করে। আর মাঝে মাঝে ফুঁ দিচ্ছেন বনহুরের চোখেমুখে।
সেকি ব্যাকুল প্রতীক্ষা সকলের।
ভোর হয়ে আসছে।
গহন বনের কোনো অঞ্চলে বন্য মোরগ ডেকে উঠলো।
হঠাৎ কেশব আনন্দধ্বনি করে উঠলো– বাবাজী, দেখো দেখো ও বেঁচে উঠেছে। ও বেঁচে উঠেছে, নড়ছে।
সন্ন্যাসী বাবাজী আর ফুল তাকালো একসঙ্গে।
বনহুর মাথাটা একটু একটু করে গড়াচ্ছে।
ফুলের মুখমণ্ডল খুশিতে দীপ্ত হয়ে উঠলো, আনন্দে আত্মহারা হলো সে। অস্ফুট কণ্ঠে ডাকলো –বনহুর–
সঙ্গে সঙ্গে সন্ন্যাসী বাবাজী বললেন –ফুল, আমার নিষেধ অমান্য করো না। তুমি বেরিয়ে যাও এখান থেকে।
ফুল নিজের ভুল বুঝতে পেরে লজ্জিত হলো, বিমর্ষ হলো তার আনন্দ উচ্ছল মুখমণ্ডলখানা। ধীরে ধীরে উঠে কুঠির ত্যাগ করে বেরিয়ে গেলো বাইরে।
কেশব আর সন্ন্যাসী বাবাজী বসে রইলা বনহুরের শিয়রে।
ফুল কুঠিরের বাইরে দাঁড়িয়ে কান পেতে রইলো বনহুরের কণ্ঠস্বর শুনবার জন্য মন তার চঞ্চল হয়ে উঠেছে। নিজকে যেন কোনোমতে সামলাতে পারছে না সে।
কিছুক্ষণ পর কানে ভেসে এলো তার বহু কামনার, বহু সাধনার সেই অতি পরিচিত কণ্ঠের ব্যথা কাতর আওয়াজ–উঃ–উঃ-উঃ–
ফুলের মন ছটফট করে উঠলো, পাশে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেবার জন্য আকুল হয়ে উঠলো তার প্রাণ। কিন্তু উপায় নেই, সন্ন্যাসী বাবাজীর আদেশ তাকে পালন করতেই হবে। দু’হাতে বুক চেপে দাঁড়িয়ে রইলো ফুল।
আবার শোনা গেলো–মা, মাগো–উঃ–উঃ–পানি পানি—
ফুল ছুটে পাশের কুঠির থেকে গেলাসে পানি ঢেলে নিয়ে এসে দরজায় দাঁড়ালো।
কেশব বেরিয়ে আসতেই তার হাতে দিলো, বললো–কেমন আছে ও?
অনেক ভাল। পানির গেলাস নিয়ে ভিতরে চলে গেলো কেশব।
সূর্যের আলোর সঙ্গে বনহুর চোখ মেলে তাকালো।
চোখ মেলে তাকিয়ে দেখতে পেলো সন্ন্যাসী বাবাজীকে। পাশেই ছিলো কেশব, তাকেও দেখলো বনহুর। কিছুক্ষণ দেখে নিয়ে বললো–আমি কোথায়?
সন্ন্যাসী বাবাজী বললেন–দিল্লীর অদূরে কোনো এক জঙ্গলে তুমি এখন আছো।
বনহুর নিশ্চুপ পড়ে রইলো।
সন্ন্যাসী বাবাজী কেশবকে ছাগলের দুধ গরম করে আনতে বললেন।
ফুল সব শুনছিলো বাইরে দাঁড়িয়ে, সে তাড়াতাড়ি ছাগলের বাট থেকে দুধ সংগ্রহ করে গরম করে দিলো।
গরম দুধ খাওয়ার পর বেশ কিছু সুস্থ বোধ করলো বনহুর। নতুন করে জীবন লাভ করলো, দেহের ব্যথা অনেক কমে গেছে বলে মনে করলো সে। বনহুর বিছানায় উঠে বসতে যাচ্ছিলো, বাধা দিলেন সন্ন্যাসী বাবাজী–অনেক কষ্টে, অনেক সাবধানে তোমাকে বাঁচাতে সক্ষম হয়েছি বৎস। আমার আদেশ–তুমি আমার অবাধ্য হবে না। তোমাকে তিন দিন তিন রাত্রি সম্পূর্ণ শয্যায় শয়ন করে থাকতে হবে।
বনহুর সন্ন্যাসীর দীপ্ত শুভ্র দাড়ি-গোঁফে ঢাকা মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে নিপ পড়ে রইলো, পারলো না তার অবাধ্য হতে।
বনহুর চোখ বুজে স্মরণ করতে লাগলো তার পূর্বের ঘটনা। খোদা তাকে কিভাবে বাঁচিয়ে নিয়েছেন। ভয়ঙ্করী নদীর বুক থেকে কেমন করে এলো সে এ জঙ্গলে। মনে পড়লো লুসীর কথা। বেচারী মেয়ে মানুষ সাঁতার তেমন জানতো না, তাছাড়া ভীষণ ঢেউ-এর বুকে কোথায় তলিয়ে গেছে। কে জানে। লুসীর ব্যথা করুণ মুখখানা বারবার ভাসতে লাগলো তার চোখের সম্মুখে। ওকে বাঁচানোর অনেক চেষ্টাই সে করেছিলো, ওর জন্য সে অনেক করেছে, শেষ পর্যন্ত ওকে বাঁচাতে পারলো না সে। বনহুরের বুকে এজন্য অনেক বেদনা–লুসীকে সে রক্ষা করতে পারেনি। লুসী মরে ভালই হয়েছে– তার অভিশপ্ত জীবনের হয়েছে সলিল সমাধি। বনহুর একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করে, কিন্তু তার গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে আসে দু’ফোঁটা পানি।
বনহুর কুঠিরের মধ্যে একা বিছানায় নিশ্চুপ পড়ে আছে সন্ন্যাসী বাবাজী তার আশ্রমের কাজে ব্যস্ত। কেশব গেছে ফল আহরণে বনের মধ্যে।
ফুল একা ছট ফট করে কুঠিরের বাইরে। গুরুদেবের নিষেধ–বনহুরের পাশে তার যাওয়া হবে না। আকুলি বিকুলি করে সে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে।
কুঠিরের মধ্য হতে ভেসে আসে বনহুরের কণ্ঠের আওয়াজ –উঃ উঃ মা, মাগো—
ফুলের চোখের পানি বাধা মানে না, পাষাণের মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
চমকে উঠে ফুল–কে যেন তার কাঁধে হাত রাখে।
ফিরে তাকায় ফুল, দেখতে পায় সন্ন্যাসী বাবাজী হাস্য-উজ্জ্বল মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। বলেন তিনি ফুলকে লক্ষ্য করে–মা ধৈর্য ধরো, ওকে যদি বাঁচাতে চাও তবে নিজেকে শক্ত করে নাও। মনে রেখো, ছয় মাস তোমার বনহুরের নারীদর্শন নিষেধ আছে।
