লোকটা উবু হয়ে পড়ে থাকায় মুখ দেখা যাচ্ছিলো না। শুধু পিঠটা দেখা যাচ্ছিলো। জামা ছিঁড়ে গেছে, পিঠের কিছু অংশ বেরিয়ে পড়েছে, কিন্তু পিঠে ক্ষতের দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো।
বললো ফুল–আহা, লোকটাকে কেউ বা কারা চাবুক দিয়ে মেরেছে। দেখছো না কেশব ভাইয়া, ওর পিঠের চামড়াগুলো ছিঁড়ে কেটে উঠে গেছে।
হাঁ ঠিক বলেছো।
চলো যাই কেশব ভাইয়া?
যাবে, কিন্তু লোকটা?
মরে গেছে, কি আর হবে ওকে দেখে।
দাঁড়াও ফুল, দেখি লোকটা সত্যিই মরে গেছে না বেঁচে আছে। কেশব লোকটাকে চীৎ করে। শুইয়ে দিলো।
সঙ্গে সঙ্গে ফুল অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো–হুর! তার হাতের কলসীটা পড়ে গেলো মাটিতে। ফুল লুটিয়ে পড়লো ওর বুকে হুর, তুমি–তুমি—
কেশব বিস্ময়ে হতবাক, নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে। কে এ লোক, ফুল ওকে চিনলো কি করে!
নদীর ঢেউ-এর আঘাতে বনহুর তলিয়ে গেলেও প্রাণপণে সাঁতার কেটে ভেসে থাকার চেষ্টা করেছিলো। এবং যতদূর সম্ভব নিজেকে রক্ষা করার জন্য ঢেউ-এর বুকে দেহটা এলিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু কখন যে তার সংজ্ঞা লুপ্ত হয়েছিলো সে জানে না। হয়তো খোদার ইচ্ছা, তাই বালুচরে আটকা পড়ে গিয়েছিলো সে।
ফুল মুখে-মাথায় হাত বুলিয়ে ব্যাকুল কণ্ঠে ডাকে–হুঁর, আমার হুর, তুমি সত্যি মরে গেছো? কেমন করে তুমি এলে এখানে? কে তোমার এ অবস্থা করেছে! রোদন করতে লাগলো ফুল।
কেশব বললো–ফুল, ওকে তুমি চেনো?
আমার স্বামী!
তোমার স্বামী?
হাঁ। কেশব ভাইয়া, দেখোনা ও বেঁচে আছে কিনা?
কেশব তাড়াতাড়ি বনহুরের বুকে কান লাগিয়ে আনন্দসূচক শব্দ করে উঠে–ফুল, তোমার অদৃষ্ট ভাল। তোমার স্বামীর মৃত্যু হয়নি, সে জীবিত আছে। এই দেখো বুকের কাছে–
ফুল বনহুরের বুকে কান লাগিয়ে দেখে, সত্যি বুকের মধ্যে স্পন্দন হচ্ছে। ব্যাকুল কণ্ঠে বলে ফুল–কেশব ভাইয়া, ওকে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করো। ওকে বাঁচাও তোমরা।
কেশব উঠে দাঁড়ায়–ফুল, তুমি ওর কাছে থাকো, আমি বাবাজীকে ডেকে আনছি। তিনি ঔষধ দিলেই বাঁচবে বলে মনে হয়।
যাও, যাও কেশব ভাইয়া, ওকে বাঁচাতেই হবে।
কেশব চলে যায়।
ফুল লুটিয়ে পড়ে বনহুরের সংজ্ঞাহীন বুকের উপর। আকুল হয়ে কাঁদে–বনহুর, তোমার এ অবস্থা কেন। হায়, কে তোমার এ অবস্থা করেছে। বুকে-মাথায়-ললাটে হাত বুলিয়ে চলে ফুল। মুখের ধুলাবালি হাত দিয়ে মুছে দেয়। চুলগুলো সরিয়ে দেয় ললাট থেকে। তারপর নিজেকে সে স্থির রাখতে পারে না, চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেয় সে বনহুরের গণ্ড ঠোঁট আর ললাট।
অল্পক্ষণ পরে ফিরে আসে কেশব আর সন্ন্যাসী বাবাজী, ফুল সরে দাঁড়ায়।
কেশব বলে–বাবাজী, এই সেই লোক, দেখুন তো বাবাজী বাঁচবে কিনা?
সন্ন্যাসী বাবাজী বনহুরের অজ্ঞান দেহটার পাশে বালির মধ্যে বসে পড়লেন, তারপর বহুক্ষণ ধরে পরীক্ষা করে বললেন–অত্যন্ত ক্ষীণ আশা। বাঁচতে পারে, তবে আজ রাত্রি না কাটা পর্যন্ত কোনো ভরসা নেই।
ফুল লুটিয়ে পড়লো সন্ন্যাসী বাবাজীর পায়ে–বাবাজী, ওকে বাঁচান। ওকে বাঁচান বাবাজী। ও না বাঁচলে আমিও বাঁচবো না!
সব কেশবের মুখে শুনলাম মা। সব জানতে পেরেছি। তবে সবই সেই সর্বশক্তিমানের ইচ্ছা। কেশব, এসো ওকে কোন রকমে কুঠিরে নিয়ে যাই।
কেশব শক্তিমান যুবক।
বৃদ্ধ হলেও সন্ন্যাসী বাবাজী বলিষ্ঠ পুরুষ।
ফুলের দেহেও তো কিছু বল আছে।
সবাই মিলে বনহুরের সংজ্ঞাহীন দেহটা নিয়ে এলো কুঠিরে।
ফুল নিজের শয্যায় বনহুরকে শুইয়ে দিলো।
সন্ন্যাসী বাবাজীর চললো চিকিৎসা। গাছের পাতার রস আর কতরকম শিকড় থেতলে তার রস খাওয়াতে লাগলেন।
সমস্ত দিন চলে গেলো বনহুরের জ্ঞান ফিরলো না। পরপর নানা দুর্ঘটনায় তার পালস্ বড় দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। সন্ধ্যা হলো, তারপর শুরু হলো রাত্রি।
ফুল অবিরত অশ্রু বিসর্জন করে চলেছে। আর তালপাতার পাখায় বনহুরের মাথায় বাতাস করে যাচ্ছে। কেশব করছে সেবা আর ঔষধের পর ঔষধ জোগাচ্ছে সে।
সন্ন্যাসী বাবাজী নানাভাবে নানা ঔষধ খাওয়াচ্ছেন, আর দেহের ক্ষতে ঔষধ লাগিয়ে দিচ্ছেন।
রাত্রি শেষ প্রহর–এবার হতাশ হয়ে পড়লেন সন্ন্যাসী বাবাজী।
ফুল সব সময় তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখের দিকে। আর মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে সে সন্ন্যাসী বাবাজীর মুখে।
রাত্রি ভোর হয়ে এলো, সন্ন্যাসী বাবাজীর মুখ কালো হয়ে উঠলো, বললেন তিনি–মা, তোর অদৃশ্য মন্দ, ওকে বাঁচাতে পারলাম না।
ফুল আছাড় খেয়ে পড়লো মাটিতে, মাথা ঠুকে কাঁদতে লাগলো।
সন্ন্যাসী বাবাজীর চোখেও অশ্রু ঝরে পড়লো।
কেশব কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সে এমন ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গে মোটেই অভিজ্ঞ নয়। লোকসমাজের অনেক কিছুই সে জানে না। শিশুকাল হতে সে সন্ন্যাসী বাবাজীর সঙ্গে গহন বনে বাস করে। নিজের সম্বন্ধেই কেশব জানে না কিছু। নারী-পুরুষ কি সম্বন্ধ তাও অভিজ্ঞতা ছিলো না ওর। ফুলকে দেখার পূর্বে কোনো নারীর সংস্পর্শে আসেনি সে কোনোদিন। তাই কেশব ফুলকে অবাক হয়ে দেখতো। ফুল সম্বন্ধে নানা প্রশ্ন জাগতো তার মনে। কিন্তু ফুল তাকে কোনোদিন ধরা দেয়নি। ফুলের মধ্যে সে খুঁজে ফিরেছে তার অতৃপ্ত হৃদয়ের স্বাদ আহ্লাদ কিন্তু তা পূর্ণ হয়নি।
কেশব তাই অবাক হয়ে গেলো একটি পুরুষের জন্য একটি নারীর কত আকুতি। বনহুরের জন্য ফুল যখন ব্যাকুলভাবে রোদন করছিলো, তখন কেশব অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছিলো এ দৃশ্য।
