লুসী বললো–দাদা, এই যে পথ দেখছেন এটা দিয়েই শয়তান মাহমুদ রিজভী আমাকে নিয়ে গিয়েছিলো। ওটা চলে গেছে রিজভীর আস্তানার দিকে। আর এ পথটা আমি জানিনা কোথায় গেছে।
জমাট অন্ধকার হলেও ঝাপসা আকারে সুড়ঙ্গ মুখগুলো দেখা যাচ্ছিলো। তাছাড়া বনহুরের চোখে অন্ধকার স্বচ্ছই লাগে, কারণ এসব তার অভ্যাস আছে।
বনহুর লুসীসহ দ্রুত দ্বিতীয় সুড়ঙ্গপথে অগ্রসর হলো।
চলেছে তো চলেছেই। সে পথের যেন শেষ নেই।
অন্ধকার সুড়ঙ্গপথ। বনহুরের হাতের মুঠায় লুসীর হাত–পাশাপাশি এগুচ্ছে ওরা।
একবার বললো বনহুর–লুসী, তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে?
না। আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝি?
আমার কষ্ট সহ্য করার অভ্যাস আছে লুসী।
কিছুক্ষণ নীরবে উভয়ে এগুলো, বললো বনহুর-লুসী, আমি দস্যু বনহুর জেনেও তুমি আমার সঙ্গে আসতে সাহস করলে?
জানি আপনি ঐ সব লম্পট শয়তানদের চেয়ে অনেক ভাল। দাদা, আপনি দেবতা–মানুষ নন।
বোন, চিরদিন যেন তোমার এ বিশ্বাস অটুট থাকে।
লুসী হাঁপিয়ে পড়েছিলো, বললো–একটু জিরিয়ে নি।
ঠিক সে মুহূর্তে পিছনে শোনা যায় অনেকগুলো লোকের কণ্ঠস্বর, সমস্ত কণ্ঠ ভেদ করে আরও একটা শব্দ ভেসে আসে সুড়ঙ্গ পথে–হুম হুম হোঃ হোঃ–
বনহুর আর লুসী চমকে উঠে।
বনহুর বলে–নিগ্রো বোবাটাও জেগে উঠেছে লুসী। এবং তারা জানতে পেরেছে আমরা পালিয়েছি। আর একটু দেরী করা ঠিক নয়, দ্রুত পা চালাও লুসী।
চলুন দাদা, ওদের হাতে ধরা পরার চেয়ে মরণ ভাল।
বনহুর আর লুসী ছুটতে শুরু করলো।
পিছনে হই-হুল্লোড় আর হট্টগোল চলেছে। বোধ হয় দ্রুত ছুটে আসছে ওরা। বনহুর পিছনে তাকিয়ে বললো-লুসী, মশালের আলো দেখতে পাচ্ছো? ওরা মশাল নিয়ে আসছে।
এখন উপায়?
আরও জোরে ছোট লুসী আরও জোরে—
বনহুর লক্ষ্য করছে, লুসী বড় হাঁপিয়ে পড়েছে।
কিন্তু কোনো উপায় নেই–লুসীকে বাঁচাতেই হবে। নিজের জন্য ভাবে না বনহুর, লুসীর জন্য সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
ক্রমেই জব্রুর হুঙ্কার আর লোকজনের চিৎকার নিকটে মনে হয়। মশালের আলোও অনেক বেশি মনে হচ্ছে। বনহুর আর লুসী অন্ধকার সুড়ঙ্গপথে দ্রুত ছুটে চলেছে।
হঠাৎ সম্মুখে বাধা পায় বনহুর আর লুসী, দেখতে পায় পথ রুদ্ধ, একটা কপাট দিয়ে সুড়ঙ্গমুখ বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
লুসী হাপাচ্ছে, এবার কেঁদে উঠে লুসী–দাদা এবার কি হবে?
বনহুর কোনো কথা বলে না বা বলবার সময় পায় না। প্রচণ্ড ধাক্কা দিতে শুরু করে সে কপাটে।
বনহুরের বলিষ্ঠ বাহুর আঘাতে দুলে উঠে কপাটখানা। এবার সমস্ত শক্তি দিয়ে কপাটের কজা খুলে ফেলে মোচড় দিয়ে, তারপর কপাটখানা ঠেলে এক পাশে সরিয়ে দিয়ে লুসীর হাত ধরে বেরিয়ে আসে। কিন্তু মুহূর্তে চুক্ষ স্থির হয়ে যায় বনহুর আর লুসীর।
সুড়ঙ্গমুখেই এক খরস্রোতা নদী ভীমগর্জন করে ছুটে চলেছে। সেকি প্রচণ্ড প্রচণ্ড ঢেউ আছাড় খেয়ে পড়ছে–সুড়ঙ্গমুখের পাথর খণ্ডের গায়ে।
লুসী বনহুরকে চেপে ধরে দু’হাত দিয়ে।
বনহুর কি করবে উপায় খোঁজে।
সম্মুখে নদীর ভীষণ জলোচ্ছাস আর পিছনে ভয়ঙ্কর সেই নিগ্রো জব্ৰু। বনহুর বললো লুসী, মরতে চাও না রিজভীর কাছে ফিরে যেতে চাও? বলো এক মুহূর্ত বিলম্বের সময় আর নেই।
মরতে আমি প্রস্তুত আছি দাদা, তবু রিজভীর পাশে ফিরে যাবো না।
তবে এসো নদীবক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ি, এই হয়তো তোমার আমার শেষ দেখা লুসী—
দাদা!
বোন, তোমাকে বাঁচাতে পারলাম না।
বনহুর লুসীর হাত ধরে ভীষণ রূপধারী নদীবক্ষে লাফিয়ে পড়লো। লুসীর হাত সে কিছুতেই ছেড়ে দিলো না।
তরঙ্গবক্ষে ডুবছে আর উঠছে ওরা।
কিন্তু বেশিক্ষণ লুসীকে ধরে রাখতে পারলো না বনহুর। তার হাতের মুঠা থেকে লুসীর হাতখানা খসে গেলো প্রচণ্ড ঢেউ-এর আঘাতে।
বনহুর সাঁতার কেটে নিজেকে ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করে ডাকলো–লুসী–লুসী–লুসী।
কিন্তু কোথায় লুসী! কোনো সাড়া এলো না।
চারদিকে জমাট অন্ধকার আর মেঘের গর্জনের মত তরঙ্গায়িত নদীর হুঙ্কার।
বনহুর সাঁতার জানে ভালো, ছোট বেলায় নূরীর আর সে নদীর বুকে সাঁতার কাটতো। দু’জনে পাল্লা দিয়ে ভেসে যেতো দূরে অনেক দূরে।
আজ বনহুর ভয়ঙ্করী নদীবক্ষে সাঁতার কাটার চেষ্টা করলো। কিন্তু কিছুতেই নিজেকে ভাসিয়ে রাখতে পারলো না। ঢেউ-এর আঘাতে বার বার তলিয়ে যেতে লাগলো সে।
যতই শক্তিশালী হোক কতক্ষণ টিকতে পারে। উত্তাল তরঙ্গায়িত নদীবক্ষে বনহুর তলিয়ে গেলো ধীরে ধীরে।
*
ফুল কলসী কাঁখে নদী তীরে এসে দাঁড়ালো। রোজ সে নদী তীরে আসে পানি নিতে। প্রতিদিনের মত ফুল আজও অবসর সময়ে নদী থেকে পানি নিতে এসেছে।
আজ সে একা আসেনি, কেশব তার সঙ্গে এসেছে। সন্ন্যাসী বাবা বলেছেন ফুল যেন একা কোথাও না যায়। কারণ এদেশে তারা নতুন এসেছে। দিল্লী নগরীর নিকটবর্তী কোনো এক জঙ্গলে আস্তানা নিয়েছে তারা।
ফুলের জন্য সন্ন্যাসী বাবার অনেক চিন্তা। যুবতী সুন্দরী মেয়ে ফুল, একা গহন বনে বা নদীর কূলে যাওয়া তার জন্য মোটেই উচিৎ নয়, কেশবকে তাই তিনি বলে দিয়েছেন সব সময় ফুলের সঙ্গে থাকতে।
আজও তাই কেশব এসেছে ফুলের সঙ্গে।
ফুল এগিয়ে গেলো নদীর দিকে।
কেশব দাঁড়িয়ে রইলো অদূরে।
হঠাৎ ফুল চিৎকার করে উঠলো–কেশব ভাইয়া, দেখো ঐ যে বালির মধ্যে একটা লোক উবু হয়ে পড়ে আছে!
কেশব তাকালো, সত্যি একটা লোক অদূরে বালির মধ্যে উবু হয়ে পড়ে আছে। ছুটে গেল কেশব, ফুলও এগিয়ে গেলো ব্যস্ত হয়ে। কেশব লোকটার পাশে হামাগুড়ি দিয়ে বসে পড়লো। বললো– কোনো নৌকা বা জাহাজডুবি লোক–আহা, বেচারা মরে গেছে!
