একদিন কথায় কথায় বলেছিলো মাসুমা-মনিরা, চনা আমার সঙ্গে একবার ভারতবর্ষ দেখে আসি।
তা কেমন করে হয় ভাই! মামীমা বুড়ো মানুষ কখন কেমন থাকেন। তাছাড়া নূরের পড়াশোনা
বলেছিলো মাসুমা–আমি মামীমাকে বলে সব ঠিক করে নেবো। আমার সঙ্গে থাকবি, চলে আসবি কয়েক মাস পরে।
সম্ভব নয় মাসু।
মাসুমা তবু বলেছিলো মরিয়ম বেগমকে–মামীমা, মনিরাকে আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাবো। ভারতবর্ষে যাচ্ছি–দুই বান্ধবী মিলে খুব করে ঘুরে বেড়াবো। আপনি অনুমতি দিলে খুব ভাল হয়।
মামীমা কিছু বলবার আগেই মনিরা বলে উঠে–তা হয় না, এদিকে কে সামলাবে সব বল্ দেখি। মামীমা বুড়ো মানুষ!
মরিয়ম বেগম মাসুমার কথায় খুশি হন, মনিরা দিন-রাত স্বামীর চিন্তায় বিভোর হয়ে থাকে, সব সময় কাদাকাটা করে। কচি বয়সে একদম যেন বুড়িয়ে গেছে সে। মরিয়ম বেগম বললেন–মাসুমা, ভাল কথাই বলেছে মা, যাওনা একবার ভারতবর্ষটা দেখে এসো। আমার কত সখ ছিলো ভারতে একটা বাড়ি করবো; কিন্তু হয়ে উঠেনি। বাংলাদেশের মানুষ আমরা অথচ বাংলাদেশ থেকে কত দূরে আজ রয়ে গেছি।
মামীমা, তোমার এই রোগ-জিরজিরে শরীর, তাছাড়া নূরের পড়াশোনা রয়েছে–
আমার শরীর আবার কবে ভাল থাকে মা, এই শরীর নিয়েই বেঁচে থাকবো। মরণ নেই আমার, নইলে এতো দুঃখ-বেদনা সইবে কে? নূর আমার কাছেই থাকবে, সরকার সাহেব আছেন। নূরকে দেখাশোনা করবার লোকের অভাব হবে না। যাও মা, মাসুমা যখন এতো করে ধরেছে তখন যাও ভারতবর্ষটা একবার ঘুরে এসো।
মামীমার কথা অগ্রাহ্য করতে পারে না মনিরা, নিশ্চুপ রয়ে যায় সে।
মাসুমার আনন্দ আর ধরে না, মনিরা যাবে তার সঙ্গে–এযে কত বড় আনন্দের কথা! স্বামীকে বলে রাজি করিয়ে নেয় মাসুমা–ওগো, মনিরাকে নিয়ে যাবো সঙ্গে, খুব মজা হবে, তাই না?
তার স্বামী কি ভাববেন বলো তো?
স্বামী তোর আর এখন এখানে নেই। মামীমাই তার অভিভাবক। স্বামী বছরে আসনে না, কেমন লোক বলো তো? অমন লক্ষ্মী মেয়েকে এতো অবহেলা! মনিরাকে দূরে নিয়ে গিয়ে ওর স্বামীকে খুব করে জব্দ করবো। দেখবো তখন বৌ-এর কথা মনে পড়ে কি না!
*
এলোমেলো চুল, বিক্ষিপ্ত বসন, সমস্ত দেহ ঘেমে নেয়ে উঠেছে। আঁচলখানা মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। দক্ষিণ হস্তে জ্বলন্ত মশাল, কক্ষে প্রবেশ করে লুসী। ঠিক যেন পাগলীর ন্যায় তাকে দেখাচ্ছে।
বনহুর এতো কষ্টেও জ্ঞান হারায় নি, সে ফিরে তাকাতেই বিস্মিত হলো লুসীর চেহারা দেখে।
লুসী বনহুরের পাশে এসে দাঁড়ালো, চাপা কণ্ঠে বললো–মিঃ আলম।
লুসী। অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো বনহুর।
লুসী হস্তস্থিত মশালের আগুনে বনহুরের বন্ধন অগ্নিদগ্ধ করে চললো। অল্পক্ষণে বনহুরের শরীরের মজবুত রশি খসে পড়লো।
বনহুর নিজেকে মুক্ত করে নিয়েই উঠে দাঁড়ালো, নিজের ক্ষত-বিক্ষত দেহের দিকে না তাকিয়েই লুসীকে জাপটে ধরলো লুসী, তোমার এ অবস্থা কেন?
লুসী বাষ্পরুদ্ধ ব্যথাকরুণ কণ্ঠে বলে উঠলো আমার সব শেষ হয়ে গেছে মিঃ আলম– আমার সব শেষ হয়ে গেছে–
লুসী!
আপনাকে বাঁচাবার জন্য আমি নিজেকে বিসর্জন দিয়েছি।
লুসী, আমার জন্য কেন তুমি নিজের সর্বনাশ করলে? কেন, কেন তুমি নিজেকে এমন করে বিনষ্ট করলে লুসী!
আর নয় মিঃ আলম, আপনি এ মুহূর্তে পালিয়ে যান।
আর তুমি?
কি হবে আর আমার ফিরে যেয়ে। মিঃ আলম, আমি আর ফিরে যাবো না।
এ তুমি কি বলছো লুসী?
হাঁ, মৃত্যুই এখন আমার কামনা।
তা হয় না লুসী, মরতে আমি তোমাকে দেবো না।
এ নিকৃষ্ট অপবিত্র জীবন নিয়ে বেঁচে থেকে কি লাভ হবে! পারবো না এ দুর্বিসহ জীবন নিয়ে বাঁচতে। যান, যান আপনি–
কিন্তু আমি তোমাকে ছেড়ে যাবো না লুসী।
আপনার পায়ে পড়ি আপনি চলে যান, জানেন না ঐ শয়তানা মাহমুদ রিজভী কতবড় ভয়ঙ্কর!
লুসী, দস্যু বনহুর কোনো দিন ভয়ঙ্করকে ভয় করে না। এখন আমি মুক্ত দেখে নেবো মাহমুদ রিজভীর দেহে কত শক্তি। আর তার সেই নিগ্রোটারই কত বুদ্ধি-কৌশল। কৌশলে সে আমাকে ঐ রাতে কাবু করে ছিলো, আমি জানতাম না তার কালো দেহে লৌহ বর্ম দ্বারা আচ্ছাদিত ছিলো। বনহুর লুসীর হাত মুঠায় চেপে ধরে লুসী তুমিও চলো আমার সঙ্গে?
এ পাপময় জীবন নিয়ে–
কেউ তোমাকে গ্রহণ না করুন, তুমি থাকবে আমার পাশে।
আমার বোন নেই, তোমাকে আমি বোনের আসনে প্রতিষ্ঠা করবো লুসী।
মশালের আলোতে বনহুর দেখলো লুসীর চোখ দুটো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। আবেগ ভরা গলায় বললো বনহুর দস্যুর বোন হতে আপত্তি নেই তো?
দাদা, আপনি দস্যু কিন্তু আমার প্রাণদাতা আপনি। লুসী বনহুরের পায়ে প্রণাম করলো।
বনহুর বললো–আর বিলম্ব নয় লুসী, চলো তাহলে।
চলুন। শয়তান মাহমুদ রিজভী এখন নেশায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তার অনুচরগণ সবাই এখন ওদিকে শরাব পান নিয়ে মাতোয়ারা হয়ে আছে। ব্রু এক ড্রাম নেশা ভক্ষণ করে চিৎ হয়ে পড়ে আছে। চলুন, এ মুহূর্তে সরে পড়তে হবে।
বনহুর বললো–চলো বোন।
লুসী হাত থেকে মশালটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো।
বনহুর লুসীর হাত ধরে দ্রুত বেরিয়ে গেলো। অন্ধকার কক্ষের লৌহদরজা পেরিয়ে বাইরে আসতেই বনহুর লক্ষ্য করলো কক্ষটা গভীর মাটির নীচে, কক্ষের মুখ একটা সুড়ঙ্গ পথের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে। আর একটা পথ সোজা চলে গেছে নিচের দিকে।
বনহুর কোন্ পথে অগ্রসর হবে ভাবছে।
